
দর্শকদের রুচি পাল্টাচ্ছে
‘পথের পাঁচালি’-র বেশ খানিকটা শ্যুটিং হওয়ার পর যখন পরিচালক সত্যজিৎ মরিয়া হয়ে নানাভাবে প্রযোজক খুঁজে বেড়ানোর চেষ্টা করছেন, সেই সময় এক অবাঙালি প্রযোজকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সিনেমার স্টোরিলাইন শুনে তিনি পরিচালককে দু’চারটে পরিবর্তনের প্রস্তাব দেন। তার একটি ছিল, ছবিতে অন্তত বারদু’য়েক সর্বজয়াকে পুকুরে স্নান করার দৃশ্যে দেখাতে হবে এবং ভিজে কাপড়ে তাঁর জল থেকে উঠে আসার ক্লোজ শট নিতে হবে । সকলেই অনুমান করতে পারেন, এই ধরনের দৃশ্যভাবনার পেছনে ঠিক কোন মানসিকতা কাজ করেছিল। না বললেও চলে, পরিচালক সত্যজিতের পক্ষে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না।
আরও পড়ুন
পিছু হটছেন রবীন্দ্রনাথ, পুজো পাচ্ছেন গডসে– দেশপ্রেমের নামে এই রাজনীতি অভ্যন্তরীণ ঐক্য-বিরোধী
কথাটা উঠল এই কারণে যে প্রযোজকরা একটা সময় পর্যন্ত পরিচালকদের নিজেদের অধীন ও তাঁদের প্রসাদভোগী ভাবেন এবং নিজেদের মোটা বুদ্ধি দিয়ে যা বিবেচনা করেন, তাই চাপিয়ে দিতে চান পরিচালকদের মাথায়। তাঁদের একটা সহজ সমীকরণ হল, ওইসব ভাবনাচিন্তা পরিকল্পনা দৃশ্যভাবনা গ্রহণ করলেই নাকি ছবি বাজারে চলবে ও ভালো ব্যবসা করবে। এই সরল সমীকরণ সব ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। হয়তো কিছু ক্ষেত্রে তা খেটে যায়, পরিচালক কিছুটা আত্মসমর্পণ করেন – কারণ তাঁরও একটা টিকে থাকার সংকট থাকে।
কিন্তু পাশাপাশি এটাও ভুলে যাওয়ার অবকাশ নেই যে পরিচালকের কয়েকটি ছবি মোটামুটিভাবে বাজারে সফল হলে ও বিনিয়োগের বড়ো অংশ প্রযোজকের পকেটে ফেরত দিতে পারলে সেই পরিচালকের একটা নিজস্ব ওজন তৈরি হয়। যে অবস্থান থেকে প্রযোজকের সমস্ত নির্দেশ , বায়না ও বাসনা তিনি না রাখার জায়গায় পৌঁছে যান। বিষয় নির্বাচন, গল্প, ফিল্ম তোলার খুঁটিনাটি সবকিছুতেই তাঁর, যাকে বলে একটা কম্যান্ড থাকে – হঠাৎ করে প্রযোজকের কোনও অবিবেচনার আবদারের সামনে তাঁকে মাথা নিচু করতে হয় না। প্রযোজকও যখন বুঝে যান, এই পরিচালকের হাতে তাঁর বিনিয়োগ নিরাপদ, তিনিও নিজেকে এইসব বেয়াড়ামি থেকে সরিয়ে রাখাই শ্রেয় বলে মনে করে থাকেন।
এত কথা বলার আসলে উপলক্ষ্য একটাই। সদ্য শেষ হওয়া পুজো বা উৎসবের মরশুমে চারটি বাংলা ছবি রিলিজ হতে দেখলাম আমরা, যার তিনটি খ্যাত পরিচালকের – যথাক্রমে কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, অরিন্দম শীল ও সৃজিত মুখোপাধ্যায় এবং একটি তুলনায় নতুন পরিচালক সায়ন্তন ঘোষালের। আশ্চর্যজনকভাবে চারটি ছবিই হয় রহস্য গল্প নয় থ্রিলার, মানে প্রায় একই ধরনের। মিতিনমাসি ও ব্যোমকেশ দুটি দুই প্রজন্মের চরিত্র হলেও তাঁদের কাজ মোটামুটি একই, অর্থাৎ কোনো রহস্যভেদ। ‘পাসওয়ার্ড’ ছবিটিও রহস্যের পথ বেয়ে এগিয়ে চলেছে। আর সৃজিতের ‘গুমনামি’ যতই গবেষণাধর্মী-টর্মী বলা হোক না কেন, আদতে তা একটি থ্রিলারের ফরম্যাটে তৈরি । মুক্তি পাওয়ার আগেই এই ছবি নিয়ে কিছু বিতর্কের সূত্রপাত ঘটেছিল। কিন্তু চারজন পরিচালক একই সময়ে প্রায় একই ধরনের বিষয়ে ছবি তৈরি করলেন – এর মধ্যে কেমন একটা অস্বাভাবিকতা আছে বলে মনে হয় না ?
উৎসবের এই পক্ষকালে ফিল্মদর্শক মধ্যবিত্তের হাতে বাড়তি অর্থ থাকে। পোশাক-আশাক, খাওয়া-দাওয়া-ঘোরার বাইরে ফিল্ম দেখার জন্য তার কিছুটা তাঁরা ব্যয় করতে রাজি থাকেন। সম্ভাব্য ক্রেতার একটা হদিশ পাওয়া একটা বাস্তবতা মাথায় রেখেই তাই ফিল্মের পরিবেশকরা ছবি রিলিজ করা ও পরিচালকরা তার সময় মেনে ছবি বানানোর পরিকল্পনা করেন। রহস্য ছবি বা থ্রিলার মানেই তা কিছু খারাপ ব্যাপার, এমন কোনো বাতুল ধারনায় আমরা কেউই বিশ্বাস করি না। কিন্তু একসঙ্গে চারটে একই ধাঁচের ছবি – এরমধ্যে কোথাও যেন একটু আত্মবিশ্বাসের অভাব আছে বলে মনে হয়। দুটো প্রশ্ন উঠে আসে এর ভিতর থেকে। প্রথমত, বাঙালি দর্শক কি পয়সা খরচ করে এই দুইয়ের বাইরে ভিন্নরকম ছবি দেখতে আগ্রহী নয়? এটা জানা গেল কী করে? আর দু’নম্বর কথা হল, পরিচালকদের কি তাহলে নিজেদের ওপর আস্থা কম যে তাঁরা নিজেরা ঠিকঠাক করে এইসবের বাইরে একটা অন্যরকম পরিচ্ছন্ন ছবি বানাতে পারবেন না ?
গত দশ-বারো বছরের একটা গড় পরিসংখ্যান নিলে দেখা যায়, উৎসবের মরসুমে ও শীতের ছুটির সময় বহু বাংলা ছবি মুক্তি পেয়েছে আর তাদের মধ্যে অনেকগুলিই দর্শকদের আশীর্বাদ ও প্রশংসা পেয়েছে, ছবির বিনিয়োগ সঠিকভাবে ফিরে এসেছে। ধরা যাক, ‘প্রাক্তন’ ছবিটির বিষয়টার মধ্যে কিছু আহামরি নতুনত্ব ছিল না, কিন্তু ছবি তৈরির গুণে, সেইসঙ্গে অভিনয়নৈপুণ্যে ও গানে ছবি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে । আর যাই হোক সেই ছবিকে খারাপ ছবি বলার কোনো সুযোগ নেই। একইভাবে দর্শকধন্য হয়েছে ‘বেলাশেষে’ , ‘শঙ্খচিল’, ‘পোস্ত’ , ‘উমা’, ‘বিসর্জন’ ইত্যাদি ছবিগুলো। এদের মধ্যে কিছু কিছু ছবির বিষয় আনকোরা, কিছু বা গতানুগতিক – কিন্তু যারা এইসব ছবি বানাতে এসেছেন, তাঁরা নিজেদের মতন একটা কিছু বানাতে পেরেছেন যা দর্শকের আনুকূল্য পেয়েছে। শান্তিনিকেতনে যেখানে ‘বেলাশেষে’ ছবির দৃশ্যগ্রহণ হয়েছিল, গতবছর সেখানে গিয়ে শুনেছিলাম ওই বাড়িটি নাকি এখন পর্যটকদের জন্য ভাড়া দেওয়া হয় – একটা ছবির এমনই মহিমা ।
এখন কথাটা হল, ওইসব ছবিগুলি যারা বানিয়েছেন, অনুমান করা যায়, সেইসব পরিচালকরা তাঁদের স্বাধীন বিষয়ভাবনা নিয়েই এগোতে পেরেছেন, প্রযোজকের কোনও বেয়াড়া আবদারের কাছে তাঁদের নতজানু হতে হয়নি। বিপরীতপক্ষে ওইসব ছবিগুলির বাণিজ্যিক সাফল্য প্রযোজকদেরও একরকম স্বস্তিতে রেখেছে যা তাঁদের কানে কানে এই বার্তা দিয়ে গেছে যে পরিচালকের স্বাধীন কল্পনা ও বিবেচনার ওপর ছাড়লে ছবির লাভ বই ক্ষতি নেই।
আর তাই ঘুরে ফিরে প্রশ্নটা সেখানেই আবার ফিরে আসে, পুজোর আনন্দ উদযাপনের মুহূর্তে যেসব নামি পরিচালক শুধু একধরনেরই ছবি বানালেন সম্ভবত তাঁদের ঘাড়ে প্রযোজক এমন কোনো উটকো নির্দেশ বা ফতোয়া চাপিয়ে দিতে যাননি – আসলে সিদ্ধান্তগুলো তাঁদের নিজেদেরই। কিন্তু মিলেমিশে একটু অন্যরকম ভালো ছবিও তো বানানো যেত! মানছি, দর্শকদের রুচি পাল্টাচ্ছে – কিন্তু বাংলার বাজারে সব রকম দর্শকই কিন্তু আছেন। সবাই হুমড়ি খেয়ে থ্রিলার দেখতে ছুটছেন এমন নয়। একটু অন্যরকমের ছবি করলে তাঁরা সেটা প্রত্যাখ্যান করতেন এমন মনে করার কোনও কারণ নেই। এখনও অবধি যা খবর, তাতে চারটে ছবির কোনোটাই নিছক খারাপ ব্যবসা করেনি, কিন্তু তার মানে এই নয় যে অন্য রুচির ছবি করলে তা মুখ থুবড়ে পড়ত। আফসোশ এই যে, পরিচালকরা স্বাধীন ভাবনার সুযোগ পেলেও দর্শকদের রুচিবোধের ওপর ভরসা রাখতে পারলেন না !
