
হাঁচড়া ও ডালকাটার ভিতরে লুকিয়ে আবহমান বাংলার ইতিহাস
বাংলার মায়েদের প্রযুক্তি বলতে কী বুঝছি? বুঝছি, সেইসমস্ত আটপৌরে যন্ত্রের বা প্রযুক্তির ব্যবহার যা সাবেক বাংলা থেকে এখনো অবধি চলে আসছে। আর সেইসব প্রযুক্তির ব্যবহার করছেন মূলত বাংলার মায়েরা তথা গৃহিণীরাই। এইসব প্রযুক্তি বাংলার সমাজ–সংস্কৃতি-চর্যার শিকড়ে মিশে আছে ঘন হয়ে। আজ থাকল হাঁচড়া আর ডালকাটার কথা।
হাঁচড়া/হ্যাচড়া
চারবছর আগে একটা বই পড়ে আমি আশ্চর্য হয়েছিলাম। বইটির নাম Staying Alive: Women, Ecology & Development. লেখিকা বন্দনা শিবা বইটির একটি অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন, জাপান, চীন, ভারত ও অনান্য দেশের নারীদের অঙ্গনবিদ্যার কথা। একসময় নাকি এই অঙ্গনেই জাপানে ২১২টি, ভারতে ১২২টি এবং চিনে ৯০টি জাতের ফসল ও ভেষজ চাষ হত। চাষের সংখ্যাটি নয় বরং আবাদের জায়গাটি আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল বেশি। যেখানে উনি বলছেন, আমাদের উঠোনেই এককালে যে পরিমাণ চাষ হত, তাতে বাইরে থেকে কিছু কেনার প্রয়োজন পড়ত না। দু-একটি জায়গায় আমার তথ্যগত ভুল হতে পারে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, এই সমস্ত চাষ করতে তো বেশ কিছু যন্ত্রপাতির দরকার হতই। কী কী যন্ত্র ছিল তখন! এই জায়গা থেকেই মায়েদের প্রযুক্তি ব্যাপারটা মাথায় আসে আমার।
আজ বলব, হাঁচড়া বা হ্যাচড়া নামের অঙ্গন চাষের যন্ত্রটির কথা। পশুরা পায়ে করে মাটি আঁচড়ায়, মানুষও হাত দিয়ে মাটি আঁচড়ায়, গর্তও খোড়ে। এই আঁচড় বা হাঁচড় থেকেই এই যন্ত্রটির উদ্ভব। ভাবতে পারেন, এই যন্ত্রের উদ্ভভের পিছনে লুকিয়ে ছিল এক বা একাধিক নারীর চিন্তা ও ব্যুৎপত্তি! পাঁচটি আঙুলের মতো দেখতে যন্ত্র। সোজা লোহার ছোটো ছোটো রডের প্রান্তভাগগুলি বেঁকিয়ে, মাথা ছুঁচালো করে দেওয়া হয়। এবং অপরদিকে, পাঁচটি রডকে একত্রে একটি মোটা রডের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। ব্যাস, তৈরি হয়ে গেল হাঁচড়া। এটির উচ্চতা এক ফুটের মতো। শেষপ্রান্তে হাতে ধরার কাঠের হাতল লাগানো থাকে। বাংলায় এই যন্ত্রটি খুব সম্ভবত অষ্ট্রিক বা মঙ্গোলিয়ান জনজাতি মারফত এসেছে। কারণ, মায়ানমার, জাভা, সুমাত্রা ইত্যাদি দেশে এই ধরনের যন্ত্রের ব্যবহার দেখা গেছে। এই যন্ত্র দিয়ে মাটি খুঁড়ে সাধারণত শাক-সব্জি লাগানো হয়।
পশ্চিবঙ্গের প্রায় সর্বত্রই দেখা যায় হাঁচড়া। নদীয়ার- ফুলিয়া, শান্তিপুর, কৃষ্ণনগর, হুগলীর- গুপ্তিপাড়া, বলাগড়, সপ্তগ্ৰাম, আরামবাগ, পশ্চিম বর্ধমান, পূর্ব বর্ধমান, বাঁকুড়া, বীরভূম এবং পুরুলিয়ায় হাঁচড়া তৈরি হয়।
ডালকাটা
ডাল কাটার সঙ্গে বাংলার ও বাঙালির সম্পর্ক অনেক পুরনো। কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী রচিত ‘চন্ডীমঙ্গলে’ ডাল রান্নার প্রসঙ্গ রয়েছে। এছাড়া, অনান্য মঙ্গল কাব্যগুলোতেও ডাল রান্নার প্রসঙ্গ রয়েছে। মুগ, মুসুর, কলাই ইত্যাদি বীজ ফসলকে বলে ডাল। ডাল কিন্তু গোটা হিসাবে ব্যবহৃত হয় না। জাঁতায় ভেঙে নিয়ে তারপর ডাল প্রস্তত করা হয়। যদিও সেদ্ধ করার চলও আছে। সেদ্ধ করার সময় দানা ভাব না থাকার জন্যে ডাল কাটার ব্যবহার করা হয়। যাতে ভালো ভাবে মিশে যায় ডাল।
এই ডাল কাটার গঠন কিন্তু ভারি মজার। কাঠের তৈরি এই যন্ত্রটির। কোনো আধুনিকীকরণ আজ পর্যন্ত হয়নি। বরাবর এই যন্ত্রটি মায়েদের রান্নাঘরেই থেকে এসেছে এবং রয়েওছে। এই যন্ত্রটিও এক বা একাধিক মহিলার মস্তিষ্ক-প্রসূত! ডালকাটা তো জটিল যন্ত্র নয়, ফলে তৈরি করা যেত সহজেই। উচ্চতায় যন্ত্রটি ১৮-২০ ইঞ্চি। একটি সরু ১ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের লম্বা লাঠির মাথাটি গোলাকার আকৃতিতে মোড়া। কিছুটা যোগচিহ্নের মতো অবস্থানে কাঠের অংশ জোড়া থাকে। এই যোগচিহ্নের মতো কাঠের মাথাগুলি ইরেজী V আকৃতিতে কাটা থাকে। যাতে কড়াই-এ গোলাকার ঘূর্ণনের ফলে ডাল ভালোভাবে গুলে যায়।
ডালকাটার ব্যবহারটিও কিন্তু বেশ সহজ। প্রথমে জল সহযোগে ডাল সেদ্ধ করতে দেওয়া হয় উনুনে। ডাল সেদ্ধ হয়ে গেলে ফোড়ন দেওয়ার আগে ডালকাটা কড়াই-এর মধ্যে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ডালের দানা-দানা অংশগুলিকে ভালো ভাবে দ্রবণের সঙ্গে মেশানোর কাজ চলে। এরপর, ডালের ফোড়ন দেওয়া হয়। আবার অনেক, সময় দুধ ঘন করতেও ডালকাটার ব্যবহার হয়ে থাকে।
বর্তমানে শহর, শহরতলি, গ্ৰাম, মফস্সলের বিভিন্ন কামারশালায়, কাঠের দোকানে, বিভিন্ন মেলায় কিনতে পাওয়া যায় এই ডালকাটা। পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্রই ডালকাটার দেখা মেলে।
