
মহীনের তেজি ঘোড়াগুলি – পর্ব ৬
গত পর্বে
এবার আবার ফিরে আসি তিন বছর পর মণিদার ফিরে আসায়, সাল ১৯৭৫। পাঁচুদার ঠেক। অনেক কথা, গল্প, জব্বলপুর, ভূপাল — সকাল গড়িয়ে দুপুর। কদিন পরেই পয়লা বৈশাখ। সকলে মিলে ঠিক করা হল সেদিন একটা বড়ো ঠেক বসানো হবে। সন্ধে থেকে শেষ রাত। যে যখন খুশি চলে যেতে পারে। যারা নিয়মিত ঠেকে আসে না, তাদেরকেও বাধ্য করা হবে ঠেকে আসার জন্য। যেমন তপন চৌধুরী, রেখা, দীপ্তি আরও কেউ কেউ৷ ভেন্যু ঠিক হল অসীমদার (ঘনাদা নামেই বেশি পরিচিত) তিনতলার ছাদে, খোলা আকাশের নিচে। এই ধরনের আড্ডায় (প্রধানত বা একমাত্র মণিদার উৎসাহে) আমরা সাধারণত গান গাইতাম বা কেউ কবিতা পড়ত। সেদিন মণিদা বলল, সবাইকে কিছু না কিছু করতেই হবে।
কেউ নাচল, কেউ আবৃত্তি করল, কেউ গল্প বলল, অনেকেই গান গাইল, শেষ তিনজন বাকি — মণিদা, আমি, ভানু। মণিদা আমাদের গাইতে বলল। আমরা গাইলাম, (আগেই লিখেছি আমার একটা গানের কথা) ‘অনেক ভাবব আমি সারাদিন সারাবেলা’। আমার বার্মিজ গিটার বাজিয়ে ভানু অসাধারণ হারমণি করল। মণিদা যখন শুনল গানটা আমার লেখা আর সুর, প্রায় মুগ্ধ হল। আরও মুগ্ধ হল ভানুর হারমনি শুনে। বলল, “এসব তোরা শিখলি কোথায়? এতদিন তো এটাই চাইছিলাম। চল, আমরা একটা গানের দল তৈরি করি।” সেদিন এ বিষয়ে হালকা কিছু কথা হল৷ পরের দিনই এটা নিয়ে একটা সিরিয়াস মিটিং হল। মিনিটস বুক ছিল না, কিন্তু মুখে মুখে যা বলা হল, শোনা হল এবং মেনে নেওয়া হল, সেটা এই রকম— “আমরা নিজেরা গান লিখব, সুর করব, যন্ত্র বাজাব, যন্ত্রানুষঙ্গ পরিচালনা করব এবং আমরা নিজেরাই গান গাইব। আমরা কোনও প্রেমের গান লিখব না বা গাইব না।” তখনও দলের নাম ঠিক করা হয়নি। টানা এক বছর আমরা রিহার্স করলাম নিজেদের গান তৈরি হল, কিন্তু সাধারণ শ্রোতাদের শোনাবার জন্য মনটা ছটফট করতে লাগল। মণিদা বলল, আরও সময় লাগবে। এখনও সময় হয়নি। কাটল এক বছর, দেড় বছর, দুই বছরের মাথায় দলে একটা অস্থিরতা তৈরি হল। কারো পড়াশোনার চাপ, কারো পারিবারিক চাপ বা কারো অর্থাভাবের; চাপই চাপ।
এমনই একটা অনিশ্চিত সময়ে মণিদা আমাকে আর ভানুকে বলল, “চল আজ একজনের বাড়ি যাব।” রবিবার সকালবেলা- সঙ্গে একটা জাম্বো গিটার। হাঁটতে হাঁটতে মণিদা বলল, “আমরা যাঁর বাড়ি যাচ্ছি, তিনি হলেন মোহিনী চৌধুরী। সম্পর্কে মণিদার মেসো। উনি আইপিটিএ-র সদস্য, গীতিকার। আইপিটিএ (Indian People's Theatre Association)-র বিষয়টা ভানু আর আমি আগে থেকেই জানতাম। ওঁর বিখ্যাত অনেক গানের দুটো গান মনে করিয়ে দিই — ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হল বলিদান, লেখা আছে অশ্রুজলে…’। আরেকটি গান হচ্ছে, ‘পৃথিবী আমারে চায়, রেখো না বেঁধে আমায়, খুলে দাও প্রিয় খুলে দাও বাহুডোর…’। এমন একজন ব্যক্তিত্বের কাছে যাচ্ছি ভেবেই উত্তেজিত হচ্ছিলাম।
পৌঁছালাম আমাদের বেহালাতেই ইউনিক পার্কে (সে বাড়ি আজও আছে)। আলাপ হল। চা শেষ করার পর উনি বললেন, “শোনা, তোরা কী গান করিস।” আমরা শোনালাম— একটা, দুটো, তিনটে…। আচমকা উনি বলে উঠলেন, “কী সব করেছিস? তোরা তো বাংলার বিটলস। বেহালাটাকে তো লিভারপুল করে ছাড়বি।” মোহিনী মেসোর বক্তব্য ছিল, “এইসব ছোটোখাটো অনুষ্ঠান করে কতজনকেই বা তোদের গান শোনাবি! এত নতুন ধরনের গান, এসব তো হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছানো দরকার। ঠিক আছে, আমার এক বন্ধুর রেকর্ড কোম্পানি আছে” (সমর গুপ্ত, ভারতী রেকর্ড কোং, অনেক জায়গায় পড়েছি, গাঁথানি রেকর্ডস। সেটা একেবারেই অসত্য তথ্য।)
উনি বললেন, “সমর এইচএমভি স্টুডিও থেকে রেকর্ডিং করে আর কোম্পানির লেবেলটা বসিয়ে দেয় ভারতী। তবে খরচ খরচার ব্যাপারে ওর সঙ্গে কথা বলতে হবে। আমি কথা বলে নেব। তবে বাজার দর বা তার থেকে অনেক কম যতাকায় তোদের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।”
আমরা দেখা করলাম সমরদার সঙ্গে খান্না সিনেমা হলের পেছনে ওঁর অফিস কাম বাড়িতে। রফা হল ৩০০ কপি ইপি ৭,০০০ টাকা। এছাড়া কভার ডিজাইন, কভার ছাপা, আনুষাঙ্গিক খরচ আমাদের। আমরা অসম্ভব মনে করে মুখ চুন করে বেরিয়ে এলাম।
(চলবে…)

