নিরন্তর : রবীন্দ্রনাথের ‘অনন্ত মরণ’ অবলম্বনে এক ব্যতিক্রমী নৃত্য-প্রযোজনা

নির্দেশনায় নৃত্যবিদূষী দেবশ্রী ভট্টাচার্য এবং সোহিনী দেবনাথ

ভানু সিংহের পদাবলীতে যে কবি ‘মরণরে তুই মম শ্যাম সমান’ বলে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চাইলেন- সেই কবিই ‘ছবি ও গানে’ আবার সুবিপুল মর্তপ্রীতিতে গেয়ে উঠলেন “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে। মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই”। ক্ষণিকায় এসে তিনিই আবার বললেন “মৃত্যু জীবনের সহজ সত্য”। মৃত্যু নিয়ে রবীন্দ্রনাথ অজস্র লিখেছেন। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন স্তরে তাঁর কাছে ধরা দিয়েছে মৃত্যুর রূপ। কোনও এক স্তরে রবীন্দ্রনাথের কাছে মৃত্যু হল জীবনের পূর্ণতা, পরম আত্মীয়, এক নতুন যাত্রার সূচনা। ‘অনন্ত মরণ’ কবিতা যাঁরা পড়েছেন তাঁরা এর মর্ম জানেন। যেমন জেনেছেন দুই নৃত্যবিদূষী, দেবশ্রী ভট্টাচার্য এবং সোহিনী দেবনাথ। প্রখ্যাত কত্থকশিল্পী, পদ্মশ্রী ড. রানি কর্ণের এই দুই ছাত্রী, রবি ঠাকুরের ‘অনন্ত মরণ’ অবলম্বনে নির্মাণ করেছেন একটি ব্যতিক্রমী মঞ্চ প্রযোজনা, ‘নিরন্তর’।

কত্থকটা তাঁদের কাছে একটা ভাষা। তাঁরা ঠিক করেছিলেন সেই ভাষাতেই নিজেদের জার্নি, নিজের গল্পটা বুনবেন। যদিও আপাতদৃষ্টিতে নাচের মতো প্রাণবন্ত একটা বিষয়ের সঙ্গে এই কবিতার নির্বাচন অনেকের ঠিক মনে নাও হতে পারে।

মৃত্যু মানেই অন্ধকার নয়। মৃত্যু বর্ণিল—জীবনের মতোই বহুরূপী, বহুমাত্রিক। জীবন ও মৃত্যুর অবিরাম, উদাসীন প্রবাহের মধ্যে কবি যে গভীর সত্যের সন্ধান করেছেন, সেই ভাবনাই এই প্রযোজনার সৃজন-অন্বেষণের প্রেরণা। এখানে নির্দেশকদ্বয় বিশ্বাস করেছেন, জীবন আসলে অসংখ্য ক্ষুদ্র মৃত্যুর সমষ্টি। প্রতিটি পরিবর্তন, প্রতিটি বিচ্ছেদ, প্রতিটি উত্তরণ এবং প্রতিটি নবসূচনা—নিজের মধ্যেই বহন করে এক একটি মৃত্যুর অভিজ্ঞতা। সেই অর্থে মৃত্যু শুধু জীবনের অন্তিম পরিণতি নয়; বরং জীবনের অন্তর্লীন এক চলমান রূপান্তর। ‘নিরন্তর’ সেই রূপান্তরের কথাই বলে। এই প্রযোজনায় নৃত্য, সংগীত, আলোকসজ্জা এবং চলমান চিত্রের সমবায়ে দেবশ্রী ও সোহিনী অনুসন্ধান করেছেন জীবন ও মৃত্যুর মধ্যেকার সেই সূক্ষ্ম, অনিবার্য এবং চিরন্তন সম্পর্ককে। তাঁরা দুজনেই যুগ্মভাবে একটা দীর্ঘ সময় ধরে ‘সংযোগ’ নামে একটি পরিবেশনা মঞ্চস্থ করে আসছেন। কত্থকটা তাঁদের কাছে একটা ভাষা। তাঁরা ঠিক করেছিলেন সেই ভাষাতেই নিজেদের জার্নি, নিজের গল্পটা বুনবেন। যদিও আপাতদৃষ্টিতে নাচের মতো প্রাণবন্ত একটা বিষয়ের সঙ্গে এই কবিতার নির্বাচন অনেকের ঠিক মনে নাও হতে পারে। দুই নৃত্যশিল্পীর মতে, “২০২১-এ, কোভিডের সময় যখন চারিদিকে শুধু মৃত্যু আর মৃত্যু, সেই সময় একটা অনুষ্ঠান আসে এবং এই কবিতাটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয় এবং কবিতাটা এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়। মৃত্যু বললেই আমাদের মধ্যে যে ভয়, হারানো বা নেতিবাচক আতঙ্ক কাজ করে, তার থেকে যেন মুক্তি পেলাম আমরা। মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে একটা পজিটিভ এনার্জির সন্ধান পেলাম যেন। বলা যায় মৃত্যুকে অতিক্রম করার সাহস পেলাম। এই কবিতা আমাদের শিখিয়েছে জীবনের মধ্যেই অজস্র মৃত্যু আছে, আর মৃত্যুর মধ্যেই অনেক জীবন। একটার থেকে আরেকটাকে বাদ দেওয়া যাবে না। কিন্তু এই ধারণাকে নাচের মাধ্যমে উপস্থাপন করবো কীভাবে, তা নিয়ে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি আমরা। প্রথমেই সংগীত নিয়ে ভেবেছি, এখানে ছত্তিশগড়ের লোকগান, কর্নাটকী সংগীত আছে, রবীন্দ্রসংগীত আছে। ছত্তিশগড়ের গানগুলি নির্বাচণ করতে হাবিব তানভীরের মেয়ে, আমাদের বন্ধু নাগিন খুব সাহায্য করেছে। আমরা এটা ভেবে এগোয়নি যে রবীন্দ্রনাথের কবিতা নিয়ে কাজ করছি মানে শুধুই রবীন্দ্রসংগীত থাকবে। কিন্তু এটা মাথায় রেখেছিলাম যে যাই এক্সপেরিমেন্ট করি না কেন, সেটা যেন সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।”

প্রত্যেক মুহূর্তে আমাদের শরীরের অসংখ্য সেল মরে যায়, ‘অনন্ত মরণ’-এ আছে “যত বর্ষ বেঁচে আছি তত বর্ষ মরে গেছি,/ মরিতেছি প্রতি পলে পলে” -এই যে বহুস্তর, মাল্টিপল লিনিয়র, সেটাকেই তাঁরা চেষ্টা করেছেন বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে একটা গল্পের আকারে তুলে ধরতে। এমন নয় যে কবিতাটা চলছে, তাঁরা নাচছেন। কবিতার নির্যাসটা অক্ষুণ্ণ রাখতে চেয়েছেন তাঁরা। তাই, পরিবেশনার শুরুতেই প্রলগে থাকছে জন্ম ও মৃত্যুই একমাত্র সত্য, বাকিটা নাটক। কবিতা অনুসারে, এই উপস্থাপনায় মৃত্যু হলো একজন মহান উপস্থাপক বা মা।

এমন নয় যে কবিতাটা চলছে, তাঁরা নাচছেন। কবিতার নির্যাসটা অক্ষুণ্ণ রাখতে চেয়েছেন তাঁরা। তাই, পরিবেশনার শুরুতেই প্রলগে থাকছে জন্ম ও মৃত্যুই একমাত্র সত্য, বাকিটা নাটক। কবিতা অনুসারে, এই উপস্থাপনায় মৃত্যু হলো একজন মহান উপস্থাপক বা মা।

যতটুকু বর্তমান, তারেই কি বল’ প্রাণ?/ সে তো শুধু, পলক, নিমেষ। এই একটা লাইনেই কত স্তর আছে, সেটা ভাবতেই তাঁদের দু-তিনদিন কেটে গিয়েছিল। কনসেপ্ট তো মৃত্যু, কিন্তু এই লাইনগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা কী করবেন, কী দেখাবেন, তাঁদের আঙ্গিকে এটা রূপ দেবেন কী করে, বহুদিন ভেবেছি তাঁরা। গত পাঁচ বছর ধরে ভেবে গেছেন এটা নিয়ে কিছু করবেন। গত এক বছর ধরে উপস্থাপনাটা তৈরি করেছেন। মঞ্চে পরিবেশনার নেপথ্যে সমান্তরাল ভাবে চলবে একটি চলচ্চিত্র। যেটা বানিয়েছেন লুব্ধক চট্টোপাধ্যায়। এখানে সিনেমার কথা ভাবা হয়েছে কারণ, ক্যামেরার লেন্সে এমন অনেক সূক্ষ্ম জিনিস ধরা পড়ে, যা অনেক সময় সাধারণের চোখ এড়িয়ে যায়। এইভাবে নানা স্তরে এই উপস্থাপনাকে ভাবা হয়েছে। 

 

এর আগেও পারফর্মিং আর্টস, মূলত ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যশৈলী নিয়ে ভিন্ন ঘরানার ছবি করেছেন পরিচালক লুব্ধক চট্টোপাধ্যায়। লুব্ধক নির্মিত ‘বৈখরী’ বা ‘আহূতি’ দেখলে বোঝা যাবে, সেখানে নাচ শুধুমাত্র নান্দনিক উপস্থাপনা নয়, সিনে-কাব্যময়তায় সিক্ত স্বতঃপ্রণোদিত দর্শন। বঙ্গদর্শন.কম-কে লুব্ধক বলছিলেন, “আমি সবসময় একজন পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পারফর্মিং আর্টের ভাষাকে বোঝার চেষ্টা করেছি। এছাড়াও আমি নিজে আর্ট-কিউরেশন করি, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান কিউরেট করেছি। এটা করতে গিয়ে বহু নৃত্যশিল্পীদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, খুব কাছ থেকে তাঁদেরকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। সেখান থেকে মুভমেন্ট কীভাবে লেন্সবন্দি করতে হবে, তার ধারণা পেয়েছি। কিন্তু এই কাজটা আমার কাছে একদম অন্যরকম অভিজ্ঞতা হয়ে এসেছে। তার কারণ, এখানে শুধুমাত্র নাচকে ক্যামেরাবন্দি করা আমার কাজ ছিল না, এখানে সিনেমাটা একটা বহুস্তরীয় মঞ্চ উপস্থাপনার অংশ, যেমন ভাবে নাচ, কণ্ঠসংগীত, আবহসংগীত বা আলো। প্রত্যেকটা স্তর যাতে প্রত্যেকটা স্তরের সঙ্গে মিশে যেতে পারে, সেদিকটা খেয়াল রাখতে হয়েছিল। মঞ্চে স্ক্রিনটাকে অনেকগুলো ভাগে ভাগ করেছি আমরা, অনেকটা মাল্টিচ্যানেল ভিডিও ইন্সটলেশনের মতো দাঁড়িয়েছে ব্যাপারটা। আমার মতে, স্টেজ ও স্ক্রিন একে অপরের পরিপূরক, আলাদা নয়। দুই নিয়েই ‘নিরন্তর’। উপস্থাপনাটির দুই নির্দেশকের সঙ্গে পরিচয় ও কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকাটা এখানে কাজে লাগাতে পেরেছি। একে অপরের ভাবনার সঙ্গে সংযুক্ত হতে পেরেছি, নিজেকে ভাঙতে পেরেছি। ভবিষ্যতে এরকম পরীক্ষামূলক কাজের জন্য মুখিয়ে থাকবো।”

_____________________
নি ন্ত
ভাবনা ও নির্মাণ: দেবশ্রী ভট্টাচার্য ও সোহিনী দেবনাথ
আলো: দীনেশ পোদ্দার | সংগীত: রাজেশ্বরী গাঙ্গুলী ব্যানার্জী | চলচ্চিত্র: লুব্ধক চ্যাটার্জি
টিকিট মূল্য: ৫০০/৩০০ | ১৭ জুন (বুধবার), জ্ঞান মঞ্চে প্রিমিয়ার
সহযোগী লিংক: (ক্লিক করুন)

______________________
আমাদের কাছে মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়; এক অবিরাম যাত্রার অংশ—যেখানে শেষের মধ্যেই নিহিত থাকে শুরুর সম্ভাবনা, আর বিলয়ের মধ্যেই জেগে থাকে সৃষ্টির বীজ। এই কাজ সেই অনন্ত প্রবাহকে অনুভব করার প্রয়াস হিসেবে কতটা প্রভাব রাখতে পারবে, তা দেখতে হলে পৌঁছে যেতে হবে জ্ঞান মঞ্চে, সন্ধে ৭টায়।
 

Developed by DXDasia