কেন ডবল ইঞ্জিন! তিনি কি নিজের দলের জন্মবৃত্তান্তটাই ভুলে গেছেন?

বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার কি আদৌ সাচ্চা কথা বলছেন!

এই পর্বে সারা দেশে পাঁচটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হচ্ছে। তার মধ্যে আছে পশ্চিমবঙ্গ, কেরল, তামিলনাড়ু, পুদুচেরি এবং আসাম। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi) এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে দলীয় প্রচারে ছুটে বেড়াচ্ছেন। এই ভোট পর্বে নরেন্দ্র মোদি একটি স্লোগান আমদানি করেছেন। তা হল কেন্দ্রে এবং সমস্ত রাজ্যে একই দলের সরকার চায়। সেই ডবল ইঞ্জিনই নাকি রাজ্যগুলির প্রকৃত উন্নয়নের আসল চাবিকাঠি।

কথাটা শুনলে অনেকের মনে হতে পারে প্রধানমন্ত্রী সাচ্চা কথা বলেছেন। কিন্তু এমন একটি সরেস বাক্য উচ্চারণ করার সময় গুজরাটি সিংহ আসলে তাঁর নিজের দলের জন্মবৃত্তান্তটাই ভুলে গেছেন। যে দল এবং যে নির্বাচনী প্রতীক সামনে রেখে তিনি রাজনৈতিক আত্মপরিচয় ঘোষণা করছেন, সেই বিজেপির জন্ম কিন্তু ১৯৭৯ সালে। একদা যারা হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ বা আরএসএস করতেন তাঁরাই এই দল গঠন করেছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণের তৈরি জনতা পার্টি ভেঙে যাবার পর।

কিন্তু তার আগের এক দশকের ইতিবৃত্ত কেবল সাধারণ ভোটদাতা নয়, বিজেপি সমর্থকদেরও মনে রাখা দরকার। ১৯৬৯ সালে কংগ্রেস দল দু-টুকরো হয়ে যায়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধকে পুঁজি করে ইন্দিরা গান্ধি (Indira Gandhi) সংসদে  দুই তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা পান। সারা দেশের সমস্ত রাজ্যের শাসনও তখন কংগ্রেসের হাতে। দক্ষিণের কেরলে সিপিআই নেতা অচ্যুত মেননের সরকার বা তামিলনাড়ুর এমজি রামচন্দ্রনের সরকারও তখন ইন্দিরা কংগ্রেসের সমর্থন তুষ্ট। এই সময়েই ১৯৭২ সালে আবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচন আসে। রাজ্যে কংগ্রেসের কর্ণধার সিদ্ধার্থ রায়ের নেতৃত্বে সেই নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হয়। এমনকি জ্যোতি বসুও (Jyoti Basu) বরানগর কেন্দ্রে হেরে যান। তখন থেকেই ভারতে নির্বাচনী রাজনীতিতে "রিগিং" শব্দটি স্থান পায়।

প্রবীণ গান্ধিবাদী জয়প্রকাশ নারায়ণ এই ডবল ইঞ্জিন প্রবণতার মধ্যেই স্বৈরাচারের আভাস পান। এবং তার বিরুদ্ধে দলীয় পতাকাহীন গণ-আন্দোলনের ডাক দেন। সেই ধাক্কাতেই দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়, ব্যাপক ধরপাকর চলে এবং প্রেস সেন্সরশিপও জারি হয়। এই প্রেক্ষাপটেই ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে ইন্দিরার দলের পরাজয় ঘটে এবং মোরারজী দেশাইয়ের নেতৃত্বে কেন্দ্রে প্রথম অকংগ্রেসি সরকার গঠিত হয়। অটলবিহারী বাজপেয়ী এবং লালকৃষ্ণ আদবানিও সেই মন্ত্রীসভার সদস্য ছিলেন। ওই বছরই কাশ্মীর থেকে কন্যা কুমারিকা পর্যন্ত নানা রাজ্যেও গড়ে ওঠে নানা দলের অকংগ্রেসি সরকার।

দেশ স্বাধীন হবার পর থেকে কংগ্রেস নেতৃত্ব এই ডবল ইঞ্জিনের কথাই বলে আসছিল। সেই ধারণাকে ভ্রান্ত প্রমাণ করেছে জয়প্রকাশের আন্দোলন। আর সেই বাতাবরণেই জন্ম হয়েছে বিজেপি দলটির। কেন্দ্রে মাত্র সাত বছর ক্ষমতায় থেকেই মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি আবার সেই ডবল ইঞ্জিনের খোয়াব দেখতে শুরু করেছে। আর সেটা করতে হচ্ছে নিজ দলের জন্মের বৃত্তান্ত আড়াল করেই।

এই সূত্রেই নরেন্দ্র মোদিকে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে, ১৯৫৭ সালে তৃতীয় সাধারণ নির্বাচনে কেরলে কমিউনিস্ট সরকার গঠিত হয়। ডবল ইঞ্জিনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। মোদি নিজে যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হলেন তখনও কেন্দ্রে কংগ্রেসের সরকার ছিল। এক ইঞ্জিন চালিয়েই তিনি রাজনীতিতে ঠাঁই পেয়েছেন। কংগ্রেস যখন ডবল ইঞ্জিনের গুণগান করত বা মোদি যেমন আজকাল করছেন তার পেছনে মানুষের পৃথক রাজ্যভিত্তিক কণ্ঠকে অস্বীকার করা হচ্ছে।

কিন্তু ভারতীয় সংবিধানে তার বিপরীত ধারণাই স্থান পেয়েছে। তাতে বলা আছে, ভারত হল বিভিন্ন রাজ্যসমূহের একটি মহাসংঘ বা ফেডারেশন। তাই তার নাম ফেডারেল নেশন। এমন সংবিধান প্রণয়নে উদ্যোগী ছিলেন কংগ্রেসী নেতারা। কিন্তু পরের ত্রিশ বছর ক্ষমতায় বসে তাঁরা সংবিধানকে ধর্মে ফেডারেল রেখেও কর্মে ইউনিটারি করে চলেছেন। 

বিজেপির যারা চিন্তানায়ক, সেই সাভারকার-হেগ্রেওয়াড়-মুঞ্জেদের সংবিধান প্রণয়নে কোনো ভূমিকা ছিল না। কারণ তাঁরা কোনো ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র চাননি। কিন্তু জয়প্রকাশের আন্দোলনের জোয়ারে কিছুকালের জন্য হলেও বিজেপি বহুদলীয় বিকাশের পক্ষে ছিল। ২০১৪ সালে মোদি-অমিতের হাতে বিজেপি নামক বাঘটি প্রথম রক্তের স্বাদ পেয়েছে। এবার তার ভোলবদলের পালা। সেই কারণে মোদির এখন ডবল ইঞ্জিন হাতে চায়।

Developed by DXDasia