
বইটি লিখেছেন শিক্ষক-গবেষক সরোজেশ মুখার্জী
সরোজেশ মুখার্জী, ঐতিহাসিক ডঃ রসিঙ্কা চৌধুরী এবং প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক-কবি অমিত চৌধুরী (বাঁদিক থেকে)
ভারতে এসে সাহেবরা কেবল ছড়ি ঘোরাননি, বরং কেউ কেউ এদেশীয়দের শিক্ষিতও করেছেন। জেমস লং, বেথুন, আলেকজান্ডার ডাফ, ডিরোজিওদের অবদান বঙ্গ সমাজে অনস্বীকার্য। তেমনই উনিশ শতকের বাংলায় শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন ডেভিড হেয়ার। সেই হেয়ার সাহেবকে নিয়েই প্রকাশিত হল বই। পার্কস্ট্রিটের অক্সফোর্ড বুক স্টোরে, ৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত হল ‘দ্য লাইফ অ্যান্ড টাইমস অফ ডেভিড হেয়ার: ফার্স্ট সেক্যুলার এডুকেশনিস্ট অফ ইন্ডিয়া’ (The Life and Times of David Hare : First Secular Educationist of India) বইটির প্রকাশক নিয়োগী বুকস। বইটি লিখেছেন শিক্ষক-গবেষক সরোজেশ মুখার্জী। তিনি দ্য কেমব্রিজ স্কুল, কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা। সেখানে তিনি অর্থনীতি এবং ইতিহাস পড়ান। এদিন বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক ও কবি অমিত চৌধুরী এবং ঐতিহাসিক ডঃ রসিঙ্কা চৌধুরী।
‘দ্য লাইফ অ্যান্ড টাইমস অফ ডেভিড হেয়ার: ফার্স্ট সেক্যুলার এডুকেশনিস্ট অফ ইন্ডিয়া’ বইটি ডেডিভ হেয়ারের জীবনীগ্রন্থ। তবে বইটিকে শুধু জীবনীগ্রন্থের পরিচয়ে আটকে রাখা যায় না। বইতে উঠে এসেছে, ডেভিড হেয়ারের সমসাময়িক সময়ের কথা। তাঁর জীবনের কথা তো বটেই। তদানিন্তন সমাজের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। হেয়ার শিক্ষার ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করতেন, পাশাপাশি মনে করতেন শিক্ষাই পারে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যবর্তী দূরত্ব লাঘব করতে। সেই বার্তাই উঠে এসেছে এই গ্রন্থে।

বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানে দর্শক জমায়েত
হেয়ার শিক্ষার ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করতেন, পাশাপাশি মনে করতেন শিক্ষাই পারে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যবর্তী দূরত্ব লাঘব করতে। সরোজেশ বলেন, “এটা শুধুমাত্র একটা জীবনীগ্রন্থ নয়। বরং ভারতের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ের প্রবেশদ্বার এটি।”
ডেভিড হেয়ার নিজ উদ্যোগে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালিয়েছেন, জীবনের শেষ দিন অবধি তিনি শিক্ষা বিস্তারের কাজে ব্রতী ছিলেন। একদিকে ব্রিটিশ সরকার, অন্যদিকে হিন্দু সমাজপতিরা; উভয়ের বিরুদ্ধে লড়েছেন, নিজে কোনওদিন খ্যাতি চাননি হেয়ার। কেবল শিক্ষার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা পালন করে গিয়েছেন গোটা জীবনে, সে’সব কিছুই কলমের আঁচড়ে এ বইতে ধরেছেন লেখক।
ঊনিশ শতকে (১৮০১ সালে) কলকাতায় আসেন ঘড়ি ব্যবসায়ী ডেভিড হেয়ার। স্কটিশ সাহেব শুধুমাত্র একজন শিক্ষাবিদ ছিলেন না, ছিলেন সংস্কারক। তিনি এমন একটা সময় এদেশে জ্ঞানের আলো জ্বেলেছিলেন; যখন ভারতীয় সমাজ ছিল বদ্ধ। গোঁড়ামি ছিল প্রতিটি বাঁকে, সেই সব কিছুকে ‘চ্যালেঞ্জ’ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন হেয়ার সাহেব। সে’সব কথা উঠে এসেছে বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে। বই প্রকাশের পর লেখক সরোজেশ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপচারিতার পর্ব চলে। লেখকের সঙ্গে কথা বলেন ঔপন্যাসিক ও কবি অমিত চৌধুরী এবং ঐতিহাসিক ডঃ রসিঙ্কা চৌধুরী। ডঃ চৌধুরী ডেভিড হেয়ারের সমকালীন সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলেন। অন্যদিকে, অমিত চৌধুরীর কথোপকথনে উঠে আসে এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ডেভিড হেয়ারের অবদানের প্রসঙ্গ।

সরোজেশ বলেন, “এটা শুধুমাত্র একটা জীবনীগ্রন্থ নয়। বরং ভারতের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ের প্রবেশদ্বার এটি।” তাঁর কথায়, ডেভিড হেয়ারের কাহিনি নতুন আশার সঞ্চার করে। কীভাবে শিক্ষার দ্বারা সমাজের বদ্ধমূল ধারণার বদল সম্ভব, তাই-ই ডেভিড হেয়ার গোটা জীবনে শিখিয়ে গিয়েছেন।
শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে লেখকের মুখে ডেভিড হেয়ারের সংগ্রামের কথা শুনছিলেন। সমস্ত ধরনের বিভাজন নির্বিশেষে সকলের জন্য শিক্ষার দাবিতে লড়েছেন হেয়ার। রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বহু বাধা এসেছে। তা জয় করে হিন্দু কলেজ (অধুনা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়), ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়তে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন স্কটিশ সাহেব। একদিকে যেমন বাধা এসেছে গোঁড়া হিন্দু সমাজের তরফে, পাশাপাশি খিস্টসমাজও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।

প্রশ্ন করছেন শ্রোতারা
শ্রোতাদের মধ্যে থেকেও এদিন সন্ধ্যায় প্রশ্ন উঠে এসেছে, লেখকের কথা শুনে তাঁরাও হেয়ারের জীবন নিয়ে আরও আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। সুদক্ষ ভাবে ডেভিড হেয়ারের জীবন ও সমসাময়িক সময়ের সফর করান লেখক। এদিনের বই প্রকাশ অনুষ্ঠান থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট হয় যে, ‘দ্য লাইফ অ্যান্ড টাইমস অফ ডেভিড হেয়ার: ফার্স্ট সেক্যুলার এডুকেশনিস্ট অফ ইন্ডিয়া’ বইটির মাধ্যমে হেয়ার ও শিক্ষার জন্য তাঁর নিরলস সংগ্রামের কাহিনি তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাবে। লেখকের বিশ্বাস এ জীবনীগ্রন্থ, এক বহুমাত্রিক প্রতিভার কর্মজীবন ও তাঁর সমসাময়িক সময়ের দলিল হয়ে উঠবে।
