গানওয়ালাদের ঠেক-এ সঙ্গীত আর যন্ত্রের মিলন

ব্যাঞ্জো, পারকাশন, ম্যান্ডোলিনের অদ্ভুত সমাহার। গানওয়ালাদের ঠেক থেকে সরাসরি…

কবীর সুমন একবার বলেছিলেন তিনি গানকে নয়, সঙ্গীতকেই গুরুত্ব দেন।

এমনই এক সঙ্গীত যা পৌঁছে যাবে জনমানস ছাড়িয়ে বিপুলা পাহাড় কিংবা নদীর কিনারায়। প্রত্যন্ত গ্রামের দেওয়ালে ঘুঁটে পড়বে রোজ, পাড়ার দইওয়ালা গান গেয়ে দই খাইয়ে যাবেন, প্রেমিক-প্রেমিকাযুগল ঠাঁই বসে থাকবেন শান্ত সমুদ্রটির তীরে। ঢেউ এসে জানান দেবে সুর সেখানেও। শুধু তাকে অনুভব করার রাস্তাটা স্বচ্ছ রাখতে হবে। আমাদের প্রতিদিনের জীবনচর্যায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে গান, তার সুর। গানের কথা আমাদের দুশো বছর আগের রাস্তায় যে-কোনো সময় ফেলে দিতে পারে। ঠিক এমনই একটি সঙ্গীত সন্ধ্যার সাক্ষী থাকল তিলোত্তমা কলকাতা, থুড়ি গোটা বিশ্ব। গোটা বিশ্বের কাছে বাংলা গানকে পৌঁছে দিতে ‘গানওয়ালা’ আবার ফিরে এসেছে। ঠিক যেন সুরের কাছে মূর্চ্ছনা ধরা দিচ্ছে বারবার। পাগল পথিক গান ধরবেন, মাটির গান। ব্যাঞ্জোর ধ্বনি আছড়ে পড়বে বাংলাদেশে।

গত ২২ সেপ্টেম্বর কলকাতার মায়া আর্ট স্পেসে গানওয়ালার পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয়েছিল সঙ্গীত আর যন্ত্রের মিলনের অনবদ্য একটি সন্ধে। মূলত মাটির গান, বলা ভালো লোকায়ত ভাবনায় মিলেমিশে গিয়েছিল মাত্র একটি ঘন্টা। যাঁদের ছাড়া এই আসর পুরোপুরি অসম্পূর্ণ ছিল, অর্থাৎ অমিত গুহ, অলোক গুহ, শুভম কাঞ্জিলাল এবং জয় ভট্টাচার্য; গভীর থেকে কথা বলল তাঁদের সুর, বাদ্য, কণ্ঠ। কথোপকথন যে সুর দিয়েও সম্ভব এদিন এই গানওয়ালাদের ঠেকে না গেলে বোঝাই যেত না।

অমিত গুহর গায়কী জীবন অনেক দশক পার করল। এখনও তাঁর গলা দৃপ্ত। মাটির গানের মধ্যেই সেই কণ্ঠে খুঁজে পাওয়া যাবে মার্গ সঙ্গীতের অনায়াস যাতায়াত। তাঁর ভাই অলোক গুহ পৌঁছে যান মাটির একেবারে খুব কাছে। শিকড়কে তিনি লালন করেন। অলোক গুহ একেবারেই নগর বাউল নন, তা তাঁর গান শুনলেই বোঝা যাবে। আবার অমিত গুহর সুরের আঁকিবুঁকিতে দাগ কাটে ছেলেবেলা। মফস্বলের ঘুড়ি ওড়া জীবন কিংবা গ্রামের রিক্সা প্যাডেলের অনবরত ঘুরপাক খাওয়া, ওঁর গলায় আশ্রয় নিয়েছে। শাহ আবদুল করিমের গান তাঁরা ধারণ করেছেন। একের পর এক করিমি গান দিয়েই শ্রোতাদের বধ করেছেন। অন্যদিকে শুভম কাঞ্জিলাল একজন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ম্যান্ডোলিন বাজিয়ে। এছাড়াও গ্লোবাল কালচারাল অলিম্পিয়াডে ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করে প্রথম হওয়া একজন শিল্পী। তাঁর ম্যান্ডোলিনের সুর নিয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের প্রয়োজন হবে না। কারণ এখানে লেখক হার মানতে বাধ্য। কানে শোনা আর হাতে লেখা কোনো কোনো ক্ষেত্রে একে অপরের পরিপূরক না-ও হয়ে উঠতে পারে। তাই অনুষ্ঠান শেষে শুভমের ম্যান্ডোলিন শোনার পর নতুন করে কিছু বলার থাকে না। একরাশ মুগ্ধতা আর বিস্ময় নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। তাকে লালন করতে হয়, যত্ন দিতে হয়। কখনও সবিতা চৌধুরীর গাওয়া “সুরেরও এই ঝর ঝর ঝর ঝরনা…” গানের সুর হাওয়ায় ভেসে যায় ম্যান্ডোলিনের উড়োতারে। কখনও টাইটানিক ছবির বিখ্যাত একটি গানের সুর তাঁর হাতে নতুন রূপে ধরা দেয়। একটি ক্লাসিকাল রাগের মাধ্যমে পারকাশন এবং ম্যান্ডোলিনের যুগলবন্দী এদিনের সন্ধের আসরকে অন্য মাত্রা দেয়। পারকাশনে ছিলেন জয় ভট্টাচার্য, যিনি তাল-তন্ত্র নামক একটি বিখ্যাত জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত। এই জয়বাবু ছিলেন গানওয়ালাদের ঠেকের চতুর্থজন।

এদিন সন্ধের পুরো অনুষ্ঠানটি ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে ছড়িয়ে হয় গোটা বিশ্বে৷ দেশ পার করে পাহাড়ের নির্জনতায় কিংবা সমুদ্রের অনাবিল ঢেউয়ে ব্যাঞ্জো, পারকাশন, ম্যান্ডোলিনের ইকো হয়, ধাক্কা খায়। সরাসরি সম্প্রচার দেখা যায় গানওয়ালা, বঙ্গদর্শন এবং গেট বেঙ্গল-এর তিনটি স্বতন্ত্র ফেসবুক পেজ থেকে। গানওয়ালাদের ঠেক-এর হাঁটাপথ সবে শুরু। আগামীদিনে এমন অনেক ঠেকের সাক্ষী থাকবেন বাংলা গানের শ্রোতা।

গানওয়ালা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল অবধি কলকাতা দুরদর্শনের জন্য বাংলার একমাত্র সঙ্গীত বিষয়ক অনুষ্ঠান সম্প্রচার করার দায়িত্ব নিয়েছিল। গানওয়ালার জার্নি শুরু সেই থেকেই। গানওয়ালার ভাবনা বাংলা গানের দশ দিগন্ত সারা বিশ্বের বাঙালিদের সামনে তুলে ধরা। গত ২৫ বছর ধরে এঁরা একটি মিউজিক কোম্পানির সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন। বাংলা গান কেন্দ্রিক এই প্রয়াসকে পাশে রেখে, চলুন একসঙ্গে পাশাপাশি হাঁটা যাক।  

ছবি – প্রদ্যুৎ চৌধুরী 

Developed by DXDasia