নবদ্বীপের শিবের মুখোশ : বিলুপ্তির পথে এই হস্তশিল্পের ঐতিহ্য

প্রত্যেক শিল্পীর বানানো মুখোশেই আছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য

এখন অনেকেই চাইছেন নিজস্ব ঐতিহ্যের শিকড়ে ফিরতে। তবে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে অনেক বাঙালিই ক্রমাগত নিজের ঐতিহ্য থেকে দূরে সরে গেছেন, যাচ্ছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই বিশ্বে নিজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি অনেকেই আজ উদাসীন। এর ফলে নবদ্বীপে হর-পার্বতীর বিয়েকে ঘিরে, শিবের মুখোশ তৈরিকে কেন্দ্র করে যে ব্যস্ততা স্থানীয় মৃৎশিল্পীদের মধ্যে দেখা যেত, তা এখন অবলুপ্তির পথে।

চৈত্র মাসের শুক্লা সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত সিংহবাহিনী দশভূজা বাসন্তীর পুজো হয়। দশমী পুজোর পর সেই রাতে শিবের বিয়ের ঐতিহ্য নবদ্বীপে রয়েছে। বুড়োশিব, যোগনাথ, বালকনাথের মতো ঐতিহ্যশালী মন্দিরগুলোতে একসময় মহাসমারহে শিবের বিয়ের প্রচলন ছিল। মোবাইল-সর্বস্ব দুনিয়ায় এখন শিশুদের মধ্যে চতুর্দলা বানিয়ে, শিবের মুখোশ নিয়ে চাঁদা তুলে হর-পার্বতীর বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ খুব কম দেখা যায়। একসময় এই বিয়েকে কেন্দ্র করে শিবের মুখোশ বিপুল পরিমাণে তৈরি হতো নবদ্বীপের পটুয়াপাড়াগুলিতে। শিবের মুখোশ নির্মাণের মধ্য দিয়ে নবদ্বীপের মৃৎশিল্পীরা নিজেদের নান্দনিক শিল্পসত্তার প্রকাশ করতো। বর্তমানে কয়েকজন শিল্পীই শিবের মুখোশ তৈরির ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে। উল্লেখ্য, মহাদেবের যে রূপ আমরা দেখে থাকি শিবের মুখোশ তার থেকে একেবারে স্বতন্ত্র। মাথায় জটার জায়গায় সোনালি মুকুট। মুখমণ্ডল নতুন বরের মতো দীপ্তিময়। বর্তমানে যে কয়েকজন শিল্পী এই শিবের মুখোশ তৈরি করেন তারা প্রত্যেকেই নির্মাণ শৈলীতে নিজেদের স্বতন্ত্র শিল্পসত্ত্বা বজায় রেখেছেন।

ছোটো শিবের মুখোশের মুখের অভিব্যক্তি পটচিত্রের মতো। শিবের টানা চোখে নেশাতুর ছোঁয়া লেগে রয়েছে।

মুখে হাসি নেই। দৃষ্টিতে প্রজ্ঞতার পরিচয়। সমাহিত গাম্ভীর্য নির্মেদ মুখমণ্ডলে। মাথায় বর্শা ফলার মতো দেখতে এক চূড়া বিশিষ্ট সোনালি মুকুট। মুকুটের মধ্যে চারটি সাপ। মুকুটের শেষাংশ থেকে বেরিয়ে আসা চুল কপালে রেখাপাত করেছে। দুই ভুরু মাঝে গোলাকার লাল টিকা। গোঁফ ও চোয়ালে হাল্কা দাড়ি। কানে গোজা ধুতরো ফুল। এই শৈল্পিক শৈলীতেই প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে নবদ্বীপের বুকে শিবের মুখোশ তৈরি করে চলেছেন শিল্পী কমলা মোদক। বাবা বিনয়কুমার মোদকের কাছে মৃৎশিল্পের শিক্ষা পেয়েছিলেন। বিভিন্ন ধরনের ছাঁচের প্রতিমা গড়ে তোলার পাশাপাশি চৈত্র মাস এলেই তিনি শিবের মুখোশ তৈরি করেন। শিল্পীর কথায় আগের মতো শিবের মুখোশে তেমন চাহিদা নেই। পরবর্তী প্রজন্ম শিবের মুখোশ তৈরি শিখছে না। ফলে তিনিই তার পরিবারে এই শিল্পের শেষ উত্তরাধিকারী। শিল্পী বড়ো ও ছোটো শিবের মুখোশ তৈরি করে থাকেন। ছোটো শিবের মুখোশের মুখের অভিব্যক্তি পটচিত্রের মতো। শিবের টানা চোখে নেশাতুর ছোঁয়া লেগে রয়েছে।

নবদ্বীপের কপালি পাড়ার বর্ষীয়ান শিল্পী সন্ধ্যা পাল প্রায় চল্লিশ বছর ধরে শিবের মুখোশ তৈরি করে চলেছেন। তার স্বামী প্রয়াত শিল্পী অজিত পাল শিবের মুখোশ তৈরি করতেন। শিল্পীর কথায় একটা সময় ছিল যখন চৈত্র মাসে প্রায় একশোটা শিবের মুখোশ তৈরি হতো। এখন সেই সংখ্যাটা পাঁচ থেকে আটে এসে ঠেকেছে। তাও সব শিবের মুখোশ বিক্রি হয় না। সন্ধ্যা পালের তৈরি শিবের মুখোশে পটচিত্রের ছোঁয়া রয়েছে। মুখে হাল্কা মাধুর্য মাখা নম্র হাসি। সেই হাসিতে শিবের ব্যক্তিত্বের প্রজ্ঞতা বহন করে চলেছে। তার তৈরি শিবের মুখোশের কানে মাটির তৈরি ধুতরো ফুল গোঁজা রয়েছে। শিল্পী দুই হাত বিশিষ্ট ছাঁচের তৈরি পার্বতীও তৈরি করে থাকেন। তাঁর তৈরি পার্বতী এলোকেশী। মাথায় সোনালি মুকুট দেবত্বের পরিচয় বহন করে চলেছে। গলায় সোনালি রং দিয়ে অলঙ্করণ করা হয়েছে। পরনে শাড়ি। মুখে লাজুক হাসি। পার্বতীর প্রতিমাটি ছাঁচের তৈরি। 
নবদ্বীপের বুড়ো শিবতলার শিল্পী গোপাল দত্তের তৈরি শিবের মুখোশের মুকুটে কলকা খোদাই করা রয়েছে। চোখের দৃষ্টিতে প্রাণময়তা। ত্রিনয়নের নীচে লাল রঙের অর্ধবৃত্তাকার। কপালের মাঝে গোলাকৃতি লাল টিকার মাঝে হাল্কা লাল রেখা অঙ্কিত। শিল্পীর কথায়, নতুন প্রজন্মের বিনোদনের চাহিদা বদলে যাওয়ায় শিবের মুখোশের চাহিদা আগের মতো আর নেই।

নবদ্বীপের গোবিন্দ বাড়িতলার প্রয়াত শিল্পী নারায়ণ চন্দ্র পালের তৈরি শিবের মুখোশের খ্যাতি গোটা বাংলায় ছিল। বর্তমানে তার স্ত্রী মিনতি পাল সেই ধারাকে টিকিয়ে রেখেছেন। তাঁর তৈরি শিবের মুখোশের চোখ গোলাকার। মুকুটের চূড়াটি শূলের মতো। মুকুট ও কপালের মধ্যবর্তী অঞ্চলে লাল রেখা। মুখমণ্ডল লোকজশিল্পের প্রতিচ্ছবি বহন করে নিয়ে চলেছে। ওই একই অঞ্চলের আরও এক বর্ষীয়ান শিল্পী গোপাল পালের তৈরি শিবের মুখোশের শৈলীটি প্রায় একই। যদিও গলার নিচের দিকটা চওড়া ও মুখমণ্ডলে মিষ্টতা রয়েছে।

নবদ্বীপের দণ্ডপানিতলার শিল্পী গৌরাঙ্গ পাল। তাঁর তৈরি শিবের মুখোশে তেজময়তা বিরাজমান। কানে গোঁজা ধুতরো ফুলটা মাটি দিয়ে গড়া। কানের লতিতে ঝুলন্ত আকন্দ ফলটিও মাটির তৈরি। শিল্পীর কথায় নবদ্বীপে একটা সময় ছিল যখন প্রতিটি মৃৎশিল্পী শিবের মুখোশ তৈরি করত। শিবের বিয়েকে ঘিরে কিশোর কিশোরীরা চতুর্দোলা ও বাসর ঘরও তৈরি করত। সেই সময় শিল্পী নিজেই প্রায় ১০০টা শিবের মুখোশ বানাতেন। কিন্তু এখন সেই সংখ্যাটি এ বছর তিনে এসে ঠেকেছে।

বিশাল আকৃতি চোখে শান্ত অভিব্যক্তি। কানে গোঁজা রয়েছে বড়ো মাটির ধুতরো ফুল। ওই ফুলের মধ্যে থাকা রেণুও স্পষ্ট বোঝা যায়। এক চূড়া বিশিষ্ট সোনালি মুকুটে রয়েছে চারটি ফণা উদ্যত সাপ। এ ভাবেই বংশ পরম্পরা মেনে আজও শিবের মুখোশ বানিয়ে চলেন নবদ্বীপের নিমতলার দেবু পাল। পিতা কৃষ্ণচন্দ্র পালের কাছ থেকে শিবের মুখোশ তৈরি শৈলী শিখেছিলেন তিনি। শিল্পীর কথায় প্রায় ৬০ বছর ধরে শিবের মুখোশ বানিয়ে চলেছেন তিনি। এখানকার জাগ্রত শৈবতীর্থ যোগনাথের মুখোশের আদলেই তারা শিবের মুখোশ তৈরি করে থাকেন। তাঁর কথায়, আজ থেকে দশ বছর আগেও চাহিদা ভালো ছিল। আগে যেখানে একশোটা করে শিবের মুখোশ তৈরি হতো। এ বছর মাত্র তিনটি বানিয়েছেন। শিবের মুখোশ তৈরিতে শিল্পী এঁটেল মাটি ব্যবহার করে থাকেন। পুরোটাই ছাঁচের তৈরি। সাপগুলো আলাদা ছাঁচ দিয়ে করা হয়ে থাকে। পরে মূল মুখোশের সঙ্গে জোড়া লাগানো হয়। শিল্পীর কথায় ছাঁচ থেকে বের করে আনার পর মুখোশের মুকুটের দিকে কাঠি বসিয়ে রোদে শুকোতে দেওয়া হয়। মাটিটা একটু টান ধরলেই সাপগুলো সেই কাঠির মধ্যে যুক্ত করা হয়। শিবের কপালে ছোটো করে ছাই রাঙা টিকা রয়েছে। নাকের ডগায় হাল্কা করে ছাই রঙের কলকা আঁকা হয়েছে। মুখোশের ভেতরটা পুরোপুরি ফাঁপা। মাটির ভিত দিয়ে আলাদা করে মুখোশের তলদেশ বন্ধ করা নেই। রং করার শৈলী তার পারিবারিক ঐতিহ্য মেনেই করা হয়। বর্তমানে বাজার চলতি রং ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যদিও পরিবারের নতুন প্রজন্ম এই শিল্পশৈলী শিখতে চাইছে না।

নবদ্বীপের বুড়ো শিবতলার শিল্পী গোপাল দত্তের তৈরি শিবের মুখোশের মুকুটে কলকা খোদাই করা রয়েছে। চোখের দৃষ্টিতে প্রাণময়তা। ত্রিনয়নের নীচে লাল রঙের অর্ধবৃত্তাকার। কপালের মাঝে গোলাকৃতি লাল টিকার মাঝে হাল্কা লাল রেখা অঙ্কিত।

উল্লেখ্য, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে শিব-পার্বতীর বিয়ের ঐতিহ্য রয়েছে। বর্তমানে কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে রাজস্থান থেকে আসা জনগণের হাত ধরে ক্রমাগত গণগৌড় পুজো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এটি আদতে শিব-পার্বতীর বিয়ে। এর প্রতিমাগুলো কলকাতার কুমোরটুলির শিল্পীরা তৈরি করে থাকেন। কিন্তু, হতাশাজনক ভাবে বাংলার ঐতিহ্যশালী শিবের মুখোশ তৈরির ঐতিহ্য বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে চলেছে।

Developed by DXDasia