রবীন্দ্রনাথ কি আদৌ কোনোদিন ওরিয়েন্টাল সেমিনারির ছাত্র ছিলেন?

একটি ঐতিহাসিক ভুল

উত্তর কলকাতার আহিরিটোলা মোড়ের একটু আগে বি কে পাল অ্যাভিনিউয়ের ওপর যেখানে একটা পৌরসভার পার্ক, ঠিক তার বিপরীত দিকের গলি দিয়ে ঢুকলেই সেই স্কুল। পুরোনো দিনের বিদ্যায়তন বলে প্রায় সব মানুষই চেনেন – একবার জিজ্ঞাসা করলেই যে কেউ দেখিয়ে দিতে পারেন। ওরিয়েন্টাল সেমিনারি। নিছক একটি শিক্ষাসত্র নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে এক বিশ্ববন্দিত মানুষের নাম। যিনি তার ‘জীবনস্মৃতি’ র শুরুতেই লিখছেন, “কান্নার জোরে ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে অকালে ভর্তি হইলাম”। কেন কান্না? তার বৃত্তান্তটি তিনি বিশদ করেছেন আগের পরিচ্ছেদে। একসাথে বেড়ে ওঠা অগ্রজ সোমেন্দ্রনাথ ও তার বয়োজ্যেষ্ঠ ভাগিনেয় সত্যপ্রকাশকে ইস্কুলে ভর্তি করা হলেও তাঁকে যে ভর্তি করা হল না – এই অভিমানে তাঁর কান্না। আর তারই কারণে তাঁকেও কিছুদিন বাদে ভর্তি করে দেওয়া হল একই স্কুলে। সেই সুবাদে ওরিয়েন্টাল সেমিনারি অন্তর্গত হয়ে গেল ইতিহাসের, তাদেরই প্রাক্তন ছাত্র একদিন দেশের প্রতিনিধিত্ব করলেন বিশ্বের দরবারে। সেই থেকে ওরিয়েন্টাল সেমিনারি রবীন্দ্রনাথের স্কুল। সেই স্কুলের ঘরে ঘরে এক অনূর্ধ্ব-চার শিশুর শিক্ষার স্মৃতি। সেই সঙ্গে বেশ কিছুটা দুঃস্বপ্নেরও বটে, কারণ ওখানেই তিনি দেখলেন, “পড়া বলিতে না পারিলে ছেলেকে বেঞ্চে দাঁড় করাইয়া তাহার দুই প্রসারিত হাতের উপর ক্লাসের অনেকগুলি স্লেট একত্র করিয়া চাপাইয়া দেওয়া হইত”। এই শাস্তির উপাচারের সঙ্গেও জড়িয়ে গেল স্কুলের নাম।

ইতিহাস সব সময় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। অনেক ইতিহাসের মিথ পরবর্তী গবেষণায় ভুল প্রমাণিত হয়। সেই অনুসন্ধান সূত্রেই মনে আসে, রবীন্দ্রনাথ কি আদৌ কোনোদিন পড়েছিলেন ওই স্কুলে? এই কথা বলছি কেন? কারণ, ঠাকুরবাড়ির পারিবারিক প্রথা হিসেবে সেই দেবেন্দ্রনাথের আমল থেকেই প্রচলন ছিল প্রতিদিনের খরচের ক্যাশবই বা হিসেবের খাতা লেখা যা অন্তত চালু ছিল ১৩৫৯ বঙ্গাব্দের শেষ অবধি। এইরকম প্রায় সাড়ে তিনশো খাতা পরবর্তী সময়ে পাওয়া গেছে ঠাকুরবাড়ির কাছারি থেকে যার সবগুলিই সংগৃহীত হয়েছে শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্র সংগ্রহশালায়। এই হিসেবের খাতাগুলিতে যেহেতু প্রতিদিনের হিসেবের খরচ ও তার ভাউচার সযত্নে রাখা হত এবং মহর্ষির পুত্রদের মধ্যেই কেউ সেগুলি নিয়মিত পরীক্ষা করে স্বাক্ষর করতেন, ফলে খরচপত্রের একটা স্বীকৃত চেহারা এবং তার সূত্রে নানা তথ্যের হদিশ পাওয়া যায়।

তেমনই একটি তথ্য বলছে, ২৬ চৈত্র ১২৭১ (৭ এপ্রিল ১৮৬৫) সেই সময়কার পারিবারিক ক্যাশবইতে লেখা আছে রবীন্দ্রনাথ, সোমেন্দ্রনাথ ও সত্যপ্রকাশের স্কুলে ভর্তি সংক্রান্ত খরচের হিসাব – স্কুলের মার্চ মাসের ফি জমা দেওয়ার হিসেব থেকে স্পষ্ট হয়, তিনজন একই মাসে একই স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। তাহলে তো ‘কান্নার জোর’ কথাটার আর কোনও মানে থাকে না ! কারণ, আগে-পরে তো নয়, তাঁরা তিনজন একই সঙ্গে স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু সেটা কোন স্কুল? আশ্চর্যের কথা, হিসেবের খাতা মিলিয়ে দেখলে সেই স্কুলের নাম ওরিয়েন্টাল সেমিনারি নয়। স্কুলটি হল, ক্যালকাটা ট্রেনিং অ্যাকাডেমি। যে প্রতিষ্ঠানের সেই সময়ের ঠিকানা ১৩, কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিট ( বর্তমান বিধান সরণি ) এবং আজকে তার ঠিকানা ১৩, নারায়ণ রায় সরণি (শ্রীমানী বাজারের পিছনে)।


 
তাহলে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’তে এই স্কুলের নাম পেলেন কোন সূত্রে ? একটা সম্ভাব্যতা হতে পারে, তাঁর অগ্রজরা কি কেউ কখনো এই স্কুলে পড়েছিলেন? তবে এর জবাব, না ; ঠাকুরবাড়ির কোনো ছেলে ওই স্কুলে পড়েননি। তাহলে নিশ্চিতভাবেই ‘জীবনস্মৃতি’তে কবির স্মৃতি কিছুটা এলোমেলো হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় । এই বিষয়ে একটিমাত্র সূত্র পাওয়া যাচ্ছে। স্মৃতিকথা থেকে জানা যায় রবীন্দ্রনাথের অগ্রজ সত্যেন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথের গৃহশিক্ষক ছিলেন ওরিয়েন্টাল সেমিনারির প্রধান শিক্ষক ঈশ্বরচন্দ্র নন্দী, যিনি সেই সময়েই ঠাকুরবাড়ি থেকে মাসে কুড়ি টাকা সাম্মানিক পেতেন । দুই ঘনিষ্ঠ দাদার থেকে ওই স্কুলের নাম শোনা রবীন্দ্রনাথের পক্ষে অসম্ভব নয় এবং পরিণত বয়সে নিজের জীবনের কথা লিখতে বসে তাঁর স্মৃতি তাঁকে প্রতারণা করেছিল।

 
কবির স্মৃতি-বিষয়ক ভ্রমের আরেকটা প্রমাণ পাওয়া যায় পরে। প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ সত্তর- ঊর্ধ্ব কবির সঙ্গে সরাসরি কথা বলে (১৯৩১-৩২ নাগাদ) তাঁর জীবন ও রচনা বিষয়ে কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করেছিলেন। এই সূত্রে তিনি কবির সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাঁর জবাব তারই জবানিতে একটি খাতায় লিখে রাখতেন, সেই খাতাটিও রবীন্দ্রভবনে রয়েছে। নিজের প্রথম স্কুল জীবন হিসেবে কবিকে করা প্রশ্নের জবাবে সেখানে লেখা আছে: পঞ্চম বৎসরে প্রথম স্কুলে যাই। জীবন স্মৃতিতে একটু ভুল লিখেছি। ওরিয়েন্টাল সেমিনারি আর আড্ডিদের স্কুল। পরে দাদাদের কাছে শুনেছিলাম যে ওর একটা স্কুল তাঁর আগের আমলের। (২০ জানুয়ারি ১৯৩২)। ঘটনা হল, প্রবাসী পত্রিকায়যখন ‘জীবনস্মৃতি’ ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ হচ্ছিল এবং সেটি যখন প্রথম বই আকারে প্রকাশ হয় (১৯১২) তখন ‘গীতাঞ্জলি’-র অনুবাদ নিয়ে কবির ব্যস্ততা চরমে এবং তিনি দীর্ঘ বিদেশ সফরে দেশছাড়া । হতেই পারে, এই ধরণের ভুল ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ তিনি পাননি। কিন্তু প্রথম সংস্করণ প্রকাশ হওয়ার পরে সেই বইয়ের যে যে পৃষ্ঠায় ওরিয়েন্টাল সেমিনারির উল্লেখ ছিল সেখানে দাগ দিয়ে পাশে জিজ্ঞাসাচিহ্ন বসিয়েছেন । পরে হয়তো তাঁর আর সংশোধন করার সময় হয়নি এমন হতেও পারে। তাছাড়া, খানিকটা পরিণত বয়সে অগ্রজ কারুর থেকে তথ্য যাচাইয়ের সুযোগও ছিল কম। কারণ যাই হোক, এই ভুল আজও চলে আসছে সমানভাবে । এখনও রবীন্দ্রস্মৃতিধন্য স্কুল হিসেবে আমরা ভুলভাবে চিহ্নিত করে চলেছি ওরিয়েন্টাল সেমিনারিকে। এই ভুলের দায় আর কতদিন বহন করব আমরা ?

তথ্যসূত্র : রবিজীবনী – প্রশান্ত কুমার পাল (প্রথম খণ্ড )
ছবি সৌজন্যে : সুরমিতা কাঞ্জিলাল 

Developed by DXDasia