
শান্তিনিকেতনী আলপনার যাত্রাপথ
শান্তিনিকেতনী আলপনার বৈশিষ্ট্যে চিতল মাছ এর আলংকারিক রূপ, শিল্পী- রিয়া দিন্ডা
আলপনা বাংলার এক সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। বিভিন্ন ব্রত আলপনায় পদ্ম, মাছ, পাখি, কুলো, ধানের গোলা, রান্নাঘর, গোয়ালঘর, সুপারি গাছ, তালগাছ, কলমিলতা, চালতালতা, সোনার গয়না, নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহস্থলির সামগ্রী তথা প্রকৃতি ও সমাজ জীবনের সরলরৈখিক চিত্র ফুটে উঠেছে বারবার বঙ্গ রমণীদের হাত ধরে। অন্তরের সুপ্ত কামনা বাসনা ও নান্দনিক চেতনা নিকোন উঠানের উপর সাদা পিটুলি গোলায় আলপনার রূপ পেয়েছে।

শিল্পী সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের ‘কুটো মুখে নিয়ে পেখম উঁচিয়ে নৃত্যরত ময়ূর’ আলপনা অবলম্বনে শাড়িতে কাজটি করেছেন রিয়া দিন্ডা
শিল্পীর মনন ও উদ্ভাবনী শক্তিতে লোকায়ত সহজ সরল ছন্দ, বৈদিক আলপনা ও দেশ-বিদেশের নানা প্রদেশের অলঙ্করণের ধারা এক সূত্রে গাঁথা হয়ে শান্তিনিকেতনী আল্পনা অনন্য অভিযাত্যপূর্ণ চিত্রময়তায় পরিপূর্ণতা পায়।
“ভাদুলি, সেঁজুতি, পুন্যিপুকুর, মাঘমণ্ডল” প্রভৃতি ব্রত আলপনার ঠাট ও চরিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তা ছিল সহজ সরল শিশু চিত্রের সারল্যে পরিপূর্ণ। এখান থেকে শুরু করে আজ শান্তিনিকেতনী আলপনার যে উর্বর পরিশীলিত রূপ আমরা দেখতে পাই, তার সূত্রপাত রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে। তিনি তপবনের আদর্শে আশ্রম বিদ্যালয় গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে প্রাকৃতিক পরিবেশ এর মধ্যে সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে শিল্প ও সাহিত্য। আলপনার যে শুভ্র শুদ্ধ রূপ তুলসী তলা ও গোবর নিকোন উঠোনকে নিমেষে পবিত্র করে তোলে, দেবতার পূজা গ্রহণের আবহ তৈরি করে তা যে শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক পরিবেশ এর সঙ্গে কতখানি সঙ্গতিপূর্ণ ও সমাদৃত হলো তা বলা বাহুল্য। রবীন্দ্রনাথ নিজে শিলাইদহ থেকে বাংলাদেশি মহিলাদের দিয়ে পাতার ওপর আলতা দেওয়া আলপনা সংগ্রহ করে আনলেন।
গোড়ার দিকে ক্ষিতিমোহন সেন ও তাঁর স্ত্রী কিরণবালা দেবী শান্তিনিকেতনে আলপনার ভার গ্রহণ করেন। ১৯১১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পঞ্চাশ তম জন্মদিন উপলক্ষে প্রস্ফুটিত পদ্ম ও তার চারিদিকে ঘিরে থাকা চতুষ্কোণ বৈদিক যাগযজ্ঞের নকশা দেখতে পাওয়া যায়। পরে ১৯১৪ সালেও এই ধরনের নকশার পুনরাবৃত্তি দেখা যায় নন্দলাল বসুর সংবর্ধনায়। হিন্দু ধর্ম শাস্ত্র ও বৈদিক প্রথা সম্পর্কে ক্ষিতিমোহন সেনের প্রগাঢ় জ্ঞান প্রতিফলিত হয়েছিল তাৎকালীন আলপনায়।

শান্তিনিকেতনী আলপনার বৈশিষ্ট্যে হলুদ গাছের ফুলের আলংকারিক রূপ, শিল্পী- রিয়া দিন্ডা
শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ এর মতে “প্রেরণা ও গতি” আলপনার দুটি বৈশিষ্ট্য। নন্দলাল অনুভব করলেন “আলপনা হল নৃত্য ভঙ্গির মতো। গতিই হল আলপনার প্রাণ”।
নন্দলাল বসু ১৯১৯ থেকে কলাভবনের দায়িত্ব নেন। অসিত হালদার, সুরেন কর, মানি গুপ্তের সঙ্গে নন্দলালও বৈদিক আদর্শে আলপনা দিতে থাকলেও তাঁর মন নিবিষ্ট চিত্তে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ ও তার থেকে আলপনার রসদ সংগ্রহে উদগ্রীব হয়ে থাকে। প্রায়ই তাঁকে ছাতিমতলায় অনুশীলনরত দেখতে পাওয়া যায়। তিনি বাংলার টেরাকোটা মন্দির এর নকশা, পুরাতন বাসনের ডিজাইন, রথ গাত্রের নকশা, পটচিত্র সব থেকেই আলঙ্কারিক বৈশিষ্ট্য খুঁজে বের করেন। এরপর ভগিনী নিবেদিতা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে পরামর্শ করে নন্দলাল বসুকে একপ্রকার জোর করেই পাঠালেন অজন্তায় ভারতীয় সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের জন্য। নন্দলাল বসু অজন্তার গুহাচিত্র দেখে মোহিত হয়ে সদক্তি করেছিলেন “গত জন্মে আমি বোধহয় অজন্তায় এসে এ কারুকার্য করে গেছি।”
ফিরে এসে শান্তিনিকেতনে তাঁর দেওয়াল চিত্রে অজন্তার প্রতিফলন দেখা গেল। এছাড়াও উত্তর- দক্ষিণ ভারত, উড়িষ্যার মন্দির গাত্রের ভাস্কর্য থেকে তাঁর আহরণ করা আলংকারিক ছন্দ পরবর্তীতে শান্তিনিকেতনী আলপনার অভিজাত রূপদানে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। পরে চীন, জাভা, শ্রীলঙ্কা, ইজিপ্ট, পারস্য, ফ্লোরেন্স এর অলঙ্করণ মিশে গেল তাঁর আলংকারিক চেতনায়। শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ-এর মতে “প্রেরণা ও গতি” আলপনার দুটি বৈশিষ্ট্য। নন্দলাল অনুভব করলেন “আলপনা হল নৃত্য ভঙ্গির মতো। গতিই হল আলপনার প্রাণ”। উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহের মূল ছন্দকে ধরে তাঁর অলংকরণ নৃত্যভঙ্গিমায় গতিময় হয়ে উঠল। প্রকৃতি যে নতুন নকশা তৈরির একমাত্র অবলম্বন, তাৎকালীন ছাত্র-ছাত্রীদের তিনি এ শিক্ষাই দিলেন সযত্নে।

গ্রামীণ আলপনার আদি রূপ (অবনীন্দ্রনাথের ‘বাংলার ব্রত’ বই থেকে সংগৃহীত)
১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথ পূর্ব বঙ্গ থেকে সসম্মানে নিয়ে আসেন বাল্যবিধবা সুকুমারী দেবীকে। তিনি ছবি আঁকা, ব্রত আলপনা ও সূচিশিল্পে সুদক্ষ ছিলেন। নন্দলাল বসুর কাছে দিনে ছবি আঁকা শেখার পাশাপাশি বিকেলে মহিলাদের আলপনার ক্লাস করাতেন তিনি। তাঁর নিজস্ব মনন ও শৈল্পিক সত্তায় গ্রামীণ আলপনা এক অনন্য রূপ পায়। শিল্পীর মনন ও উদ্ভাবনী শক্তিতে লোকায়ত সহজ সরল ছন্দ, বৈদিক আলপনা ও দেশ-বিদেশের নানা প্রদেশের অলঙ্করণের ধারা এক সূত্রে গাঁথা হয়ে শান্তিনিকেতনী আলপনা অনন্য অভিযাত্যপূর্ণ চিত্রময়তায় পরিপূর্ণতা পায়।

শান্তিনিকেতনে আলপনা দিচ্ছেন অমলা সরকার, গৌরী ভঞ্জ ও যমুনা সেন (বাঁ দিক থেকে)
নন্দলাল বসুর দুই সুযোগ্যা কন্যা গৌরী ভঞ্জ, যমুনা সেন, এই ধারাকে আরো সমৃদ্ধ করেন নিজ নিজ শিল্পমননে। বসন্তোৎসব, খ্রিস্টোৎসব, বৃক্ষরোপণ, হলকর্ষণ প্রভৃতিতে বিষয়বস্তু ভেদে আলপনার ভিন্ন ভিন্ন রূপ প্রকাশ পায়। প্রথম দিকের আলপনা চাল বাটা-পিটুলি গোলা দিয়ে হলেও পরে পঞ্চ গুঁড়ি, খড়ি মাটি, গিরি মাটি, শস্য দানার ব্যবহার দেখা যায় শান্তিনিকেতনী আলপনায়। অধ্যাপক ননীগোপাল ঘোষ, প্রণব রায় প্রমুখ উপযুক্ত অধ্যাপকেরা এই ধারাবাহিকতা কে সগৌরবে বহন করেছিলেন।

শান্তিনিকেতনের শ্যামলী-বাড়িতে আলপনা দিচ্ছেন সুধীরঞ্জন মুখার্জি
এর পর শ্রদ্ধেয় মাস্টারমশাই শ্রী সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায় নন্দলাল বসুর দেখানো পথে প্রকৃতি ও প্রকৃতি পর্যায় এর রবীন্দ্র সংগীত থেকে রসদ সংগ্রহ করে নিজ উদ্ভাবনী শক্তিতে এ ধারাকে আরো সমৃদ্ধ করে তুললেন। যা কিছু দৃশ্যমান গাছপালা, পাখি, ফুল, আকাশ, ঘাস, সমুদ্রের ঢেউ, মেঘ সবেতেই আলপনা লুকিয়ে আছে, তাঁর ধ্যানীর দৃষ্টিতে সেইসব প্রাকৃতিক উপাদানকে আলপনায় বিস্ময়কর রূপ দিয়ে চলেছেন। আলপনাকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছেন তিনি, যা অবর্ণনীয়, অপার বিষ্ময়ে এবং মুগ্ধতায় নিরবে সে শুধাপান করা যায় শুধু ! তা অনুভূতিরও পার! অনলাইন অফলাইন মাধ্যমের দ্বারা বিশ্বের দরবারে পৌঁছে গেছেন তিনি। দরদী শিক্ষক হিসেবে তিনি অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করছেন সারাবিশ্বের অগণিত শিক্ষার্থীকে। নব প্রজন্ম নতুন করে ভালোবাসতে শিখছে আলপনাকে তাঁর হাত ধরে।
এমনি করেই জন্মলগ্ন থেকে সুদক্ষ শিক্ষক ও সুযোগ্য ছাত্র-ছাত্রীর পুণ্যমিলনে রবিঠাকুরের প্রকৃতি চেতনায় উদ্ভাসিত এই আলপনা তার আদর্শকে রক্ষা করে এগিয়ে চলেছে।
_____________________________
গ্রন্থ ঋণ: ‘বাংলার আলপনা’- সুধাংশুকুমার রায়
ব্যক্তি ঋণ: সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়