
বাংলা জীবনমুখী গানের দুই দিকপাল একসঙ্গে ফিরলেন আবার
হায় পথে হল ছাড়াছাড়ি গেলাম কে কোথায়?/ আবার দেখা যদি হল সখা, প্রাণের মাঝে আয়…
দীর্ঘ পনেরো বছর পর আবারো দেখা হল ওঁদের দুজনের, এক বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায়, একই মঞ্চে। ‘বন্ধু কী খবর বল?’ দুজনে দুজনার প্রতি যেন প্ৰশ্ন রাখলেন সুমন এবং অঞ্জন (কবীর সুমন ও অঞ্জন দত্তের অনেকদিন পর), আধুনিক বাংলা গানের দুই মায়েস্ত্রো।
আশির দশকের একদম শেষ দিকে ধুঁকতে থাকা বাংলা গানের মরা গাঙে বান ডেকেছিলেন যে রাগী যুবক গিটার হাতে, তিনি বয়সের ভারে আজ কিছুটা ন্যুব্জ ঠিকই, কিন্তু তাঁর স্বতন্ত্র গায়কি আজও একইরকম ক্ষুরধার।
আদ্যোপান্ত রাজনৈতিক ভাষ্য কী করে উইটের সঙ্গে পরিবেশন করতে হয় শুধুমাত্র বাংলা শব্দ চয়নে, সুমন যেন কোথাও সেই শিক্ষা দিয়ে গেলেন ২২ অগাস্ট কলকাতার কলা মন্দিরে। নকশাল বাড়ি, ফাঁসি দেওয়া থেকে শুরু করে সুদূর ফ্রান্স, জার্মানির দিনগুলোর রেস্ট্রোস্পেক্টিভ তুলে ধরলেন তাঁর গান এবং স্মৃতিচারণের যুগপৎ উপস্থাপনায়।
‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি/ তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী!’ গৌরচন্দ্রিকার পর এই উদার্ত আহ্বানে তখন বিদ্যুৎ তরঙ্গ ঢেউ খেলে যায় এক লহমায়, তুমুল হাততালির অভিবাদন গোটা প্রেক্ষাগৃহে। এক জোট হওয়ার নিদান যেন কোনোভাবেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মাধ্যমে নয়, মনে করালেন সুমন তাঁর চেনা রসবোধে, আমরা কিন্তু ‘গান-শাল পন্থী’ আইন হাতে তুলে নেওয়া ট্রিগার চেপা গান নয়, বরং প্রতিবাদী কণ্ঠে যৌথ খামার গড়ার আহ্বানে। আদ্যোপান্ত রাজনৈতিক ভাষ্য কী করে উইটের সঙ্গে পরিবেশন করতে হয় শুধুমাত্র বাংলা শব্দ চয়নে, সুমন যেন কোথাও সেই শিক্ষা দিয়ে গেলেন ২২ অগাস্ট কলকাতার কলা মন্দিরে। নকশাল বাড়ি, ফাঁসি দেওয়া থেকে শুরু করে সুদূর ফ্রান্স, জার্মানির দিনগুলোর রেস্ট্রোস্পেক্টিভ তুলে ধরলেন তাঁর গান এবং স্মৃতিচারণের যুগপৎ উপস্থাপনায়। নব্বইয়ের দশকের আধুনিক বাংলা গানের পুরোধা সুর বাঁধলেন ভালোবাসার হাতে হাত রাখবার আহ্বানে, হোক না সে প্রেম সম, অসম বা বিষম বয়সী বা লিঙ্গের প্রতি। ভালোবাসার প্রতি অনুরক্ত থাকুন, এই তাঁর একমাত্র অঙ্গীকার তথা দাবি। মন্ত্র মুগ্ধকর সন্ধ্যায় সুমন গেয়ে চলেন, ‘চেনা দুঃখ চেনা সুখ’ থেকে ‘পেটকাটি চাঁদিয়াল’, ‘বাঁশুরিয়া বাঁশি’-র মতন একের পর এক কালজয়ী বাংলা গান।
বন্ধু তথা সহকর্মী গানের জগতে প্রায় সমসাময়িক অঞ্জনের গানের কথার মাধ্যমে বাংলা গান কী করে ফিরে পেলো গুরুগম্ভীর মনোটনি পেরিয়ে বহু কাঙ্ক্ষিত কমিক রিলিফ, বারবার মনে করিয়ে দিলেন সুমন। ঠিকই তো, বাংলা কমেডি গানে চটুল প্যারোডি থাকলেও মজার দিকটা যেন উপেক্ষিতই থেকে গেছিলো বহুকাল। অঞ্জনের গিটার ‘শুনতে কি চাও’ বলার মাধ্যমে যেন শেকল ভাঙলেন সেই গাম্ভীর্য্যের।
অনুষ্ঠান শুরু ও বিরতির পর সঞ্চালনার ছোট্ট দায়িত্বে অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় মনে করিয়ে দিলেন কবীর সুমন আর অঞ্জন দত্তের গান কী করে আমাদের রোজনামচার নাগরিক জীবনের পাথেয় হয়ে আমার-আপনার পাশাপাশি পথ হেঁটেছে দশকের পর দশক।
বাংলা কমেডি গানে চটুল প্যারোডি থাকলেও মজার দিকটা যেন উপেক্ষিতই থেকে গেছিলো বহুকাল। অঞ্জনের গিটার ‘শুনতে কি চাও’ বলার মাধ্যমে যেন শেকল ভাঙলেন সেই গাম্ভীর্য্যের।
ঝাঁ চকচকে তিলোত্তমা কলকাতার পেটের ভেতর যে সেধিয়ে রয়েছে আরও একটা অনামী নোনাধরা কলকাতা, আমাদের সক্কলের পরিচয় হয় তাদের সঙ্গে অঞ্জনের গানের মাধ্যমেই। ‘স্যামসন’, ‘মৌলালির মালা’, ‘মেরি অ্যান’, ‘জেরেমির বেহালা’ এই প্রান্তিক মানুষগুলোর জীবনী স্বকীয় কণ্ঠে তুলে ধরলেন অঞ্জন। তাঁকে যোগ্য সঙ্গত করলেন পুত্র নীল দত্ত।
সুমনের গানের কথা ধার করে বলতেই হয়, ‘ছেড়েছ তো অনেক কিছুই পুরোনো বোলচাল’, তবুও অধুনা বাংলাকে ব্যাকডেটেড বলা বাঙালিও ভিড় করে আধুনিক জীবনমুখী বাংলা গানের টানে কানায় কানায় ভরা প্রেক্ষাগৃহে। আধুনিক জীবনমুখী বাংলা গানের নস্টালজিয়ার হিয়া টুপটাপ সন্ধ্যায় দুয়েক পশলা সুমন-অঞ্জন যুগলবন্দির, সাক্ষী হতে। ব্রাউন ক্রো নিবেদিত ‘অনেকদিন পর’, সাক্ষী থাকল সুমন-অঞ্জনের কলকাতা, আমজনতার কলকাতা।
____________________
ছবি কৃতজ্ঞতা: স্যমন্তক সিনহা