
বর্তমান রাজ্যপালের সঙ্গে তৃণমূল সরকারের বিরোধ ছিল প্রথম থেকেই
গোটা রাজ্যে করোনা ছড়িয়ে ৮ দফা বিধানসভা ভোট সবে শেষ হয়েছে। অন্য অনেক রাজ্যের থেকে ভালো অবস্থানে থাকলেও, এখনও আমাদের রাজ্যের কোভিড পরিস্থিতি যথেষ্ট উদ্বেগজনক। মুখ্যমন্ত্রীত্বের শপথ নিয়েই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, তাঁর প্রথম এবং প্রধান কাজ কোভিড নিয়ন্ত্রণ। সেখানেই দেখা গেল আমাদের রাজ্যপাল, যাঁকে এখন আনেকেই আড়ালে ‘পদ্মপাল’ বলে সম্বোধন করছেন, তিনি বেশ বেমানানভাবে, প্রথাবিরুদ্ধ ভঙ্গীমায়, প্রকাশ্যে, সদ্য শপথ নেওয়া মুখ্যমন্ত্রীর সমালোচনা করছেন। সবাই জানেন, যে তিনি আগে জনতা দলের সাংসদ ছিলেন রাজস্থান থেকে। পরে বিজেপির ক্ষমতা বৃদ্ধি হওয়ার পর ২০০৩ সালে তিনি দল বদলে বিজেপিতে যোগ দেন। অমিত শাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পর ২০১৯-এ কেশরিনাথ ত্রিপাঠীকে সরিয়ে তাঁকে রাজ্যপাল করে পাঠানো হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। শোনা যাচ্ছে, তাঁর কাজে খুশি হয়ে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নাকি তাকে পরবর্তী পুরস্কার হিসেবে উপরাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করতে পারে। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, মোদী-অমিত শাহরা খুশি হলেও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এই রাজ্যপালকে বিজেপির একজন সক্রিয় প্রতিনিধির বেশি মর্যাদা দিতে পারছেন না। সে কথা তিনি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে খোলাখুলিই নিয়মিতই বলা হচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের খবর, রাজভবন থেকে তাঁকে সরানোর জন্য মোদি সরকারকে চিঠি লিখেছেন মমতা। বিধানসভায় তাঁর অপসারণ চেয়ে প্রস্তাব পাশ করানোও হতে পারে। এমনকি তাঁকে বয়কটের ডাকও দিতে পারে তৃণমূল। বর্তমান রাজ্যপালের সঙ্গে তৃণমূল সরকারের বিরোধ প্রথম থেকেই ছিল। এই রাজ্যপালের জনসংযোগের আগ্রহ খুব বেশি থাকায়, গোড়া থেকেই তিনি প্রকাশ্যে সরকারের সমালোচনায় সক্রিয় ছিলেন। ফলে তিনি সবসময়ই সংবাদের শিরোনামে। কখনও কখনও মনে হয়েছে যে রাজ্যে বোধহয় দুটি সরকার চলছে। রাজ্যপালের অতিসক্রিয়তার বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচিত সরকারের আন্দোলনের ডাক অবশ্য নতুন নয়। ১৯৬৭-র প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন এবং বঙ্গমনসদ কংগ্রেসের প্রথম হাতছাড়া হওয়ার সময় থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত, এই রাজ্যে বিভিন্ন সময় রাজ্যপালদের দেখা গিয়েছে কোনও রকম রাখ-ঢাক না রেখেই, অত্যন্ত দৃষ্টিকটুভাবে, দিল্লিতে অধিষ্টিত কংগ্রেস সরকারের প্রতিনিধির ভূমিকায় নামতে। তখন একাধিক বার দেখা গিয়েছিল, নির্বাচনে সর্বাধিক আসন পাওয়া রাজনৈতিক দলকে সরকার গঠনের জন্য প্রথমে না ডেকে, কংগ্রেসকে সুবিধা পাইয়ে দিতে, কম আসন পাওয়া দলকে সরকার গড়তে ডাকা হচ্ছে রাজভবন থেকে। একাধিকবার হয়েছে, বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের সুযোগ না দিয়েই অকংগ্রেসি সরকারকে বরখাস্ত করেছেন রাজ্যপালেরা। ১৯৭৭-এর পরে জ্যোতি বসু, রামকৃষ্ণ হেগড়ে, এন টি রামারাও, ফারুক আবদুল্লাদের সম্মিলত প্রতিবাদে, সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে এই ধরনের যথেচ্ছাচার কিছুটা কমে ছিল। কিন্তু বন্ধ হয়নি। যেমন ১৯৮৩ সালে পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যপাল হয়ে এলেন এ পি শর্মা। অতি সক্রিয়তার কারণে তাঁর সঙ্গেও গোলমাল বেধে গিয়েছিল জ্যোতি বসুর সরকারের। বামফ্রন্ট সরকার তখনও রাজ্যপালকে বয়কটের ডাক দিয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন এমন মাত্রায় পৌঁছায় যে দিল্লির কংগ্রেস সরকার তাঁকে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু ঘটনা সেখানেই শেষ হল না। রাজ্যপালের পদ ছেড়ে দেখা গেল সেই ভদ্রলোক বিহার থেকে কংগ্রেসের রাজ্যসভার প্রার্থী হয়ে সংসদে চলে এলেন। বোঝা গিয়েছিল, একজন কংগ্রেস নেতাকেই রাজভবনে পাঠানো হয়েছিল কমিউনিস্টদের সমঝে দেওয়ার জন্য। প্রাক্তন বিজেপি নেতা এবং আমাদের বর্তমান রাজ্যপাল যদি ‘প্রাক্তন’ শব্দটা ভুলে যেতে চান, মানতেই হবে সেই স্বাধীনতা তাঁর আছে, কিন্তু তাতে রাজ্যপাল পদটির যে অমর্যাদা হবে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
স্বাধীনতার পর এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী আসনে হিন্দুত্ববাদীরা। বিজেপি নেতা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আট দফা ভোটের প্রত্যেকটি দফার ভোট শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গুনে গুনে সাংবাদিকদের বলে চলেছিলেন, কোথায় ক’টা আসন পদ্ম-পার্টি পাবে। অসংখ্যবার তিনি ঘোষণা করেছেন ২০০-এর বেশি আসন পাওয়ার কথা। ফল বেরোনোর পর, উনি যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির কিস্যু বোঝেন না, সেটা প্রমাণিত হলেও, মানতেই হবে ৭৫টি আসন কিছু ফেলনা নয়। বিজেপি নেতারা ভোটের ফল বেরোনোর আগে পর্যন্ত ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে ১৮টি আসন এবং সেই নিরিখে ১২২টি বিধানসভা আসনে এগিয়ে থাকার কথা যতটা বলতেন, এখন ততটা বলছেন না। কারণ ১২২ থেকে ৭৫ অনেকটাই কম। প্রায় ৪০ শতাংশ কম। এখন তাঁরা বলছেন, ২০১৬-এর বিধানসভা ভোটের তিনটি আসন থেকে ৭৫ হওয়ার কথা। কিন্তু তার পরেও অবশ্য রাজ্যের এই সংকটে তাদের খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। তাদের হয়ে যেন ব্যাট করে চলেছে রাজভবন আর কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা।
হিন্দুত্ববাদীদের একটা সমস্যা হল, তাদের যেমন নেই কোনও স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস, তেমনই রোটি-কাপড়া-মাকানের আন্দোলন, জল, জমি, মানুষের অধিকারের আন্দোলন, নারী স্বাধীনতার আন্দোলন এসবের সঙ্গেও তাদের প্রায় যোগ নেই বললেই চলে। তাদের যা কিছু সাফল্য এসেছে হিন্দুদের মধ্যে কাল্পনিক ভীতির সঞ্চার করে, মন্দির গড়া মসজিদ ভাঙা, রথযাত্রা এই ধরনের বড়ো বড়ো আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে। ফলে মানুষের কাজে লাগে, মানুষের জীবন যাত্রার উন্নতি হয়, গণতন্ত্র আরও প্রসারিত হয়, মানবাধিকার নিশ্চিত হয়, এসব কাজে মোদি সরকারের সাফল্য খুবই নিচু মানের। কোভিডের আগেই নরেন্দ্র মোদির হাত ধরে দেশের অর্থনীতি তলানিতে চলে গিয়েছিল। মোদি সরকার চাকরি-বাকরি, দেশের উন্নয়নের থেকেও অনেক বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল সিএএ, এন আর সি, ৩৭০, রামমন্দির, সেন্ট্রাল ভিস্তা এই সব নিয়ে। এখনও এই অতিমারির সংকটকালেও প্রায় তাই আছে। সারা পৃথিবীতে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারতের মর্যাদা কমেছে নরেন্দ্র মোদির আমলে। বহু বুদ্ধিজীবী গ্রেফতার হয়ে আছেন সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলে। মোদিজি আমাদের বাচ্চাদের ভ্যাকসিন কেন আপনি বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন, এই প্রশ্ন করে পোস্টার দেওয়ার জন্য ৪০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে এই দিনকয়েক আগে। মোদি সরকারের সমালোচনা করে এত লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক, কৌতূক-অভিনেতার জেল হয়েছে যে বলা হচ্ছে নরেন্দ্র মোদি যেন নিজেই নিজেকে অতি-জাতীয়তাবাদের কারাগারে বন্দি করে ফেলেছেন। বাইরের কথা আর তাঁর কানে পৌঁছচ্ছে না। বিচ্ছিন্ন হয়েছে মাটির সঙ্গে যোগ। দেশদ্রোহী আইনের অপ্রয়োগ এতই বেড়েছে যে মুড়ি-মিছরির মতো তার প্রয়োগ হয়েছে। ২০১৯-এর হিসেব বলছে এই ধরনের মামলায় শাস্তি হয়েছে মানে কনভিকশন রেট মাত্র ৩ শতাংশ। যোগী সরকারের এমন ১২০টি মামলার ৯৪টি ইতিমধ্যেই খারিজ করে দিয়েছে আদালত। শুধু তাই নয়, ইংরেজরা যা আইনে গান্ধীকে গ্রেফতার করেছিল, বৃটিশ আমলের ওই আইনের প্রয়োজনীতা নিয়ে পুনর্বিবেচনা করবে শীর্ষ আদালত। ১৮৯৮ সালে এই বিল প্রথম এনেছিল ইংরেজ স্বাধীনতাকামী ভারতীয়দের শাসন করতে। বহু লেখক, বুদ্ধিজীবী, সম্পাদক সাংবাদিককে ইংরেজরা গ্রেফতার করেছিল এই সিডিশন আইনে। পরবর্তীকালে ইংরেজরা তাদের দেশে এই আইন বাতিল করে দেয় গণতন্ত্র বিরোধী বলে। আর আমরা ভারতীয়রা সেই ইংরেজের আইনটিকে বাঁচিয়ে রেখেছি এখনও। মোদি সরকার এবং বিভিন্ন রাজ্যের বিজেপির সরকার এই আইনে বহু মানুষকে গ্রেফতার করেছে। অবশেষে শীর্ষ আদালত ১২৪-এ নামে পরিচিত এই সিডিশন অ্যাক্টের আজকের দিনে কোনও প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা তা পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রসঙ্গত এই সিডিশন বিল যখন আনা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় সোয়াশো বছর আগে, তখন তার প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতার টাউনহলে এক বক্তৃতায় বলেছিলেনঃ
“আমি বিদ্রোহী নহি, বীর নহি, বোধ করি নির্বোধও নহি। উদ্যত রাজদণ্ডপাতের দ্বারা দলিত হইয়া অকস্মাৎ অপঘাতমৃত্যুর ইচ্ছাও আমার নাই। কিন্তু আমাদের রাজকীয় দণ্ডধারী পুরুষটি ভাষার ঠিক কোন সীমানায় ঘাটি বাঁধিয়া চুপ করিয়া বসিয়া আছেন তাহা আমি স্পষ্টরূপে জানি না, এবং আমি ঠিক কোনখানে পদার্পণ করিলে শাসনকর্তার লগুড় আসিয়া আমাকে ভূমিশায়ী করিবে তাহা কর্তার নিকটও অস্পষ্ট; কারণ, কর্তার নিকট আমার ভাষা অস্পষ্ট, আমিও নিরতিশয় অস্পষ্ট, সুতরাং স্বভাবতই তাঁহার শাসনদণ্ড আনুমানিক আশঙ্কাবেগে অন্ধভাবে পরিচালিত হইয়া দণ্ডবিধির ন্যায়সীমা উল্লঙ্ঘনপূর্বক আকস্মিক উল্কাপাতের ন্যায় অযথাস্থানে দুর্বল জীবের অন্তরিন্দ্রিয়কে অসময়ে সচকিত করিয়া তুলিতে পারে। এমন স্থলে সর্বতোভাবে মূক হইয়া থাকাই সুবুদ্ধির কাজ, এবং আমাদের এই দুর্ভাগ্য দেশে অনেকেই কর্তব্যক্ষেত্র হইতে যথেষ্ট দূরে প্রচ্ছন্ন থাকিয়া সেই নিরাপদ সদ্বুদ্ধি অবলম্বন করিবেন তাহারও দুই-একটা লক্ষণ এখন হইতে দেখা যাইতেছে।
আমাদের দেশের বিক্রমশালী বাগ্মী, যাঁহারা বিলাতি সিংহনাদে শ্বেতদ্বৈপায়নগণের চিত্তেও সহসা বিভ্রম উৎপাদন করিতে পারেন, তাঁহাদের অনেকে বিবর আশ্রয় করিয়া বাগ্রোধ অভ্যাস করিতে বসিবেন-দেশের এমন একটা দুঃসময় আসন্ন। সে সময়ে দুর্ভাগ্য দেশের নির্বাক বেদনা নিবেদন করিতে রাজদ্বারে অগ্রসর হইবে এমন দুঃসাহসিক দেশবন্ধু দুর্লভ হইয়া পড়িবে। যদিচ শাস্ত্রে আছে ‘রাজদ্বারে শ্মশানে চ যস্তিষ্ঠতি স বান্ধব’, তথাপি শ্মশান যখন রাজদ্বারের এত অত্যন্ত নিকটবর্তী হইয়াছে তখন ভীত বন্ধুদিগকে কথঞ্চিৎ মার্জনা করিতে হইবে। অবশ্য, রাজা বিমুখ হইলে আমরা ভয় পাইব না আমাদের এমন স্বভাবই নহে, কিন্তু রাজা যে কেন আমাদের প্রতি এতটা ভয় প্রকাশ করিতে আরম্ভ করিয়াছেন সেই প্রশ্নই আমাদিগকে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন করিয়া তুলিয়াছে।”
আরও পড়ুন: বাংলার ভোটে বাঙালির ঐতিহাসিক ভূমিকা
সে যাই হোক, পুরোনো কথায় ফেরা যাক। বিজেপির বড়ও সমস্যা হল গণমুখী আন্দোলন কাকে বলে সেটা তাদের এই বাংলায় নতুন করে শিখতে হবে। রামনবমীতে তরোয়াল নিয়ে লম্ফ-ঝম্ফে এখানে খুব একটা কাজ হবে না। দুম করে বিরোধী শক্তির স্বীকৃতি পেয়ে তারা যে ঠিক কী করবে বুঝেই উঠতে পারছে না। ফলে লাটসাহেব তাদের হোম টাস্ক করে দেবেন, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা তাদের হয়ে খানিকটা হম্বি-তম্বি করে দেবে, এই আশায় তারা অনেকেই হাত গুটিয়ে বসে আছেন। তাছাড়াও প্রশ্ন, অন্য দলের রক্তে-মাংসে ফুলে ওঠা এই রাজ্যের বিজেপি কি এই ৭৫ আসন আগামী পাঁচ বছর ধরে রাখতে পারবে? আগের মতোই কি তাদের দলে, অন্য দল থেকে ছোটো, বড়ো, মেজো, কুঁচো নেতা আসার ঘোলা স্রোত অব্যাহত থাকবে? না কি ভাঁটার টানে সংখ্যা সংশোধন করতে হবে বারবার? আসল কথা হল, তাদের বাসায় যে কোকিলের ঝাঁক আছে, তা উড়ে যাবে না তো? বঙ্কিম তো কবেই বলে গিয়েছেন, ‘তুমি বসন্তের কোকিল, শীত বর্ষার কেহ নও’।
