পুরোনো ডেনিমের নতুন রূপ : মধ্য কলকাতার জনপ্রিয় জিন্স গলি

মহম্মদ আলি পার্কের কাছে নীলমাধব সেন লেন-এ রয়েছে এই গলি

নিশ শতকে শ্রমিকদের সুবিধার্থে যে পোশাকের প্রচলন হয়েছিল, আজ তা পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র ফ্যাশনদুরস্ত নারী-পুরুষের পছন্দের অন্যতম। শুধু তো ফ্যাশন নয়, রোজকার জীবনে জিন্স বেশ সুবিধার পোশাকও বটে। তাই জিন্সের জনপ্রিয়তা আজ বিশ্বজুড়ে। চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জিন্সের দামও বেশ চড়া। শহর কলকাতাতেই আছে এমন এক জায়গা যেখানে পুরোনো জিন্সের প্যান্ট পরিষ্কার এবং মেরামতি করে তাকে আবার বাজারজাত করার ব্যবস্থা করা হয়। আর সেই জিন্সের প্যান্ট তুলনামূলক কম দামে শহর এবং শহরতলির বিভিন্ন বাজারে রমরমিয়ে আবার বিক্রি হচ্ছে, ফলে সকলেই সাধ্যের মধ্যে সাধ পূরণ করতে পারছেন সহজেই। কলকাতার এই জায়গা এখন পরিচিত জিন্স গলি (জিন্স গলি/ Kolkata Jeans Gully) নামে।

মধ্য কলকাতার মহম্মদ আলি পার্কের কাছে নীলমাধব সেন লেন, এই রাস্তারই ডাকনাম জিন্স গলি। মেট্রোয় মহাত্মা গান্ধি রোড স্টেশনে নেমে বা সড়কপথে মহম্মদ আলি পার্কের কাছে এসে স্থানীয় কারোর কাছে জিন্স গলির খোঁজ করলেই খুঁজে পাওয়া যাবে এই ঠিকানা, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় নীল সুতোর গা বেয়ে। ওপরের দিকে তাকালে দেখা যায় শুধুই শুকোতে দেওয়া পুরোনো জিন্স। সকাল থেকেই এই পাড়ায় শুরু হয়ে যায় কাচা ধোওয়া আর শুকোনোর ব্যস্ততা। অপরিসর গলির দু-পাশের ঘরের দিকে তাকালে চোখে পড়বে জিন্সের প্যান্টের স্তুপ। এরকমই এক ঘরে আলাপ হলো ব্যবসায়ী মহম্মদ ইউসুফের সঙ্গে। তার সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেল প্রায় ১২-১৫ বছর ধরে এই ব্যবসা চলছে।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুরোনো জামাকাপড়ের বিনিময়ে যারা বাসনপত্র বিক্রি করেন, এরকমই ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকেই মূলত এই পুরোনো পোশাক পান তারা। তারপর কাচা ধোওয়া করে পরিষ্কার করে, প্রয়োজনীয় মেরামতির পরে আবার সেগুলো পাইকারি হারে তারা বিক্রি করেন শিয়ালদহ, হাওড়া, ধর্মতলার বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের কাছে। শুধু শহর নয় টিটাগড়, বারুইপুর প্রভৃতি শহরতলির বাজারেও ছড়িয়ে পড়ে এই পোশাক। এমনকি রাজ্যের বাইরে ওড়িশা, আসাম, বিহারেও পৌঁছে যায় এই জিনিসগুলো। তবে সবচেয়ে বেশি যায় ওড়িশায়। এমনকি বিভিন্ন মেলাতেও মেলে এরকম জিন্সের দেখা।

অপরিসর গলির দু-পাশের ঘরের দিকে তাকালে চোখে পড়বে জিন্সের প্যান্টের স্তুপ। এরকমই এক ঘরে আলাপ হলো ব্যবসায়ী মহম্মদ ইউসুফের সঙ্গে। তার সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেল প্রায় ১২-১৫ বছর ধরে এই ব্যবসা চলছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুরোনো জামাকাপড়ের বিনিময়ে যারা বাসনপত্র বিক্রি করেন, এরকমই ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকেই মূলত এই পুরোনো পোশাক পান তারা।

এ তো গেল জায়গার কথা, কিন্তু একেবারে নতুন জিন্সের সঙ্গে এগুলোর দামের পার্থক্য কতটা। এই প্রসঙ্গে ইউসুফ জানালেন, “একদম ফ্রেশ যে প্যান্টের দাম প্রায় ২০০০-৩০০০ টাকা, সেখানে এই জিন্সের দাম পড়ে ২৫০-৩০০ টাকা। ফলে, সকলের কাছেই তা সহজলভ্য হয়। পুজোর সময় অল্প কিছুদিন নতুন জিন্সও পাওয়া যায় এখানে। কিন্তু পুরোনো জিন্সের বাজার চলে সবসময়।” শুধুই কি জিন্সের প্যান্টের বাজারই এটা? এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “অন্যান্য পোশাক‌ নিয়েও কাজ করা হয়, তবে প্রধানত কাজ হয় পুরোনো জিন্সের প্যান্ট নিয়েই। তাই এই গলি এখন জিন্সের গলি নামে পরিচিতি লাভ করেছে।” বাজারে এই পোশাকের চাহিদা কেমন? ইউসুফ জানালেন যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে, রোজ এখানে পুরোনো পোশাক বিক্রেতারা এসে পাইকারি হারে কিনে নিয়ে গিয়ে ব্যবসা করেন। তবে কোভিড পর্বের আগে ব্যবসা আরও ভালো ছিল। করোনার পর কিছুটা হলেও চাহিদা কমেছে।

উনিশ শতকে ক্যালিফোর্নিয়ার বস্ত্র ব্যবসায়ী Levis Strauss এবং দর্জি Jacob William Devis খনি শ্রমিকদের কাজের উপযুক্ত মোটা কাপড়ের খোঁজ করতে করতে পেয়ে যান জাহাজের তাঁবু তৈরির জন্য ব্যবহৃত মোটা ডেনিম কাপড়। ফ্রান্সের সুতো ব্যবসায়ীদের তৈরি করা এক ধরনের মোটা সুতো দিয়েই জার্মান শহরের তাঁতি জিন ফুস্তিয়া এই ডেনিম কাপড় বুনেছিলেন। জিন ফুস্তিয়ার নামানুসারেই পরবর্তীকালে এই কাপড়ের নাম হয় জিন্স। যাইহোক, মার্কিন দর্জি Jacob W. Devis এই কাপড় দিয়েই তৈরি করেন নতুন ধরনের প্যান্ট যা যথেষ্ট টেকসই এবং পরিশ্রমসাধ্য কাজের উপযুক্ত হবে। এইভাবেই তৈরি হয়েছিল জিন্সের পোশাক। 

রোজকার দৌড়ঝাঁপের জীবনে বা ছুটিতে ঘুরতে যাওয়া সবক্ষেত্রেই মানুষের পছন্দের তালিকায় জিন্সের পোশাক জায়গা করে নিয়েছে সেই কবেই। আর এই বিপুল জনপ্রিয়তায় সকলের সাধ্যের মধ্যে জিন্সের পোশাক পৌঁছে দিচ্ছেন শহর কলকাতার এই ব্যবসায়ীরা‌। তাদের হাত ঘুরেই রাজ্যের এবং রাজ্যের বাইরের পুরোনো পোশাকের বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে নতুন জীবন পাওয়া ব্র্যান্ডেড জিন্সের প্যান্ট।

______

ছবি: নিজস্ব

Post Tags
Developed by DXDasia