
রসা ফার্মেসি কলকাতার বুকে টিকে থাকা প্রাচীন হোমিওপ্যাথিক প্রতিষ্ঠানগুলির একটি
দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম প্রাচীন এলাকা হাজরা (Hazra)। এখানে বসবাসের সূত্রে প্রায়ই যাতায়াত করতাম আশুতোষ মুখার্জি রোড দিয়ে। আসা যাওয়ার পথে বারবার নজরে পড়েছে রাস্তার ওপর একটি পুরোনো দোকানের সাইনবোর্ড। ‘রসা ফার্মেসি, ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত’ (‘Russa Pharmacy, established in 1919’)। দোকানের বাইরে সবসময় লম্বা লাইন রোগীদের। কীসের এতো লাইন? কোন ডাক্তারকে দেখানোর জন্য এতো ভিড় এখানে? স্বাভাবিকভাবেই মনের মধ্যে অদ্ভুত একটা কৌতুহল উঁকি দিত। ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বমহিমায় টিকে আছে রসা ফার্মেসি। শুধুই যে টিকে আছে তা নয়, উপরন্তু একই রকম আভিজাত্য বজায় রেখেছে এ দোকান। শহরের অন্যান্য পুরোনো বিল্ডিংয়ের মতো এ দোকানের বাইরের চিত্রটা অবশ্য অতটাও জরাজীর্ণ নয়, তবে ভিতরে উঁকি দিলেই চোখে পড়ে প্রৌঢ় চেহারাটা। ইতিহাসের সবটুকুই সযত্নে রক্ষণাবেক্ষণ করেছেন দোকানের মালিক। একই রকম রয়ে গেছে অবয়ব, ওষুধের আলমারি এমনকি চেয়ার-টেবিলগুলোও।

স্থির করলাম, একদিন দোকানের ভিতরে ঢুকবো। রোগী হিসাবে নয়, নিছকই দর্শক হিসাবে। দোকানের ভিতরে ওষুধের স্তূপ আর পুরোনো আলমারির আড়ালে নজরে পড়লো একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। চোখে পুরু ফ্রেমের চশমা, আর হাতে একাধিক ওষুধের খাম। প্রয়োজন মত আলমারি থেকে ওষুধ নামিয়ে, তুলে দিচ্ছেন রোগীদের হাতে। শুধু তাই নয়, যত্ন নিয়ে প্রত্যেককে বুঝিয়ে দিচ্ছেন কোন ওষুধটা ঠিক কখন খেতে হবে। এক ক্রেতার মুখে জানলাম, ইনিই বিখ্যাত ডাঃ মৃণালকান্তি ঘোষ (Dr Mrinal Kanti Ghosh)। চিকিৎসা পদ্ধতি এবং রোগ নিরাময়ের অব্যর্থ ওষুধই তাঁকে এনে দিয়েছে বিপুল খ্যাতি। শুধু কলকাতা (Kolkata) নয়, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সমস্ত অঞ্চল থেকে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ভিড় করেন রসা ফার্মেসিতে।
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার ক্ষেত্রে এখন প্রস্তুত চতুর্থ প্রজন্মের পথ চলা। এভাবেই যোগ্য উত্তরসূরির হাত ধরে এগিয়ে চলেছে ১০৩ বছরের পুরোনো পারিবারিক ঐতিহ্য।
একদিন চেম্বারের পর ডাক্তারবাবু কিছুটা সময় দিলেন আমায়। কথায় কথায় জানতে পারলাম রসা ফার্মেসির পথ চলা শুরু হয়েছিল তাঁর দাদু মনমোহন ঘোষের (Manmohan Ghosh) হাত ধরে। তিনি বলেন, “আমার দাদুর কোনোদিনই আনুষ্ঠানিক মেডিকেল ডিগ্রি ছিল না। নিজের চেষ্টায় বিভিন্ন বই পড়ে শিখেছিলেন চিকিৎসা পদ্ধতি। হোমিওপ্যাথির (Homoeopathy) প্রতি তাঁর অগাধ ভালবাসা এবং সাশ্রয়ী মূল্যে রোগীদের সেবা করার ইচ্ছা থেকেই তৈরি করেছিলেন রসা ফার্মেসি। আজীবন এ দোকানেই প্র্যাকটিস করে গেছেন। তাঁর চিকিৎসা পদ্ধতি অবাক করেছিল মানুষকে। রোগীরা সকলেই খুবই ভালোবাসতেন তাঁদের প্রিয় ডাক্তারবাবুকে।”
মৃণালকান্তিবাবুর বাবাও ছিলেন একজন নাম করা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। ডাঃ মণীন্দ্র চন্দ্র ঘোষ (Manindra Chandra Ghosh)। কলকাতাতেই পড়াশোনা করেছিলেন। ১৯৪০-এর দশকে ডাক্তার হিসেবে প্রথম পা রাখেন এই ফার্মেসিতে। বাবা মনমোহন ঘোষের মতো একই পথে হেঁটেছেন মণীন্দ্রবাবু। জীবদ্দশায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় অলৌকিক কৃতিত্ব অর্জন করেছেন তিনি। রোগীদের কাছে তিনি ছিলেন সাক্ষাৎ ধন্বন্তরি। শুধু রোগ নিরাময় নয়, পাশাপাশি অসুস্থ এবং দুস্থ ব্যক্তিদের আর্থিকভাবে সহায়তাও করতেন মণীন্দ্রবাবু। তাঁর ছেলে ডাঃ মৃণালকান্তি ঘোষ গর্বের সঙ্গে জানান, “বাবার রোগীদের মধ্যে ছিলেন একাধিক নামজাদা এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। যেমন – কমান্ডার মানেকশ, মিঃ ওগলে (খিদিরপুর ডকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা), মিঃ রাজেন (কোডাক ফিল্মের একজন শীর্ষ আধিকারিক) সহ আরও অনেকে।”

এককালে কলকাতা ছিল কলেরা এবং টাইফয়েডের মতো গ্রীষ্মকালীন রোগের কেন্দ্রস্থল। ঠিক এরকম সময়ে মৃণালবাবুর বাবা মুমূর্ষু রোগীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। রসা ফার্মেসিতে আজও দূর-দূরান্ত থেকে ভিড় জমে রোগীদের। পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই এমনকি ভারতের অন্যান্য রাজ্য এবং দেশের বাইরে থেকেও ক্রেতারা আসেন এই দোকানে। বাবা-দাদুর থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই এ পেশায় আসেন ডাঃ মৃণাল কান্তি ঘোষ। নিজেকে মানবতার কাজে নিয়োজিত করেন। বি.এস.সি, ডি.এম.এস ডিগ্রি অর্জন করে যোগদান করেন ফার্মেসিতে। এখনও সেই সেবাই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
আনন্দের বিষয় হল এই যে, মৃণালবাবুর ছেলে মৃত্যুঞ্জয় ঘোষও (Mrityunjay Ghosh) পারিবারিক পন্থা মেনে এই পেশাকে বেছে নিয়েছেন। পড়াশোনা করছেন BHMS (হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারির ব্যাচেলর) ডিগ্রির জন্য। সুতরাং, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার ক্ষেত্রে এখন প্রস্তুত চতুর্থ প্রজন্মের পথ চলা। এভাবেই যোগ্য উত্তরসূরীর হাত ধরে এগিয়ে চলেছে ১০৩ বছরের পারিবারিক ঐতিহ্য।
সাধারণত রাত সাড়ে দশটার আগে বন্ধ হয় না রসা ফার্মেসি। দিনের শেষ রোগীটিকে পর্যন্ত যথাযথ চিকিৎসা করে তবেই কাজ শেষ হয় ডাক্তারবাবুর। সময়ের কাঁটা মেনে কখনও কাউকে দোরগোড়া থেকে ফিরিয়ে দেন না তিনি। তাঁর কাজই তাঁকে কলকাতার বুকে ‘মিরাকেল ম্যান অফ হোমিওপ্যাথি’ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সময় এগিয়েছে ঠিকই, তবে দোকানটি তার পুরোনো আভিজাত্য বজায় রেখেছে। প্রাচীন আসবাব, বেত এবং খোদাই করা কাঠের তৈরি ডাক্তারের চেয়ার-টেবিল, সবই রয়েছে আগের মতো। চার ধারের দেওয়ালে কাচ দেওয়া আলমারিতে থিকথিক করছে কয়েক’শ ওষুধের শিশি। কিন্তু দোকানে কোনোও কম্পাউন্ডার নেই, কারণ সবটা স্বয়ং ডাক্তারবাবুর নখদর্পণে। তিনিই জানেন কোন ওষুধটি কোথায় আছে। নিজে হাতেই তৈরি করেন রোগের সঠিক মিশ্রণটি।
