
জিডি বিড়লা সভাঘরে অনুষ্ঠিত হল ড. সাহানা বাজপেয়ী একক
বিক্ষুব্ধ সময়ের ফসিল হয়ে থেকে যায় কোন কোন উপকরণ? যুদ্ধ-বুলেট নাকি কবিতা-গান? যুদ্ধের ইতিহাস রচিত হয়। আবার যুদ্ধের ময়দানে যে সৈনিকের মনে পড়ে প্রিয় বন্ধুর মুখ-হাত-কাঁধ – আর ঝাঁঝালো বুলেটের ধোঁয়ায় ম্লান হয়ে আসা গোলাপ, তার ইতিহাস কি লিপিকরেরা রচিত করেন? জানা নেই। শুধু এটুকু জানি, গান অশান্ত একাকী সময়ের সঙ্গী। এমনই এক অশান্ত সময়ে ‘সিটি অফ জয়’ উদযাপন করল বাংলা গান – সে গান কখনও রবীন্দ্রনাথের, কখনও লালন বা আব্দুল করিমের, সে গান কখনও প্রেমের। সৌজন্যে ড. সাহানা বাজপেয়ী (Dr. Sahana Bajpaie)।

স্পষ্টবাদী সাহানা ভরা প্রেক্ষাগৃহে মঞ্চ থেকে দৃপ্ত গলায় মেয়েদের রুখে দাঁড়ানোর কথা বলেন। এই পৃথিবীর সকল নির্যাতিতা মেয়ে হয়ে ওঠেন সেই সন্ধের মুখ।
এদিন সাহানা জোট বাঁধার কথা বললেন। বললেন যূথবদ্ধতার কথা। তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হল আরজি কর হত্যাকাণ্ড-এ তিলোত্তমার উদ্দেশ্যে গাওয়া রবীন্দ্রনাথের গান ‘আজি ঝড়ের রাতে’। সদ্য প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রতি শ্রদ্ধায় গাইলেন ‘মহারাজ একি সাজে’। তাঁর শৈশবের বন্ধু বিক্রম দাদার (বিক্রম সিং খাঙ্গুরা) উদ্দেশ্যে গাইলেন বহু পরিচিত ‘আমি বহু বাসনায়’। সাহানা বাজপেয়ীর কণ্ঠে আদরের সুর – এ কারণে বোধহয় বহু বহু বছরের পুরোনো গান নতুন করে মরমে প্রবেশ করে। আবিষ্কৃত হয়। অত্যন্ত সুচারুভাবে এদিন দুটি পর্বে ভাগ করা হয়েছিল সংগীতানুষ্ঠানটি। প্রথম পর্বে ছিল রবীন্দ্রনাথের গান। দ্বিতীয় পর্বে লোকসংগীত ও নিজেদের লেখা গান। রবীন্দ্রনাথ পর্বের একটা বড়ো অংশ জুড়ে ছিল বর্ষার গান। গাইতে গাইতে সাহানা ফিরে যাচ্ছিলেন শৈশবের শান্তিনিকেতনে। কাঁচামাটির রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালানো, বর্ষার সকালে স্কুল কামাই, ঝেঁপে বৃষ্টি এলে ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’।
শুরুতেই বলেছিলাম একটা গান হয়ে ওঠে বিক্ষুদ্ধ সময়ের চিহ্ন। গান স্লোগানে পরিণত হয়। কিম কি দুক-এর চলচ্চিত্রে আমরা দেখেছি মেশিনগান থেকে নিসৃত গুলি যখন মানুষের বুক ঝাঁঝরা করে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে; তখন এই মহাবিশ্বেরই কোনো এক মানুষ আরেক মানুষের ক্ষতচিহ্নে পুরে দিচ্ছেন চারা গাছ। এক সময় মৃতদেহ মাটি হয়ে ওঠে। গাছ মহীরুহে পরিণত হয়। সেরকমই টানাপোড়েনে সমাজব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষতচিহ্ন থেকে ধ্বনিত হয় সুর। সেই সুরের যেমন লিঙ্গ বিভাজন নেই, নেই জাতপাতের হিসেব। স্পষ্টবাদী সাহানা ভরা প্রেক্ষাগৃহে মঞ্চ থেকে দৃপ্ত গলায় মেয়েদের রুখে দাঁড়ানোর কথা বলেন। এই পৃথিবীর সকল নির্যাতিতা মেয়ে হয়ে ওঠেন সেই সন্ধের মুখ। ‘পরান সখা বন্ধু হে আমার’ হয়ে ওঠে অধিকার বুঝে নেওয়া আর ভালোবাসা চারিয়ে দেওয়ার গান।
শুধু তাই কেন! সাহানা তাঁর মায়ের প্রতি শ্রদ্ধায় গান ‘আমি অপার হয়ে বসে আছি’। আর তাঁর ‘প্রিয়বন্ধু’ মেয়ে রোহিণীর উদ্দেশ্যে গান ‘বন্দে মায়া লাগাইসে’। শেষ পর্বে শূন্য খাতার গান, আমার বন্ধু চিকন কালিয়া, একটা ছেলে, আমার হাত বান্ধিবি জনগণকে মুগ্ধ করে। সাহানাকে যাঁরা চেনেন, তাঁরা জানেন যে তিনি গান ভালোবেসে গান। প্রতিযোগিতা বা পুরস্কার পাওয়াকে জীবনের শেষ কথা মনে করেন না। সংসার-সন্তান সামলে, লন্ডনের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে (SOAS University of London) বাংলা পড়ানোর দায়িত্ব সামলে, দেশ-বিদেশে গানের অনুষ্ঠান সামলে পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, যেকোনও পরিস্থিতিতে সাংগীতিক চর্চা সর্বোপরি বাংলা গান গেয়ে চলাই তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র। মঞ্চে বাংলা গান ছাড়া অন্য ভাষার গান তেমন শোনা যায়নি সাহানার কণ্ঠে। নিজস্ব শিকড় আঁকড়ে বরাবরই নিজের কাজে স্বতন্ত্রতা এবং মেধার পরিচয় দিয়েছেন। রবীন্দ্রসংগীত বিষয়ে বিলেত অর্থাৎ ইউকে-র শিক্ষায়তনিক ইতিহাসে প্রথম ডক্টরেট সাহানা।
এদিন সাহানার কণ্ঠে ধ্বনিত হল আরজি করের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডে মেয়েটির উদ্দেশ্যে গাওয়া রবীন্দ্রনাথের গান ‘আজি ঝড়ের রাতে’। সদ্য প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রতি শ্রদ্ধায় গাইলেন ‘মহারাজ একি সাজে’। তাঁর শৈশবের বন্ধু বিক্রম দাদার (বিক্রম সিং খাঙ্গুরা) উদ্দেশ্যে গাইলেন বহু পরিচিত ‘আমি বহু বাসনায়’।

সেন’স মেলোডি নিবেদিত ‘এক সন্ধ্যায় একা সাহানা’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানটি কলকাতার জিডি বিড়লা সভাঘরে পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে অনুষ্ঠিত হল গত ১০ অগাস্ট। উপচে পড়া ভিড়েও অত্যন্ত যত্ন নিয়ে গোটা অনুষ্ঠানটি পরিচালিত করেছেন কর্তৃপক্ষ। সাহানা সেদিন একা ছিলেন না, তাঁকে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছেন গৌরব চ্যাটার্জি (গাবু), সম্রাট মুখার্জি, শুভাগত সিংহ, সৌপ্তিক মজুমদার এবং সুমিত দে। বলাই বাহুল্য, সাহানা সেদিন হয়ে উঠেছিলেন আমার, আপনার, আমাদের কণ্ঠ। এক সন্ধ্যায় হাজার সাহানা বেজে উঠেছিল প্রতিবাদী বাঙালির কণ্ঠে।
