শিবঠাকুরের আপন দেশেঃ মোহন্ত-এলোকেশীর কেচ্ছা এবং দেড়শো বছরের বাংলা আবেগ

অবিভক্ত বাংলা, সেই ১৭২৯ সালের কথা…

তখন একটাই বাংলা ছিল। নামেও ‘বাংলা’। ধামেও। ঈশ্বরনির্দিষ্ট ধাম। মানুষ প্রতিষ্ঠিত মন্দির। তারকেশ্বর। বাংলার জাগ্রত শিবনিবাস। স্বয়ম্ভু লিঙ্গ। আদি নেই, অন্ত নেই। তবু মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই। ধরাধামে যখন এসেছেন। কোনোরকমে একটা বাঁশের আটচালা জুটলো। গরীব ভক্ত। ভিখারি ইষ্টদেব। জল-বেলপাতাটাও অনিয়মিত। তবুও তিনি অধিষ্ঠান করলেন। জনগণ টেরও পেল। জনশ্রুতি বইতে লাগলো। গোটা বাংলায়। অবিভক্ত বাংলায়। সেই ১৭২৯ সালের কথা। বর্ধমানরাজের সাম্রাজ্যের মান বাড়ল। আয় বাড়ল। আর ভক্ত বাড়ল তারকেশ্বরে। কিন্তু ব্রাহ্মণ কই? সৎ ব্রাহ্মণ? নিষ্ঠাবান? বেদজ্ঞ? সরল মুখের সহজ সমস্যা আপনভোলা ঈশ্বরের কাছে পৌঁছাবে কে? ভাঙা গলার অভিযোগে পয়ার দেবে কে? সুবে বাংলার ব্রাহ্মণকূল বহুকাল উড়িষ্যানিবাসী। গিরি উপাধিধারী। মোহন্ত। এঁরাই তবে যোগ্যতম। রাজার পত্র গেল। চাকরির প্রস্তাব। মোটা মাইনে। সঙ্গে প্রভূত ভূসম্পত্তি। না বলা যায় না। পদ পেলেন মোহন্তরা। প্রধান পুরোহিত। এবং সর্বেসর্বা। এদিকে রাজা জগত রায় আর কীর্তি রায় আরও জমি দিয়েছেন মোহন্তদের। মন্দির আরও প্রশস্ত হোক। আটচালা পাকা হোক। ঈশ্বরের ব্যবহারের জন্য পুকুর-ঘাট হোক। মান রাখতে সংস্কার। ক্ষমতা রাখতে বংশবৃদ্ধি। রাজারও। পুরোহিতেরও। এই বাংলাতেই। ব্যাস! গণ্ডগোলের সূচনা। মোহন্তের পর মোহন্ত বিগড়ে যায়। রাজার পর রাজা নীরবে মাথা নোয়ায়। তারপর একদিন খবর ছেপে বের হল।

তারকেশ্বরের পাশেই কুমরুল গ্রাম। ছোটো। সাধারণ। দরিদ্র। নিঃসম্বল নীলকমল মুখোপাধ্যায়ের বাস। সামান্য যজমানী। অশক্ত অবয়ব। অভাবী সংসার। প্রথমা পত্নী গত। একটি কন্যা রেখে গেছেন। বামুনের বোঝা। এলোকেশী। দ্বিতীয়া স্ত্রী মন্দাকিনী। কন্যা মুক্তকেশী। পুতুলের বিয়ে দেয়। এলোকেশীরও বিয়ের কথা ওঠে। নয় নয় করে আট পেরিয়েছে। বিমাতার অবহেলাতে অপরূপা হয়েছে সেই কুঁচবরণ কন্যা। পাত্র জুটল। অনাথ। কিন্তু বয়সে নবীন। নামেও। যা থাকে কপালে। চেয়েচিন্তে মেয়ে পার করলেন ব্রাহ্মণ। এদিকে জামাই কলকাতায় কম্পোজিটর। সরকারি ছাপাখানায়। দিন কাটে বাইরে। রাত কাটে এককামরায়। আপাতত। অগত্যা এলোকেশী বাপের ভিটেতেই রইল। বোঝা হয়ে। তবে সপ্তাহান্তে নবীন আসে। ছুটিছাটাতেও নবীন আসে। এলোকেশীর স্বামী সন্দর্শন ঘটে। এলোকেশীর শাড়ি-চুড়ি জোটে। মন্দাকিনীর ঘরকামাই জোটে। তবুও এলোকেশীর মাতৃসুখ হয় না। বাবা তারকনাথের কৃপার অপেক্ষা করে সবাই। মাধবগিরির কাছে পুজো পৌঁছয়। দক্ষিণা পৌঁছয়। তারকনাথের প্রধান মোহন্ত। সর্বজনবিদিত নারীলোলুপ। মন্দাকিনী আগেই বাঁধা পড়েছে। বাড়তি উপরির প্রয়োজন পড়েছে। চাল-ডাল-ফলের চাহিদা মিটেছে। মোহন্তর শরীরী চাহিদা মিটেছে। 


এলোকেশী এখন নবযৌবনা। সারাদিনের কাজের পরে বড়োপুকুরটিতে স্নান করে বাড়ি ফিরছে। গোধূলির আলো আছে। হঠাৎ ঘোড়ার খুরের শব্দ। টগবগ টগবগ। শুনতে শুনতেই ঘাড়ের উপর এসে পড়লো। ঘোড়ার উপর লাগাম হাতে মাধবগিরি। মন্দিরের মামলা ছিল। দূরদেশে হাজিরা ছিল। ফেরার পথে চোখ আটকে গেল। ভেজা কাপড় লেপটে আছে অঙ্গে! মেঘবরণ চুল পড়েছে অনাবৃত পিঠে! বিন্দু বিন্দু জল চুইয়ে পড়ছে সেখানে! ভরা শ্রাবণ উপচে পড়ছে শরীরে! কার ঘরের মেয়ে? উত্তেজনায় হাতের লাগামে টান পড়ছে। ঘোড়ার চিঁহি ডাকে বাড়ির পথ ধরে ছুটছে মেয়ে। এই লজ্জা থাকবে না। যাবেই বা কোথায়? মোহন্তর নজরের বাইরে যাবার জো নেই। আরে, মেয়ে তো মন্দাকিনীর বাড়ি ঢুকল! যাক, নীলকমলের বড়ো মেয়ে। তবে তো হাতের মুঠোয়! রাতেই মন্দাকিনীর ডাক পড়লো। মেয়ের পরিণতিতে চমকে উঠল নিরুপায় নীলকমল। কিন্তু অভাবের সংসারে অনশন চলে না। পরিবর্তে তার ঝিটেবেড়ায় মাটি উঠবে। মন্দাকিনীর গলায় সোনার পদ্মহার উঠবে। মন্দ কী? উপায়ই বা কী?

কলকাতায় খবর পেয়েছে নবীন। শ্বশুরবাড়িতে টের পেয়েছে নবীন। ছন্দপতন। অপাপবিদ্ধ মুখ চপলমতি হয়েছে। ঘরের বউ মন্দিরের মোহন্তের রঙ্গপ্রিয়া হয়েছে। আর নবীনের সর্বনাশ হয়েছে। এলোকেশীরও। এর শেষ দেখবে সে। মাথায় রাগ চড়লো নবীনের। শ্বশুরবাড়িতে এসে এলোকেশীকে পেল না। সপ্তাহের মাঝে অকস্মাৎ আগমন। সম্বন্ধিরা ঢোঁক গিলছে। পাংশু মুখগুলো সামনে আসছে না। তারকেশ্বর মন্দিরে ছুটল নবীন। একটা হেস্তনেস্ত হোক। কিন্তু বিধি বাম। বিপদ বুঝে এলোকেশীর কাছে এত্তালা পৌঁছেছে। ঘরের বউ আবার ঘোমটার আড়ালে। চেনা কুলুঙ্গির পাশে। অচেনা সোয়ামী। অজানা রাগ। সোজাসাপটা জবাব চায়। যা রটেছে তাই কি ঘটেছে? বুক ভাঙা কান্না দলা পাকিয়ে উঠল। সব সত্যি! এলিয়ে পড়লো এলোকেশী। রাগ নামল নবীনের। একটু। চলো, আমরা কলকাতায় চলে যাই। অসহায় শুকসারির অকারণ অপলাপ। সংসারের অগতি টের পেয়েছে মন্দাকিনী। কলকাতার পালকি বন্ধ করেছে মাধবগিরি। একটাও গরুর গাড়ি চোখে পড়ছে না। গ্রামে-গঞ্জে মোহন্তের চর। কলকাতাতেও। পর্যুদস্ত নবীন। হতবাক জামাই। কপালের রগটা আবার ফুলছে। ওই তো! এলোকেশী আঁশবঁটিতে মাছ কাটছে! হাতদুটো নিশপিশ করে উঠল। চোখদুটো কচলে নিলো। সবকিছু কেমন অন্ধকার লাগছে কেন? এলোকেশীকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল নবীন। হাতের আঁশবঁটি ভারি লাগছে। এবার ভার নামুক। বউয়ের গলায় পড়লো কোপ। ধর-মুড়ো আলাদা হয়ে গেল। কাটা মাছের সঙ্গে গড়াগড়ি খাচ্ছে কাটা মানুষ। রক্ত গড়িয়ে আসছে দালানময়। ঘোলাটে দৃষ্টি নবীনের। টলছে। টলতে টলতেই ম্যাজিস্ট্রেটের দফতরে। হাতে আঁশবঁটি। এক-দু ফোঁটা রক্ত তখনও পড়ছে। 

১৮৭৩ সাল। সেপ্টেম্বর মাস। শ্রীরামপুর। হুগলি সেশন কোর্ট। শুরু হয়েছে মামলা। নবীনের উকিল ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। সরকারি উকিল ঈশ্বরচন্দ্র মিত্র। কাঠগড়ায় নবীন। এজলাসে ডাক পড়ছে সবার। নীলকমল। মুক্তকেশী। অন্য বাড়ির ঝি-বউ। জনশ্রুতি মন্দাকিনীকে আগেই সরিয়ে দিয়েছে মোহন্ত। সচেতন সিদ্ধান্ত। নীলকমল সংসার বাঁচাতে মিথ্যে বলছে। মুক্তকেশী অবুঝ মনে সত্যি বলছে। সবই নবীণের বিপক্ষে যাচ্ছে। তবু জনগণ নবীণের সঙ্গে। সে মহান। বউয়ের পাপ জেনেও বউকে ছাড়েনি। যত নষ্টের মূল ওই মোহন্ত। ব্যাটা বকধার্মিক! ওকেই সাজা দেওয়া হোক! ফাঁসি হোক ওই ভণ্ডের! উমেশচন্দ্র দুঁদে উকিল। নবীণের মানসিক অস্থিতিতে জোর দিয়েছে। অপ্রকৃতিস্থ খুনির সাত খুন মাপ! হলও তাই। জুরিরা নবীণকে ছেড়ে দিতে মত দিলেন। জনতার বিজয়োল্লাস ছাপিয়ে গেল। তারপর দুম করে থেমে গেল। জজ এইচ টি প্রিন্সেপ বেঁকে বসেছেন। হিসেব যেন মিলছে না! মামলা পাঠিয়ে দিলেন কলকাতা হাইকোর্টে। মানুষ খেপে লাল! ম্লেচ্ছগুলো আমাদের অন্দরে নাক গলাবার কে?? ইট-পাটকেল পড়ছে জজের দিকে। তবু একমাসের অপেক্ষা। আবার শুনানি। এবার বিচারপতি দুজন। এজি ম্যাকারসন আর জি জি মরিম সাহেব। সরকারি কৌঁসুলি জগদানন্দ মুখোপাধ্যায়। নবীনের পক্ষে সেই দুঁদে ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। এবার রায় ঘুরে গেল। খুনি পাগল হলেও আইনের উপরে নয়! তাই সে দোষী। ৩০২ ধারা। যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর। এদিকে মাধবগিরি দুমাস নিরুদ্দেশ। পরে আত্মসমর্পণ করেও বেবাক বোবা। যা কথা উকিলেই বলে। এই সুযোগে শত্রু বাড়ছে। আগেই অনেক ছিল। সামনে এলো সব। মোহন্তের ষোলোআনা দোষ দেখিয়ে দিল। কৌঁসুলিরাও কুপোকাত। মোটা জরিমানা হল মাধবগিরির। সাথে তিন বছরের কারাবাস। আবার খেপলো জনতা। নবীণকে ক্ষমা করতেই হবে। মোহন্তর শাস্তিই বা এতো কম কেন? সই দিতে লাগলো। সই নিতে লাগলো। গণ্যমান্য, সাধারণ, বেজাত, ভিনদেশী। সব মিলিয়ে দশহাজার। যথেষ্ট। জমা পড়লো সরকার বাহাদুরের কাছে। নবীণ মুক্ত হল দু-বছর পর।  

ঘটনার ঘনঘটা। আসমুদ্র হিমাচল আসক্ত হল। ভক্ত বাড়ল তারকনাথের। দেবদেবী ছেড়ে কেচ্ছা উঠল কালীঘাটের পটে। নাটক, প্রহসন সস্তা রঙ্গ পেল। ছবির বই এলো বাজারে। শেষ হয়ে আবার ছাপল। বটতলা লক্ষ্মীদেবীর দাক্ষিণ্য পেল। বেঙ্গল থিয়েটার মাইকেলের ‘শর্মিষ্ঠা’ ছেড়ে অখ্যাত লক্ষ্মীনারায়ণ দাসের ‘মোহন্তের এই কি কাজ’-এ মুনাফা পেল। নাটকফিরতি মানুষ পাঁচালি গাইল, ‘মোহন্তরে লয়ে কত নিউশ ছাপিল।/ মোহন্ত লইয়া কত থিয়েটার হলো।।/ মোহন্ত লইয়া কত বৈষ্ণবাদিগণ।/ সঙ্গীত গাইয়া অর্থ করে উপার্জন…।।’ রোজনামচায় মানুষ এলোকেশী শাড়ি, এলোকেশী বঁটি, পানের ডিব্বা নিয়ে বাড়ি ফিরল। বিজ্ঞাপনে মোহন্তর জেলে টানা ঘানির তেল ব্যাথার অব্যর্থ ওষুধ হয়ে বাজারে এল। আর বাংলার বাড়িঘর দালান জুড়ে নবীণের জন্য বুকচাপা দীর্ঘশ্বাস রয়ে গেল। শয়ে গেল।

Developed by DXDasia