অপরচুনিটি ক্যাফে : সমাজের চোখে ‘ব্রাত্য’ একদল ছেলেমেয়ের স্বাবলম্বনের স্বপ্ন

দমদম ঘোষপাড়ার অপরচুনিটি ক্যাফে অ্যান্ড কো ওয়ার্কস্

“মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও…”

সংবেদনশীল মনে মানুষের কান্না শুনতে পেয়েছিলেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, মানুষকে ডেকেছিলেন মানুষেরই পাশে দাঁড়ানোর জন্য। কিন্তু দূষণে বিষাক্ত পৃথিবীতে সেই কান্না শোনার মতো কান আর মন এখন দুর্লভ, তবে বিলুপ্ত নয়। ভালোবাসার শহর কলকাতায় এই কথা আবারও প্রমাণ করে দিচ্ছে দমদম ঘোষপাড়ায় অপরচুনিটি ক্যাফে অ্যান্ড কো ওয়ার্কস্, বুঝিয়ে দিচ্ছে মানুষের প্রচলিত চিন্তা ভাবনায় যেখানে দাঁড়ি পড়ে যায় সেখান থেকেই ফিনিক্স পাখির মতো জন্ম নেয় নতুন সদর্থক স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্নের নায়ক-নায়িকারা তাঁদের স্বপ্ন দিয়ে গড়ে তোলে একটা ক্যাফে, যেখানে সবাইকে নিজেদের হাতে তৈরি খাবার খাইয়ে তাঁরা আক্ষরিক অর্থেই হয়ে উঠছেন স্বাবলম্বী।

নিয়ম অনুযায়ী ১৮ বছরের পর সরকারি হোমে আর থাকা যায় না। কিন্তু বয়স ১৮ বছর পেরিয়ে গেলে কিভাবে জীবনযুদ্ধে টিকবে এতজন? এই প্রশ্নটিই ভাবিয়ে তুলেছিল সিদ্ধান্ত ঘোষ এবং সুমন্ত সিংহরায়কে

ভাগ্যের পরিহাসে যাঁদের জন্ম হয়েছে কোনো নিষিদ্ধ পল্লীর অন্ধকারে, বা শিশুকালেই যাঁদের ওপর বয়ে গেছে বিভিন্ন নিগ্রহের ঝড় অথবা প্রকৃতির নিষ্ঠুরতায় যাঁরা জন্মলগ্ন থেকেই বিশেষ ভাবে সক্ষম তাঁদের সকলেরই অধিকার আছে একটা সুন্দর জীবনের। তবে পৃথিবীর ইতিহাস বলছে অধিকার লড়ে নিতে হয়। আর এই লড়াইতেই সামিল হয়েছেন সদ্য যৌবনে পৌঁছনো একদল ছেলেমেয়ে, তাঁদের পাশে আছেন অ্যাডভোকেট সিদ্ধান্ত ঘোষ এবং সুমন্ত সিংহরায়। সমাজের বাঁকা চোখের চাহনিকে হাসিমুখে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র মনের জোরকে সম্বল করে ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি অর্থাৎ নেতাজির জন্মদিন থেকে তাঁরা শুরু করেছেন নতুন স্বাধীনতার লড়াই।

কিভাবে শুরু হলো এই ক্যাফে? অপরচুনিটি ক্যাফে অ্যান্ড কো ওয়ার্কস্-এর পক্ষ থেকে সুমন্ত সিংহরায় বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “আমাদের NGO রেসকিউ অ্যান্ড রিলিফ ফাউন্ডেশন-এর বিভিন্ন প্রকল্পের মধ্যে এটাও একটি প্রকল্প। তবে শুরুর দিকে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে, অনেকেই বলেছেন ওরা পারবে না, কিন্তু সেসব কথা মিথ্যে প্রমাণিত করে ওরা দেখিয়ে দিয়েছে যে ওরাও পারে”। নিয়ম অনুযায়ী ১৮ বছরের পর সরকারি হোমে আর থাকা যায় না। কিন্তু বয়স ১৮ বছর পেরিয়ে গেলে কিভাবে জীবনযুদ্ধে টিকবে এতজন? এই প্রশ্নটিই ভাবিয়ে তুলেছিল সিদ্ধান্ত ঘোষ এবং সুমন্ত সিংহরায়কে। বিভিন্ন জায়গায় কাজের ব্যবস্থা করে দিয়েও সুরাহা হয়নি এই সমস্যার। কারণ সমাজের মানুষের বাঁকা দৃষ্টি, খারাপ ব্যবহার সহ্য করে কাজ করাই হয়ে উঠেছিল এদের প্রতিদিনের রুটিন। সেখান থেকেই শুরু হয় নিজেদের ক্যাফে তৈরির চিন্তাভাবনা। 

ভাগ্যের পরিহাসে যাঁদের জন্ম হয়েছে কোনো নিষিদ্ধ পল্লীর অন্ধকারে, বা শিশুকালেই যাঁদের ওপর বয়ে গেছে বিভিন্ন নিগ্রহের ঝড় অথবা প্রকৃতির নিষ্ঠুরতায় যাঁরা জন্মলগ্ন থেকেই বিশেষ ভাবে সক্ষম তাঁদের সকলেরই অধিকার আছে একটা সুন্দর জীবনের।

সুমন্ত বাবু আরও বলেন, “আমরা চাই সবাই আসুন, তবে কোনো দয়া বা করুণা নিয়ে নয়, আর পাঁচটা ক্যাফেতে যেমন যান, সেই মানসিকতা নিয়েই আসুন”। তবে তাঁর একটাই অনুরোধ, “এরা একটু একটু করে নিজেরা কাজ শিখে করছে, তাই একটু বেশি সময় লাগতে পারে। সকলের কাছে সেই সময়টুকু আমরা চাইছি। তবে খাবারের স্বাদ এবং মান নিয়ে কোনও  আপস করা হয় না”। এই ক্যাফে খোলা থাকে প্রতিদিন সকাল দশটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত। তিনি আরও বলেন, “সামনে পুজো আসছে, তারপর দীপাবলি এবং আরও উৎসব। সেই সময় অতিরিক্ত ভিড় সামলাতেও তৈরি আমাদের ছেলে-মেয়েরা”

 

শুধু ক্যাফের কাজই নয়, পাশাপাশি পড়াশোনাও করছেন এই তরুণ-তরুণীরা। প্রত্যেকেই একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে গড়ে তুলছে আত্মপরিচয়। শুধু নিজেদের স্বপ্নপূরণই নয়, তাঁদের মতো আরও অনেককে স্বপ্ন দেখিয়ে দিন বদলের গান শোনাতে চায় অপরচুনিটি ক্যাফে অ্যান্ড কো ওয়ার্কস্-এর সকলে। বুকে প্রত্যয় নিয়ে বলতে চায়, “আমরা করবো জয়/ আমরা করবো জয়/ আমরা করবো জয় নিশ্চয়”।

____________

অপরচুনিটি ক্যাফে অ্যান্ড স্কিলস অ্যাকাডেমির ঠিকানা: ১৫৮, দমদম রোড, ঘোষ পাড়া, কলকাতা ৭০০০৭৪/ ফোন নং ০৯৭৭৫৫৭৮০৬২/ সময় সকাল ৮টা থেকে রাত ১১:৩০টা

Post Tags
Developed by DXDasia