
বইচিত্র সভাঘরে চলছে এক মায়াময় আলোকচিত্র প্রদর্শন
মায়ানগরী কলকাতা। কয়েকশো বছরের পুরোনো এর ইতিহাস যেন এক জীবন্ত রূপকথা। কিংবা ঠিক রূপকথা নয়। ম্যাজিক রিয়েলিজম। বাস্তবতার আনাচে কানাচে হঠাৎ জাদুর ঝলকানি হানা দিয়ে যায়। সে জাদুকে ধরতে গেলে আলাদা মন চাই। তার কারসাজি দেখতে চাই আলাদা চোখ। ওই চোখ সবার থাকে না। আর যে মানুষদের সেই বিরল দৃষ্টিশক্তির অধিকারী হয়, তারা যদি চায় সমস্ত রস কাছের মানুষদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে, তাহলে তো আর কথাই নেই। ক্যামেরার ক্ষীপ্রতায় তারা বন্দি করে ফেলে সেই রহস্যময় মুহূর্তগুলো। সাজিয়ে রেখে দেয় প্রিয় মানুষদের সামনে। তারপরও যদি সেই জাদু কেউ উপভোগ করতে না পারে, লজিক দিয়ে ম্যাজিককে খণ্ডন করতে চায়, তখন ‘ডাকঘর’ নাটকের সেই ঠাকুরদার মতো বলে ওঠে তারা, “চুপ করো অবিশ্বাসী! কথা কোয়ো না!”

সেই রকমই দুই জাদুশিকারির তোলা ছবির প্রদর্শন চলছে বইপাড়ায়, বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিটে কফি হাউজের তিন তলায়, বইচিত্র সভাঘরে। গত সোমবার শুরু হয়েছে, চলবে আজ পর্যন্ত। তরুণ ফটোগ্রাফার সৌম্যশ্রী চন্দ্র এবং মুকুট তপাদার দু’জনেই থাকেন বরানগরে। ‘চিত্র কথা’ নামের প্রদর্শনটিতে দুই ফটোগ্রাফার এমন কিছু অলৌকিক দৃশ্যকে লেন্সবন্দি করে হাজির করেছেন দর্শকদের সামনে যে, একবার দেখলে বেশ খানিকটা সময় বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কোনো উপায় নেই। দুজনেরই মূল কৌতূহলের বিষয় শহুরে দৈনন্দিন জীবন। তবে গ্রাম বাংলার বিপুল ধনভাণ্ডারকেও তাঁরা উপেক্ষা করেননি। তাই কখনও টেরাকোটার মন্দির, কখনও ছৌ মুখোশে তাঁরা ক্যামেরা ফোকাস করেছেন। আর মহানগরীর বিরল নান্দনিক চাবিকাঠি তো রয়েছেই এক্সিবিশনে।

দুই ফটোগ্রাফারই মনে মনে গুরু হিসেবে মানেন সত্যজিৎ রায়, নিমাই ঘোষ এবং রঘু রাইকে। মুকুট নিজে ‘কলকাতা কালচার’ নামের একটি ব্লগ চালান, পুরোনো কলকাতার ঐতিহ্যকে মেলে ধরেন পাঠকের সামনে। ডিজিটাল মিডিয়ায় কাজ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। সৌম্যশ্রীকে ছবির নেশায় ধরেছে প্রায় দু’বছর আগে। বাবার সঙ্গে পুরোনো কলকাতায় ঘুরতে ঘুরতে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন সাধারণের মধ্যে অসাধারণ দৃশ্যগুলোকে। সেই থেকেই শুরু। স্ট্রিট ফটোগ্রাফির দিকেই তাঁর বেশি ঝোঁক। দুই ফটোগ্রাফারই উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়িগুলোতে ঘুরে ঘুরে সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন, সেই বাড়ির ইতিহাস সম্পর্কে খোঁজ নেন, এইভাবে তাঁদের ফটোগ্রাফি শহরের ধূপছায়া মাখা অতীতের মধ্যে খুঁজে পায় এক অতিপ্রাকৃতিক গভীরতা। আর সময়ে অসময়ে তাঁরা চোখ রাখেন ‘বঙ্গদর্শন’-এর ফেসবুক পেজ-এ, সেখান থেকেও সংগ্রহ করে নেন ফটোগ্রাফির উপাদান, নান্দনিকতার প্রেরণা।
