
সদ্য সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পেলেন কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়
সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পেলেন কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়। এই স্বীকৃতি তাঁকে আরও বৃহত্তর পাঠক সমাজে পরিচিত করে তুলবে নিঃসন্দেহে, তবে গত চার দশকের ধারাবাহিক এই অক্ষর যাত্রা আমাদের বিশেষ সমাদর কেন দাবি করবে তা নিয়ে আলোচনা জরুরি।
কবিতার অন্তর্নিহিত একটি স্বর থাকে, একটি নিভৃত উচ্চারণ থাকে, যার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় কবির সংবেদন। এটা হয় অনেকটা ম্যাজিকের মতো। ঠিক সে কারণেই ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বলে কিছু হয় না। কবিতা নামক প্রবাহের সামনে দাঁড়িয়ে কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, “নিজেকে কবি ভাবতে গেলে এক ঠান্ডা ঘামে শরীর জবজবিয়ে ওঠে ভয়ে”। কবিতার অপৌরুষেয় প্রসব-উল্লাসকে প্রণাম জানাচ্ছেন অবলীলায় এই কবি৷ কিন্তু বাংলা ভাষা আজ অবধি যত কবিকে প্রসব করেছে তার মধ্যে প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্থান ঠিক কোথায়? কবিতা ও পাঠকের মহাসমুদ্রে কোন বিশেষ তরণী বেয়েছেন তিনি?

ছুঁৎমার্গহীন শব্দচয়ন বিস্মিত করে তোলে। যখন আমরা ‘বালি ও তরমুজ’ পেরিয়ে বা ‘উন্মেষ গোধূলি’ পেরিয়ে ‘বঙ্গীয় চতুর্দশপদী’ বা ‘উত্তর কোলকাতার কবিতা’ কাব্যগ্রন্থের দিকে চোখ রাখি, এক নিবিড় অধ্যায়নে পাঠকের এটা বুঝে ওঠা অসম্ভব নয় যে কবি ধীরে ধীরে আত্মদর্শনে মোহাবিষ্ট হয়ে উঠছেন।
১৯৮৩ সালে প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘বালি ও তরমুজ’। এ সময়ে কবিতা লিখছেন রনজিৎ দাশ, মৃদুল দাশগুপ্ত, গৌতম চৌধুরী প্রমুখরা। বলা বাহুল্য সমকালীন বাংলা কবিতায় এই কাব্যগ্রন্থটি স্বতন্ত্রতার পরিচয় দিয়েছিল। অপ্রতিম সেই উচ্চারণ, “বিপ্রদাস, এসো ভাই মধুপুর মধুপুর খেলা করি…” নতুন চাঁদোয়া টাঙিয়ে দিল বাংলা কাব্যের বিগ্রহের ওপর। পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে কবি যেন একটি বিরোধ লাগিয়ে দিয়েছেন অন্তঃপ্রকৃতি আর বহিঃপ্রকৃতির মধ্যে। ক্রমাগত যাতায়াত করেছে অনেক চরিত্র, কিংবা বলা ভালো ফ্র্যাগমেন্টেড সোল! খণ্ড খণ্ড দৃশ্য, চিত্রকল্প আর বর্ণনার প্রাসাদে লিপিবদ্ধ হয়েছে বিধুর সংলাপ, কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে আবহটা হয়ে উঠছে অস্থির, প্রগলভ। মনে রাখতে হবে কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রিয়তম কবি হলেন উৎপল কুমার বসু, যাঁর পুরী সিরিজকে তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ বলে মনে করেন। উৎপল কুমার বসুর মতোই তিনি ‘তৃতীয় বিশ্বের কোনো প্রচ্ছন্ন বন্দরে’ বসে ‘আদার গভীরে’ যেতে চেয়েছিলেন।
ছুঁৎমার্গহীন শব্দচয়ন বিস্মিত করে তোলে। যখন আমরা ‘বালি ও তরমুজ’ পেরিয়ে বা ‘উন্মেষ গোধূলি’ পেরিয়ে ‘বঙ্গীয় চতুর্দশপদী’ বা ‘উত্তর কোলকাতার কবিতা’ কাব্যগ্রন্থের দিকে চোখ রাখি, এক নিবিড় অধ্যায়নে পাঠকের এটা বুঝে ওঠা অসম্ভব নয় যে কবি ধীরে ধীরে আত্মদর্শনে মোহাবিষ্ট হয়ে উঠছেন। তৈরি করছেন আয়না। প্রথম জীবনে নকশাল আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত কবিমানস প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার ধার ঘেঁষে যে শব্দ আঙিনা রচনা করেছিল, কালক্রমে তার কেন্দ্রে উপবিষ্ট হল আত্মদর্শন। কবি লেখেন, “এই ধ্বংস অনিবার্য ছিল…” প্রলয়ের এই অনিবার্যতার সামনে কবি ছুড়ে দেন প্রত্যয়ী সলিলোকি, “দেখা হবে অন্য চিত্রনাট্যের আলোয়…”। আর এখানেই কবি আত্মিক উন্মোচনের কাজটা শুরু করেন। নিজেকে বলেন ‘সমন্বয়বাদী আধ্যাত্মিক’। ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ তাঁর প্রপিতামহ। যিনি রবীন্দ্রনাথের মতোই বিশ্বাস রাখতেন সেই অপ্রাকৃত পূর্ণতায়। দৈনন্দিন সব কিছুই সেই পূর্ণের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই বিশ্বাস উত্তরাধিকার সূত্রে আলোচ্য কবিও পেয়েছিলেন।

‘উত্তর কলকাতার কবি’ নামে কেন পরিচিত হলেন এই নিয়ে বিস্তর তর্ক করা যেতে পারে। উত্তর কলকাতার কবিতা নামক কাব্যগ্রন্থই প্রথম নিদর্শন, যা এক অনাবিল, উন্মুক্ত ভূগোল-চেতনাকে ঠাঁই দিল কবিতার অন্তরে। কবির নিজের কথায়, “উত্তর কলকাতা ইজ লেস স্পেস স্পেসিফিক অ্যান্ড মোর কালচার স্পেসিফিক। আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই একটা উত্তর কলকাতা আছে…”। অর্থাৎ একটা স্পেস, যে নিভৃতিতে একখাবলা প্রাজ্ঞতা আর সমাজ মনস্ক আবেদন মিলেমিশে আধ্যাত্ম্যের পিছনে ধাবিত হচ্ছে, সেই স্পেসের নামই উত্তর কলকাতা৷ ধরে নেওয়া যেতে পারে যে এই মনোলজিক্যাল স্পেসেই কবি তাঁর ছুঁৎমার্গহীন শব্দমালাকে লোকায়ত হাওয়ায় আরও খানিকটা ভাসিয়ে দিতে উজ্জীবিত হয়েছিলেন। তাজ্জব হয়ে যেতে হয় যখন আমরা পড়ি:
“এরই মধ্যে কী তাজ্জব ধূপছাঁও দর্দ এ দিল খুঁজে
আপকি নজরো নে সামঝা পেয়ার কে কাবিল মুঝে, মুঝে?”
এই স্বর, এই সপ্রতিভতা একেবারেই কবির স্বতন্ত্র অভিজ্ঞান প্রসূত।

কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় স্থানিক কবি নন। সত্তরের ক্রান্তিকারী কবিও নন। আনন্দ ভিখিরি বা গুপ্ত দাম্পত্যকথা-র মতো কাব্যগ্রন্থ ছুঁয়ে গেলে বরং মনে হয় কবি অনেক বেশি মিস্টিক। তাঁর রোয়াকি ভাষার ব্যবহার নান্দনিক বাবুয়ানিকে কাউন্টার করে। তৈরি করে অন্তর্ঘাত।
বিগত বিয়াল্লিশ বছর ধরে চলা এই কাব্য পরিক্রমা খেয়াল করলে এটা স্পষ্টতই বোঝা যায় যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কবির ভঙ্গিমা অনবরত বদলেছে। কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়কে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের কবি বলা যায় কি? গণিতজ্ঞের ভাষায় বলা যায়, Definite integrals within given limits. অর্থাৎ ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের নানা বৈচিত্র্যের ভিতর তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অঙ্কফলের চিত্রগুলি পরিষ্ফূট হয়ে ওঠে। কাব্যের সমগ্রতা ধরা পড়ে কল্পনা, বাস্তব ও মননের অভূতপূর্ব মিশেলে। আরম্ভ থেকে শেষ অবধি গভীর এক স্বরপ্রবাহ এবং অবলোকিত সমস্ত স্থানকাল, মানুষ এবং সমন্বয় ভাবনায় অন্তর্গত হয় প্রাণী ও বস্তুপুঞ্জ। শেষ বিকেলের ভাঙা আলো গড়িয়ে পড়ে কবির শব্দে:
“ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ সরিয়ে রাখো
আমাকে ভেতরে যেতে দাও
এছাড়া কিছুই জরুরি নয় তেমন…”
আরও পড়ুন: অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত : আজীবনের বিশ্ববাউল
অন্তর্নিহিত এই চেতনা, মননের গভীরে প্রবিষ্ট হওয়ার এই অনায়াস প্রচেষ্টাই আজ কীর্তির মিনারে কবিকে উত্তীর্ণ করেছে। প্রথম পর্বের সৃষ্টিতে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সুচারু ভাবে থাকলেও কালক্রমে কবিতার গতিপথ বিচিত্র সোপান ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলে। এই প্রসঙ্গে কবির নিজেরই একটি বক্তব্য অত্যন্ত জরুরি। কবির কথায়, “আমি শিল্পকে খুব একটা socio জিনিস বলে মনে করতাম না। শিল্পের বিষয় উপাদান সামাজিক ও রাজনৈতিক হলেও তার যে alchemy দিয়ে আলটিমেট শিল্প বস্তুটি তৈরি হয়, তা সামাজিক বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে খুব একটা অংশগ্রহণ করে বলে মনে হয় না।”

কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় স্থানিক কবি নন। সত্তরের ক্রান্তিকারী কবিও নন। আনন্দ ভিখিরি বা গুপ্ত দাম্পত্যকথা-র মতো কাব্যগ্রন্থ ছুঁয়ে গেলে বরং মনে হয় কবি অনেক বেশি মিস্টিক। তাঁর রোয়াকি ভাষার ব্যবহার নান্দনিক বাবুয়ানিকে কাউন্টার করে। তৈরি করে অন্তর্ঘাত। ‘বালি ও তরমুজ’ থেকে ‘টুরিস্ট কাহিনি’ অবধি এই বিস্তৃত মানস পরিসরে তাই কবিকে রেখে যেতে হয় টুকরো টুকরো বিষাদ, গল্প, আদর, প্রেম, শস্য, গঙ্গা বা গামছার মতো কিছু, যার জন্য অতিকাল যায়, অতিকাল থামে…
