
আজ সপ্তমতম যোগ দিবস
যোগাসন কী এবং কেন, তা নিয়ে আমার মতো সাধারণ মানুষের নতুন করে প্রগলভতা সাজে না, যেখানে বহুদিন হল স্বেচ্ছায় এ গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন আমাদের দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর অনুগামীবৃন্দ। তবু, ২১ জুন, বিশ্ব যোগ দিবস উপলক্ষে কয়েকটা কথা বলছি।
২১ জুন তারিখটি বিশ্ব যোগ দিবস হিসেবে পালিত হবে, রাষ্ট্রসংঘ ২০১১ সালের ৬৯ তম সাধারণ সভায় এই প্রস্তাব পাশ করে। সেইমত ২০১৪ সাল থেকে এই দিনটি পালিত হচ্ছে সারা বিশ্বে। নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। আর তার থেকেও গুরত্বপূর্ণ হল, সে অধিবেশনে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, “যোগ আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্যের এক অমূল্য উপহার। যোগের অর্থ মন ও শরীরের, চিন্তা ও কর্মের যোগ। যোগ শুধু ব্যায়াম নয়, নিজের মধ্যে একত্ব ও সারা বিশ্ব ও প্রকৃতির অনুভূতি আবিষ্কারের পথ।”
কথাগুলি অস্বীকার করার এক ইঞ্চি জায়গাও নেই। সেই ‘স্পিচ’ দেওয়ার পর কী যে হল, চারিদিকে কেবলই ‘ধন্য ধন্য’ রব। কেবলই মনে হতে লাগল, এতদিন ভারতে কোনও ‘যোগ-স্বাধীনতা আন্দোলন’ চলছিল, যার পথিকৃৎ তিনি। যেন UN নয়, এটা ভারত সরকারেরই সিদ্ধান্ত। অনেকে বলেন, ভারতের মতো ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক-‘হিন্দু’ দেশের জন্য এই সিদ্ধান্ত নতুন ভোর নিয়ে আসবে। ২০১৫ সালে খড়গপুর আইআইটি-র জিমখানায় যোগ শিবিরে যোগদান করে কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী হর্ষবর্ধন মহাশয় তো বলেই ফেলেছিলেন, “বিশ্বের ১৯২টি দেশ একযোগে যোগ দিবস পালন করছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নাম ইতিহাসে লেখা থাকবে।”
বিগত কয়েক বছর অন্যান্য দেশের সঙ্গে ভারতে ধুমধাম করে যোগ দিবস পালিত হয়। নয়া দিল্লির রাজপথে আসন পেতে সক্কাল সক্কাল সরল-জটিল বিভিন্ন যোগাসন করেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে শত শত শিল্পপতি, তারকা, নামজাদা লোকেরা সেদিন রাস্তায় নেমে কপালভাতি, অনুলোম-বিলোম করেন। প্রায় সারাদিনই টিভির সরাসরি সম্প্রচারে দেখানো হয় সেসব। ষষ্ঠ ও সপ্তম বছরে করোনার জন্য সেই বিশাল কর্মকান্ডে ভাটা পড়লেও মনে পড়ছে, টিভিতে দেখতাম আসন করার মাঝে মাঝে ঘাম মুছছেন প্রধানমন্ত্রী। এই ‘ঘাম’ প্রসঙ্গেই মনে পড়ল, তিনি বারবার বলে থাকেন, তাঁর পুরোটাই জাতির উদ্দেশ্যে অর্পিত, তাই প্রশ্ন জাগে যাঁরা প্রকৃত অর্থেই ‘ঘেমো’ – দিনমজুর, কুলি, মুচি, সাফাইকর্মী, ঝুপড়িবাসী, ফুটপাথবাসী… তাঁদের তো পেটের ভাত আর আশ্রয় জোগাতেই ঘাম ছুটে যায়, তাঁরা কি প্রাচীন ঐতিহ্যের এই অমূল্য উপহার, মন, শরীর, চিন্তা ও কর্মের যোগ, নিজের মধ্যে একত্ব ও সারা বিশ্ব ও প্রকৃতির অনুভূতি আবিষ্কারের পথটি চেনেন? তাঁদের জীবনে এই দিনটির তাৎপর্য কী?
এই প্রশ্নের সঙ্গে ‘যোগ দিবস’ মানা বা না মানার কোনও প্রাসঙ্গিকতা নেই। শুধু এটুকুই বলার যে, যোগ নিয়ে বারবার প্রাচীন ইতিহাসের যে ধ্বজা নাড়ানো হয়, সেই ইতিহাসে কিন্তু দেখনদারি ছিল না। যোগ নিভৃতে হয়, এটা কোনও ‘লাফিং ক্লাব’-এর বিধি নয় যে খোলা ময়দানে হো হো করে করতে হবে। যে কোনও চর্চার মতো যোগচর্চাও একটি নির্দিষ্ট দিবসের ব্যাপার নয়, নিয়মিত যোগচর্চা করুন শরীর এবং মনকে সতেজ রাখতে, রাজনীতি বা ধর্মের জিগিরে নয়।
ছবিঃ
উপায়-যোগা ডট কম
