
গানটির পিছনে লুকিয়ে আছে দুরন্ত এক গল্প
গানটির প্রথম কটি শব্দ শ্রোতার মনকে ভিজিয়ে দেয়। কিন্তু সত্যি সত্যিই যে এক বিরল প্রতিভাবানের দাপটে আরেক প্রতিভাবান গায়কের ‘পাগল’ হওয়ার অবস্থা হয়েছিল, সে খবর আমরা আর জানতে পারি কই। যদিও, এদিকে সেদিকে কিছু আলাপচারিতায় গানটির গায়ক জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায় যা বলেছেন, সেই স্মৃতির কোলাজকে এক জায়গায় করলে বেরিয়ে আসে দুরন্ত এক গল্প। যা বুঝিয়ে দেয় গানের গীতিকার ও সুরকার হিসেবে সলিল চৌধুরী ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র স্বরূপ। কথা ও সুরের লাগাম থাকত দুধর্ষ জাত সহিসের মতো। সলিল চৌধুরী অনেক শিল্পীকে দিয়ে গান করিয়েছেন। একবার তিনি জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে ‘পাগল হাওয়া’ গানটি করাবেন বলে ঠিক করলেন। সেই অনুসারে ডেকে গানটির ঠিক আধখানা ধরিয়ে দিলেন সুরটুর বসিয়ে। গানটি দিলেন “পাগল হাওয়া কি আমার মতন তুমিও হারিয়ে গেলে” থেকে “বনে বনে তখন বাতাসি, মাতালি, বাঁশিতে কী কথা যায় বলে” পর্যন্ত। জটিলেশ্বরবাবু খুব ভালো করে সেটিকে রপ্ত করলেন। কিন্তু বুঝতে পারছেন, গানটির একটা সামগ্রিকতা যেন আসছে না। রোজই জটিলেশ্বরবাবু ভাবেন, এর পর কী আছে। উতলা হয়ে জিজ্ঞেস করলে সলিলবাবু বিশেষ উচ্চবাচ্য করেন না।
হঠাৎ একদিন ফোন করে সলিলবাবু জটিলেশ্বর বাবুকে বললেন “আমার স্টুডিওতে আয়, গানটির রেকর্ডিং হবে।” জটিলেশ্বরবাবুর তো মাথায় হাত। বললেন “আমার তো মোটে গানের আধখানা তৈরি হয়েছে”। মাথা খারাপ দশা নিয়ে বলতে লাগলেন, “রেকর্ডিং কী করে সম্ভব সলিলদা?” সলিলবাবুর একটাই উত্তর, “তুই চলে আয়।” যাই হোক, হাঁপাতে হাঁপাতে জটিলেশ্বরবাবু স্টুডিওতে গেলেন। গিয়ে দেখেন উনি মিউজিক অ্যারেঞ্জও করছেন যন্ত্রকুশলীদের নিয়ে। আবার জটিলবাবু বললেন “আমি তো মোটে আধখানা গান”…… কথা শেষ করতে না দিয়ে সলিলবাবু বললেন “হবে রে বাবা হবে। অত ব্যস্ত হওয়ার কী আছে?” বলতে বলতেই বোঝাচ্ছেন যন্ত্রীদের, মিউজিক কোথায় উঠবে কোথায় নামবে। বলেই আবার হঠাৎ এগিয়ে এসে জটিলেশ্বরবাবুকে বললেন, “অত ব্যস্ত হয়েছিস কেন, কই দেখি ওই আধখানা গানটা”। গানটা নিয়ে একবার খালি পড়লেন। ওখানে তখন সবিতা চৌধুরীও বসে ছিলেন। তাঁকেও জটিলবাবু বলতে লাগলেন “দেখুন দেখি কী অবস্থা…।”
‘পাগল হাওয়া’ শুনতে ক্লিক করুন লিংকে
সবিতা চৌধুরী বললেন “আরে ঠিক আছে, ও ঠিক করে দেবে।” এমন উত্তরে জটিলেশ্বরবাবু একটুও উৎসাহিত হতে পারলেন না। ওদিকে সলিলবাবু তখন ছোট্ট একটা টুকরো কাগজ নিয়ে লিখতে শুরু করেছেন। তারপর লিখে ধরিয়ে দিলেন- “এবার সাঙ্গ মোর” থেকে “সে বাঁধন দাও গলে”…… পর্যন্ত। কত বড় দক্ষ কবি হলে বিনা উদ্বেগে এমনভাবে দুর্লভ সৃষ্টি করা যায়! রেকর্ড হয়ে গেল গানটি। তারপর এ গানের হিন্দিও হয়েছিল “না জানে কিঁউ”।
কথা ও সুর – সলিল চৌধুরী
তথ্য সহায়তা – শচীদুলাল দাশ
