
‘জোরওয়ারসাক্কো’ থেকেও এসে থাকতে পারে এই নাম
কম-বেশি আড়াইশো বছর আগের কথা। জোড়াসাঁকোর নাম তখন মেছুয়াবাজার। অঞ্চলটি জুড়ে মৎসজীবীদের বাস। ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে কলকাতা নগর। উত্তরে শাঁখারিপাড়া আর দক্ষিণে শাঁখারিটোলার মধ্যবর্তী এই অঞ্চলটিই এরপর ক্রমে হয়ে উঠবে বঙ্গীয় রেনেসাঁর শিশুশয্যা। সে এক বিচিত্র ইতিহাস। তবে, জোড়াসাঁকো নামের রহস্যটিও তার চাইতে কম বিচিত্র নয়।
আরো পড়ুন
শোভাবাজার নামের আড়ালে কোন ‘শোভা’?
জোড়াসাঁকো নামটি এমনিতে সহজ। কিন্তু, তার ব্যুৎপত্তি খুঁজতে গিয়েই জটিলতা বেড়েছে। সে জটিলতার রহস্য ভেদ করতে গিয়ে রীতিমতো মাথার চুল ছিঁড়তে হয়েছে পণ্ডিতদের। নানা মুনি নানা মত দিয়েছেন। মত আর মতান্তরেই ডুবে আছে জোড়াসাঁকোর নামকরণের ইতিহাস।
এমনিতে, ‘জোড়া’ আর ‘সাঁকো’ শব্দদুটিকে আলাদা করে নিলেই একটা স্পষ্ট অর্থ পাওয়া যায়। কিন্তু, তারপরেই প্রশ্ন জড়ো হয়। সাঁকো ছিল কোথায়? এখানে তো নদী, নালা কিছুই তেমন নেই। তার ওপর সাঁকো একটা নয়, একজোড়া। সে তো আরো সমস্যা। বিখ্যাত সব কলকাতাবিদরা নামের রহস্য খুঁজে বেড়িয়েছেন ঠাকুরবাড়িকে বেড় দিয়ে। তাঁদের মতে, আগে ঠাকুরবাড়ি, তারপরে জোড়াসাঁকো নাম। কেউ কেউ হিসেব কষে বলেও দিয়েছেন ঠাকুরবাড়ির পাঁচ আর ছ’নাম্বার বাড়ির মাঝেই নাকি ছিল জোড়া সাঁকো। আর, এই সাঁকো ব্যবহৃত হত একবাড়ি থেকে অন্য বাড়ি যাওয়ার জন্য।
এমনিতে বাড়ির মধ্যে সাঁকোর দেখা কলকাতায় অনেক জায়গাতেই মেলে। নেবুতলার কাছে ঝুলনবাড়িতে আছে, আছে কলকাতা পৌরসভায়, প্রেসিডেন্সিতে এবং অন্যত্রও। কিন্তু, এহেন সাঁকো সত্যিই ঠাকুরবাড়িতে ছিল কিনা, থাকলেও তা থেকেই জোড়াসাঁকো নামটি এসেছে কিনা—তা নিয়ে সন্দেহ করার পর্যাপ্ত কারণ রয়েছে।
জোড়াসাঁকো থানা হিসেবে কলকাতার প্রাচীনতম থানাগুলির একটি। ১৭৮৫ সালে কলকাতাকে যে ৩১টি থানায় ভাগ করা হয়েছিল, তার একটি জোড়াসাঁকো। আর, এর ঠিক আগের বছরেই পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে জোড়াসাঁকোয় চলে আসেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের ঠাকুরদা নীলমণি ঠাকুর। তারপর, গড়ে তোলেন ইমারত। জমিটি তিনি দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে পেয়েছিলেন কলকাতার অপর এক ধনী বৈষ্ণবচরণ শেঠের থেকে। তারপর, এই বাড়িই হয়ে উঠল কলকাতার বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের ভদ্রাসন। যে পরিবারই জন্ম দেবে রবীন্দ্রনাথের। শুধু নবজাগরণের জন্য না, তার চাইতে আরো অনেক বেশি কিছুর জন্য বাংলা ঋণী এই পরিবারের কাছে।
কিন্তু, আগে ঠাকুরবাড়ির জন্ম, তারপর জোড়াসাঁকো নামকরণের তত্ত্ব ইতিহাসের ঐকিক নিয়মে ঠিক যেন মেলে না। ফলে, অন্যান্য সম্ভাবনাগুলোও উঁকি দিতে থাকে…
কেউ কেউ যেমন মনে করেন, জোড়াসাঁকোর ‘সাঁকো’ আসলে ‘শাঁখ’ থেকে এসেছে। জোড়াসাঁকোর উত্তরে বেনিয়াটোলার শাখারিপাড়া, দক্ষিণে বউবাজারের শাঁখারিটোলা। একসময়, শ্রীলঙ্কা, মাদ্রাজ থেকে সামুদ্রিক শঙ্খবোঝাই জাহাজ এসে ভিড়ত উত্তর কলকাতার ঘাটগুলিতে। সেইসব শঙ্খ ডাঁই হয়ে থাকত বাগবাজার ঘাট থেকে চিৎপুর পর্যন্ত এলাকা জুড়ে। সেইসব শঙ্খের অনেকগুলোই তখনো জীবিত। তাদের গরমজলে ডুবিয়ে প্রথমে ‘জড়শঙ্খে’ পরিণত করা হত। তারপর, তৈরি হত ধবধবে সাদা শাঁখ কিংবা হাতে পরার শাঁখা। জোড়াসাঁকো কথাটি ‘জড়শঙ্খ’ বা ‘জোড়াশাঁখা’—যে কোনো একটি থেকেই আসতে পারে। অঞ্চলটির ইতিহাস অন্তত এই সম্ভাবনাকে উড়য়ে দেয় না।
বিশিষ্ট কলকাতা বিশেষজ্ঞ পি টি নায়ার আবার বলছেন, জোড়াসাঁকো নামটি জোড়শঙ্কর থেকে এসেছে। অথচ, এ চত্বরে তেমন কোনো প্রাচীন জোড়াশিবের মন্দির বা বিগ্রহের হদিশ মিলেছে বলেছে তো জানা নেই।
জোড়াসাঁকো নামকরণের রহস্যভেদ করতে গিয়ে একদমই নতুন একটি পথ দেখিয়েছেন অসিত দাস। তাঁর মতে, জোড়াসাঁকো নামটির মূলে রয়েছে উত্তর কলকাতার হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে আরবি-ফার্সি জানা মানুষজন। আঠেরো শতকেও কলকাতা-সহ বঙ্গদেশের রাজভাষা ফার্সি। ফার্সি জানা হিন্দু বাঙালির সংখ্যাও তাই কম নয়। রাজা রামমোহন তো উনিশ শতকেও ফার্সি ভাষায় বই লিখেছেন। তৎকালীন কলকাতার মুনসিরা তো বটেই, অনেক শিক্ষিত হিন্দুই ফার্সি জানতেন। শিক্ষিত মুসলমানরা তো জানতেনই। এই ফার্সিতেই জন্নতে যাওয়ার রাস্তাকে বলা হয় ‘জোরওয়ারসাক্কো’। অনেকটা হিন্দুদের ‘স্বর্গদ্বার’ বা ‘বৈতরণি পার হওয়ার’ মতো ব্যবহার এই ‘জোরওয়ারসাক্কো’-র। নীমলমণি ঠাকুর যখন বৈষ্ণবচরণ শেঠদের কাছ থেকে পাওয়া এই জমিতে ঠাকুরবাড়ি পত্তন করছেন, তখন তার আশপাশের অঞ্চলে ছিল বহু মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের বাস। তাঁরাই এই অঞ্চলটির নাম দিয়েছিল ‘জোরওয়ারসাক্কো’। কালক্রমে লোকমুখে তাই জোড়াসাঁকো হয়ে দাঁড়ায়।
মনে হতেই পারে, কষ্টকল্পনা। কিন্তু, এক্কেবারে ফেলনা নয় এই যুক্তিও। ভাষার ইতিহাসে এমন কত ইতিহাসই যে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে, মিশে থাকে কত অন্তর্ঘাত। সাঁকো, শঙ্কর, শাঁখা কিংবা জোরওয়ারসাক্কোর ধাঁধাঁ তাই পিছু ছাড়ে না এই নামের।
কলকাতাবাসীর অবশ্য নামের ধাঁধাঁ নিয়ে মাথাব্যথা নেই বিশেষ। জোড়াসাঁকো আমাদের কাছে ঠাকুরবাড়ি। রবীন্দ্রনাথের অবিসংবাদী উজ্জ্বলতা অবশ্য আবছা করে দিয়েছে এই অঞ্চলের আরো কয়েকজন বিশিষ্ট আবাসিকের নাম। কালীপ্রসন্ন সিংহের পরিবার, কৃষ্ণদাস পালের পরিবারের বাস ছিল এখানেই। ছিল দেওয়ান বানারসি ঘোষ ও চন্দ্রমোহন চট্টোপাধ্যায়ের পরিবারের ভদ্রাসনও। এছাড়াও আদি ব্রাহ্মসমাজ, জোড়াসাঁকো ভারতী নাট্যসমাজ, কলিকাতা হরিভক্তিপ্রদায়িনী সভা, মিনার্ভা লাইব্রেরি, ওরিয়েন্টাল সেমিনারির মতো ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানগুলির জন্মও জোড়াসাঁকোতেই। বাংলার নবজাগরণের ইতিহাসে, শহর কলকাতার গড়ে ওঠার ইতিহাসে-গল্পে এঁদের ভূমিকাও কিন্তু কম নয়।
তথ্যসূত্র: P.T. Nair, The growth and Development of Old Calcutta in Calcutta, the Living City, সুকুমার সেন, বাংলা স্থাননাম, অসিত দাস, নেমপ্লেট, রোববার, প্রতিদিন, ১৪ মে, ২০১৭।
ছবিসূত্র: https://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/7/77/Southern_Entrance_-
_Jorasanko_Thakur_Bari_
-_Madan_Chatterjee_Lane_-_Kolkata_2015-08-04_1775.JPG
