
নিমাই ঘোষকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করছেন পিনাকী দে
নিমাইদার সঙ্গে আমি প্রথম দেখা করেছিলাম ২০১০ সালে। কলকাতার ওপর তাঁর এক ফটোবুকের ডিজাইনারের দায়িত্বে ছিলাম আমি। ওই সন্ধের কথা খুবই মনে পড়ে। হার্পার কলিন্স ইন্ডিয়ার প্রকাশক ভিকে কার্তিকা এবং সম্পাদক শান্তনু রায়চৌধুরীর সঙ্গে গিয়েছিলাম তাঁর কালীঘাট রোডের বাড়িতে। অবশ্য অনেক আগে থেকেই ‘নিমাই ঘোষ’ নামটা আমার কাছে এক বিশেষ অনুভূতি নিয়ে আসে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন আমার কলেজ জীবন চলছে। মাসখানেকের চেষ্টায় ‘Satyajit Ray and the Vision of Cinema’ নামের চড়া দামের একটা বই কিনেছিলাম। অ্যান্ড্রিউ রবিনসনের টেক্সট এবং প্রকাশক আইবি টরিস। বইয়ে নিমাইদার তোলা সাদাকালো ছবিতে যেন আমার চোখের সামনে ফুটে উঠেছিল নানা দৃশ্য – স্টাডিতে অথবা শুটিং স্পটে কাজ করে চলেছেন সত্যজিৎ রায়।
সত্যজিৎ রায়
‘অশনি সংকেত’-এর শুটিং
‘আগন্তুক’
সেই দুর্মূল্য বইটি নিয়ে নিমাইদার বাড়ির সরু প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকলাম। মনে তখন স্বপ্নের মানুষটিকে দেখার জন্য তীব্র উত্তেজনা। আমাদের কাজ নিয়ে কথাবার্তা শুরু হওয়ার পর বুঝলাম, কেমন করে নিমাইদা একজন কিংবদন্তিতে পরিণত হলেন। কেরিয়ারের শেষ পর্যায়ে এসেও তাঁর শিশুর মতো উৎসাহ। নতুন অ্যাডভ্যাঞ্চারের জন্য মুখিয়ে আছেন। ফেরার সময় সেই বইতে ওঁর অটোগ্রাফ চাইলাম। খানিক হেসে তিনি যে কথা সেদিন বলেছিলেন তা আজও কানে বাজে, “আমার সঙ্গে কাজ করতে গেলে ভক্ত হলে চলবে না। নইলে তা তোমার দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করবে। তুমি যেভাবে কাজ করতে চাও, তার স্বাধীনতা পাবে। তোমার কাজকে আমি শ্রদ্ধা করব, তুমিও আমার কাজকে তাই করবে। এভাবেই সহজ হয়ে যাবে সবকিছু”। সেদিন তিনি সই করেননি। অবশেষে ওই প্রোজেক্ট মিটে যাওয়ার পর অটোগ্রাফ দিয়েছিলেন। এখনও সেই বই আমার দুর্লভ সংগ্রহ হয়ে রয়েছে।
‘ঘরে বাইরে’
রায় পরিবার
মৃণাল সেন
আমাদের সেই কাজ শেষ হল ২০১৪ সালে। ‘Nemai Ghosh’s Kolkata’ নামের বইটি প্রকাশ করল হার্পার কলিন্স। ওই চার বছর তাঁর সংস্পর্শে থেকে আমার জীবনে একটা বড়োসড়ো বদল ঘটে যায়। প্রথম দিকে নিমাইদা আমাকে সপ্তাহে দু’বার করে ডাকতেন। তারপর সেটা দিনে একবার হয়ে দাঁড়াল। বেশ কিছু প্রোজেক্ট নিয়ে আলোচনা করতেন, যেগুলোর বেশিরভাগই বাস্তবায়িত হয়নি। নতুন কিছু শুরু করার কথা বলতেন। মাঝেমাঝে এটাও বলতেন যে আরও ভালো বোধ করা এবং সৃজনের পথে বাঁচার জন্য দিনে একবার কথা বলাটা জরুরি। দীর্ঘ ১০ বছর এই রুটিনের কোনো বদল ঘটেনি। প্রায়েই তাঁর কালীঘাট রোডের বাড়ি যেতাম। শেষ দু’মাস একটা অস্ত্রোপচারের পর তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন – তার আগে পর্যন্ত। একটা নতুন জগৎ খুলে গিয়েছিল আমার সামনে। আমাকে নিমাইদা ‘আপনি’ বলে ডাকতেন। ‘তুমি’ বলতে জোরাজুরি করা সত্ত্বেও সম্বোধন পাল্টাননি। প্রতি সপ্তাহে তাঁর বিপুল অভিজ্ঞতা থেকে উজাড় করে গল্প শোনাতেন। অতিরঞ্জন প্রায় করতেনই না। বলা যেতে পারে, তাঁর এই স্বভাব মোটেও বাঙালিসুলভ নয়।
উৎপল দত্ত
শম্ভু এবং তৃপ্তি মিত্র

ঊষা গঙ্গোপাধ্যায়
নিমাইদাকে বলা হয় ‘সত্যজিৎ রায়ের বজওয়েল’। কথাটি একেবারে যথার্থ। সত্যজিৎকে নিয়ে তাঁর কাজ খুবই গোছানো। সেই অনবদ্য কাজগুলো নিয়ে Delhi Art Gallery একটা নতুন বই প্রকাশ করেছে, নাম ‘Faces and Facets: Satyajit Ray in Colour’। টেক্সট – অ্যান্ড্রিউ রবিনসন। একবার নিমাইদাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “কেন সত্যজিৎকে নিয়ে কাজ করতে চাইলেন?”। বলেছিলেন, “কে চাইবে না?” যখনই তিনি সত্যজিতের কথা বলতেন, চোখে এক জ্যোতি ফুটে উঠত।

খনি শ্রমিক
খুব অল্প লোকই জানে, অন্য নানা বিষয় নিয়েও নিমাইদা ফটোগ্রাফি করেছেন। বাংলার থিয়েটারের স্বর্ণযুগকে ধরে রেখেছেন ক্যামেরায়। কৃত্রিম আলো একদমই ব্যবহার করতেন না তিনি। খনির ভিতরে গিয়ে কয়লা শ্রমিকদের ছবি তুলেছেন। সেইসব ছবি এখনও অপ্রকাশিত। মাটি নিচে গিয়ে হেলমেটের হেডলাইটের আলোতেই কাজ করেছেন। ইতালির চলচ্চিত্রকার মিকেল্যাঞ্জেলো আন্তোনিওনির ফটোগ্রাফি করেছেন। যখন আন্তোনিওনি কলকাতায় এসেছিলেন এবং ইতালিতে তাঁর নিজস্ব স্টুডিও – দুই জায়গাতেই। বিশিষ্ট শিল্পীদের নিয়ে নিমাইদার কাজ ধরা আছে ‘The Faces of Indian Art: Through the lens of Nemai Ghosh’ বইতে। টেক্সট – ইনা পুরি, প্রকাশক – আর্ট অ্যালাইভ গ্যালারি। ছবির গোটা সিরিজে গরহাজির শুধু গণেশ পাইন। এই অনুপস্থিতি নিমাইদাকে কম কষ্ট দেয়নি। পরেশ মাইতির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ কাজ ওয়েস্টল্যান্ড প্রকাশ করে ইনা পুরির টেক্সট নিয়ে, যার নাম ‘Paresh Maity: A Portrait of the Artist in the World’। এটাই নিমাইদার শেষ প্রকাশিত বই। আদিবাসীদের নিয়ে বিপুল গবেষণা করেছেন। তাঁদের ছবি নিতে ছুটে বেরিয়েছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। তাঁর রঙিন পোট্রেটের সংগ্রহ বই আকারে বেরোনোর কথা ছিল। তবে নানা কারণে সেটা হয়ে ওঠেনি, যার ফলে বেশ যন্ত্রণা পেয়েছিলেন তিনি। মাঝেমাঝেই বলতেন, সৃজনের মধ্যে না থাকলে মারা যাবেন। বিশ্বাস করা শক্ত, তাঁর শেষ প্রোজেক্ট ছিল হুইল চেয়ারে বসে সাদা কালো ছবিতে অমৃতসর স্বর্ণমন্দিরের মূল স্পিরিটকে ধরা। এই কাজ অসমাপ্ত থেকে যায়। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে তিনি নিয়মিত প্রাতঃভ্রমণে যেতেন। ভিক্টোরিয়ার ছবি তোলার অনুমতি না পেয়ে বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলেন নিমাইদা।
মিকেল্যাঞ্জেলো আন্তোনিওনি
রামকিঙ্কর
এসবের মধ্যেই তাঁর প্রিয় শহর কলকাতার ছবি তুলেছেন। একবার কিছু স্টিল ছবির জন্য আমরা ন্যাশানাল লাইব্রেরি গিয়েছিলাম। গোটা পরিবেশকে আমি যখন আত্মস্থ করার চেষ্টা করছি, নিমাইদা হঠাৎ বললেন, “পিনাকী, এবার যাব। লাঞ্চের সময় হয়েছে”। অবাক হয়ে বিড়বিড় করলাম, “কিন্তু নিমাইদা, আমরা তো সবেমাত্র এলাম”। তাঁর ঝটতি উত্তর, “ছবি নেওয়ার আগে অনেকবার এখানে এসেছি আমি। ক্যামেরায় ক্লিক করার আগেই ছবিটাকে কল্পনা করে নিয়েছি। সবার আগে প্রয়োজন মনের ভিতর ছবি ফুটিয়ে তোলা। নইলে কখনই পছন্দমতো ফটোগ্রাফ পাবে না”। সারা জীবন অ্যানালগ ফিল্মই ব্যবহার করে গিয়েছেন। ডিজিটাল ফটোগ্রাফি একদম পছন্দ করতেন না। তার একটা কারণ তিনি বলতেন, ডিজিটাল মাধ্যম ফটোগ্রাফারকে সংযত হতে দেয় না। “না ভেবেই তুমি একের পর এক ক্লিক করে যাবে”, প্রায়ই বলতেন।
নিমাইদা চলে গেলেন। রেখে গিয়েছেন তাঁর ছবিগুলো – স্তব্ধ হয়ে ভাবার জন্য। বারবার ভাবার জন্য।
আদিবাসী সিরিজ
ফটোগ্রাফ সৌজন্যে – সাত্যকি ঘোষ
