দুপুরের আলো দিয়ে আসন্ন বিকেলকে স্তব্ধ করে দিতে জানে চৌরাসিয়ার বাঁশি

৮৫তম জন্মদিনে হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া

ম্পূর্ণ অন্ধকার এক প্রেক্ষাগৃহ আর সম্পূর্ণ অন্ধকার কোণের একটা ঘর। দুটো জায়গাতেই বাজচ্ছে রাগ হংসধ্বনি। গান্ধার পেরিয়ে পঞ্চম, পঞ্চম পেরিয়ে ঋষভ তারপরই ষড়জে অবশ্যম্ভাবী বিশ্রাম, কিন্তু রাগের ধৈবত হীনতা একবারও বুঝতে দিচ্ছেন না বংশীবাদক। বরং প্রেক্ষাগৃহ বাঁশির আচ্ছন্নতায় আনন্দের প্রস্রবণে থইথই আর যে কোণের ঘরে অভিমানী ছেলেটা দেখতে পাচ্ছিল না কিছুই, সে অবাক হয়ে দেখছে কে যেন কখন তাঁকে টেনে নিয়ে এসেছে গহন বনের ধারে আলোর প্রাচুর্যের ঠিক মাঝখানে! নিরুপায় হয়ে ক্যাসেট উল্টে-পাল্টে দেখে, নাম পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া। লাইভ, পুনে, ২০০৩। সেই, প্রথম আমাদের আলাপ।

মনে আছে ৬ বছর আগে প্যারিসে বসবাসকালে, ‘নুই দু রাগা’ (রাত-ভরা রাগ) এর অনুষ্ঠানে ওঁর শান্ত, সমাহিত ঝিঁঝোটি রাগের নিবেদন। ওঁর বার্ধক্য যেন থমকে দাঁড়িয়ে দেখছে কিভাবে অষ্টাদশ বৎসরের সব সাধনা এসে পুঞ্জিভূত হয়েছে এই বাজানোয়। এই অপেক্ষায়। তাই বোধহয় তাঁর বিদেশী ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা এত বিপুল।

সেবার আমার খুব জ্বর হল। স্কুলে পড়ি। পুরোপুরি সেরে উঠিনি, আমাদের ডোভার লেনে যাওয়া প্রায় বাতিল। কিন্তু আমি যাবই। ততদিনে যে সমস্ত শুদ্ধ স্বর অধ্যুষিত রাগ সারং, ভূপালী-যারা এর আগে আমাকে সেভাবে কোনোদিন আলোড়িত করেনি- কেবল একজনই অবলীলায় তাঁর বাঁশিতে সেইসব রাগের কিনারে আমাকে নিবিড় নিমজ্জনে পৌঁছিয়ে দিতে পেরেছেন। তাঁর বাজানো আমাকে শুনতেই হবে। 

আশা ভোঁসলে, লতা মঙ্গেশকরদের সঙ্গে গানের মহড়ায়

ভরিয়ে দিয়েছিলেন সেদিন হরিপ্রসাদ। ভাবতে অবাক লাগে যে অন্নপূর্ণাদেবীর একটি আদেশে, ডান হাত থেকে বাঁ হাতে বাঁশি বাজানো শুরু – কেবল, গুরুর কাছে সম্পূর্ণ সমর্পণের জন্য। যে সমর্পণ তাঁর বাঁশির সুরে সুরে, তাঁর অন্তরতম সংগীতবোধের সঙ্গে ওতপ্রোত। নাহলে এইভাবে যে মধুবন্তী বাজানো যায় না—দুপুরের আলো দিয়ে আসন্ন বিকেলকে এইরকম স্তব্ধ করে দেওয়া যায় না। প্রকৃতপক্ষে যে সেনিয়া মাইহার ঐতিহ্যের ধ্রুপদ শৈলীর বরহত তাঁর খেয়ালে হরিপ্রসাদ অধ্যয়ণ করেছেন বহু বহু বছরব্যাপী অধ্যাবসায়, অন্নপূর্ণার দক্ষ, সতর্ক শিক্ষাদানে, পরিচালনায়, তাঁর তুলনা এ ভারতবর্ষে বিরল। 

এই যে ছোটবেলায় বাবার আদেশ সত্ত্বেও কুস্তীগির হওয়া হল না তাঁর, সেই শিক্ষার শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণবোধ কিন্তু রয়ে গেল এবং তার সংগীতকে জারিয়ে তুলল এক অপরিসীম প্রাবল্যে। সেই প্রাবল্য পরিমিতি বোঝে, বোঝে মিঠাস্। বোঝে মাধুর্য্যই রাজত্ব করবে, বোঝে তানের দানাগুলি হবে আলোর বিচ্ছুরণ, অকারণ গমকের ভার তাতে না থাকাই ভালো, আলাপ-বিস্তারে স্বরের মোহময় হাতছানির কাছে নতি স্বীকার করাই শ্রেয়। যাঁরা তাঁর দেশ, আহির-ললিত, চন্দ্রকন্স শুনেছেন, তাঁরা জানেন। বহু বছর আগে, দূরদর্শনে কালো চুল সুদর্শন হরিপ্রসাদের উস্তাদ জাকির হুসেনের সঙ্গে বাজানো পাহাড়ি ধুন যেমন এই সেদিন নতুন করে মুগ্ধ করল আমায়। প্রত্যেকটি স্বর-ক্ষেপণ, প্রত্যেকটি তান, প্রত্যেকটি অবিস্মরণীয় মীড় যেন কলি থেকে পুষ্প হয়ে ওঠার কাহিনি। আমার প্রিয় অবশ্য তাঁর বাজানো, দেশি তোড়ির খেয়াল। এক প্রসরণশীল বাঁশি যেন দেখিয়ে দিচ্ছে কিরকমভাবে সুবাসিত দুঃখেরা গান গায়। কিভাবে পান্না-চুনির গায়ে গায়ে চুঁইয়ে পড়া দুঃখের ছাপ।

শঙ্কর ফ্যামিলি অ্যান্ড ফ্রেন্ডসের সঙ্গে

হরিপ্রসাদ কেবল শ্রোতাদের আবেশে ভরিয়ে রাখাতেই থেমে থাকেননি, হয়ে উঠেছেন অনন্যতায় ভরপুর এক শিল্পী যিনি জানেন যে ব্যক্তিগত সাংগীতিক গণ্ডি অতিক্রম করে বিশ্ব স্পর্শ করার গুরুত্ব। পণ্ডিত শিব কুমার শর্মার সঙ্গে তাঁর বহু অ্যালবাম ও অনুষ্ঠান এই মনোভাবের সাক্ষী। এমনকি তাঁর সংগীত-নির্দেশনায় ও ভুবনেশ্বর মিশ্রের পরিচালনায় বহু ওড়িয়া চলচ্চিত্রও এই আধুনিকতার সাক্ষ্যবাহী। ১৯৬৪ সালের বিটলস্-এর ‘ইনার লাইট’ অ্যালবামে তাঁর বাঁশি বাজানো। এই যে তখনকার জর্জ হ্যারিসন-রবিশঙ্করের চোখ-ধাঁধানো অস্তিত্বের মাঝেও হরিপ্রসাদ জায়গা করে নিতে পেরেছেন নিজের সংগীতের, এ অভাবনীয়। জর্জের ‘ওয়ান্ডার ওয়াল’ এবং রবিশঙ্করের ‘শঙ্কর ফ্যামিলি অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ এও তাঁর অনস্বীকার্য উপস্থিতি। পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষের পাশাপাশি হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয়সংগীতে বাঁশিকে আন্তর্জাতিক স্তরে সমাদর পাওয়ানোয় তাঁর ভূমিকাই অগ্রগণ্য। যেবার নেদারল্যান্ডসের রটারডাম মিউজিক কনজারভেটরিতে তাঁকে বিশ্ব সংগীত বিভাগের শৈল্পিক পরিচালক হিসাবে সম্মানিত করা হল, ওঁর পরিবারের সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরকেও সেই গৌরবের আলো স্পর্শ করল। আমার মায়ের মেজ-মামিমা, বিদুষী সুমিত্রা গুহ যাঁর সঙ্গে হরিপ্রসাদের দাদা-বোনের সম্পর্ক, বললেন, “উপযুক্ত ব্যক্তি কে উপযুক্ত সম্মানপ্রদান”। 

 

বিটলস্-এর সঙ্গে

মনে আছে ৬ বছর আগে প্যারিসে বসবাসকালে, ‘নুই দু রাগা’ (রাত-ভরা রাগ) এর অনুষ্ঠানে ওঁর শান্ত, সমাহিত ঝিঁঝোটি রাগের নিবেদন। ওঁর বার্ধক্য যেন থমকে দাঁড়িয়ে দেখছে কিভাবে অষ্টাদশ বৎসরের সব সাধনা এসে পুঞ্জিভূত হয়েছে এই বাজানোয়। এই অপেক্ষায়। তাই বোধহয় তাঁর বিদেশী ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা এত বিপুল। এক সাক্ষাৎকারে হরিপ্রসাদ বলেছিলেন, ‘তারা বাঁশি ভালবাসে, তারা আমাকে ভালবাসে এবং তারা ভারতকে ভালবাসে। তারা ভারতীয় পরিচয় অর্জন করতে চায়। আমার অন্তত ২২ জন বিদেশী ছাত্র ভারতীয় সংগীত, ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা এবং ভারতীয় জীবনধারায় রূপান্তরিত করার জন্য তাদের নাম পরিবর্তন করেছে..’।

পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষের পাশাপাশি হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয়সংগীতে বাঁশিকে আন্তর্জাতিক স্তরে সমাদর পাওয়ানোয় তাঁর ভূমিকাই অগ্রগণ্য

পারিবারিক মহলে সুপরিচিত হরিপ্রসাদের যে একটি বিস্ময়কর যে রসবোধ আছে তা তাঁর সংগীতেও বোধকরি উপচে পড়ে এবং তাঁর আকর্ষক অনানুষ্ঠানিক ব্যক্তিত্ব। তাই গড় গড় করে ওড়িয়া ও বাংলা বলতে পারা এলাহাবাদের হরিপ্রসাদ কলকাতায় অনুষ্ঠান হলেই বলতে পারেন, আমার বাংলার বন্ধুদের কাছে ফিরছি। ২০১৫-য় হরিপ্রসাদ যখন শিবকুমারের সঙ্গে বাজালেন প্রিন্সেপ ঘাটে, ৩০ বছর বাদে, তখন কলকাতা দেখল এক অনন্য বন্ধুত্বের যাত্রা যা কেবল সুরেই বোঝা সম্ভব। ইমন ও পাহাড়ীর মিলনে গঙ্গার হাওয়া কিঞ্চিৎ উতলা আর প্রায় ২৪০০ মানুষ, অনাস্বাদিতপূর্ব লাবণ্যে আবিষ্ট, নীরব! যে মানুষটি আজও বলেন তাঁর অধ্যয়ণের শেষ নেই, তাঁর শিক্ষার শেষ নেই, তাঁর সংগীত তো উন্মুখ হয়ে থাকবেই নতুনত্বের আহ্বানের জন্য। যে নবীণ বংশীবাদকদের তিনি তৈরী করেছেন যত্নে, লালিত্যে, কঠোরতায়, তাঁদের সংগীতেও। ওঁর ভ্রাতুষ্পুত্র ও সুযোগ্য উত্তরসূরি রাকেশের শঙ্করা শুনে সেদিন হঠাৎ মনে হল এ তো হরিপ্রসাদের তারুণ্য। হরি আসলে দেখিয়ে দিয়েছেন পথ কিভাবে চলতে হবে। কারণে, অকারণে। কিভাবে রাখালকে বাঁশি হাতে ঠিক বসিয়ে দিতে হবে জারুলছায়ায়। কিভাবে শব্দের পাখিরা গাছ হয়ে যায়।

Developed by DXDasia