নাটক – ‘দুই মহল’, নির্দেশক – রামকিঙ্কর বেইজ, আবহ নির্মাণ – মোহন সিং

মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন – পর্ব ৬

টুকুর সঙ্গে এক জোৎস্না রাতে ক্যানালের ধারে বসে আছেন মোহন সিং। হঠাৎ দেখলেন, সোনাঝুরির শালবনের ভিতর থেকে দু’জন মানুষ হেঁটে আসছেন তাঁদের দিকে। কিন্তু এই গভীর রাতের মৃদু আলোয় ঠিক মতো দেখা যাচ্ছে না তাঁদের মুখ। কারা তাঁরা? সামনে আসতেই দেখা গেল, তাঁদের একজন রামকিকঙ্কর বেইজ আর অন্যজন ঋত্বিক ঘটক। রামকিঙ্কর বেইজ মোহনের দিকে ইঙ্গিত করে ঋত্বিক ঘটককে বললেন, “এই ছেলেটা দারুণ গান গায় জানো! আমি ওর রেওয়াজ শুনতে সকালে সংগীত ভবনে যাই।” ঋত্বিক ঘটক সেদিন মুচকি হেসেছিলেন শুধু। এই মুচকি হাসার সাক্ষী ছিল জ্যোৎস্না মাখা চাঁদ আর রবীন্দ্রনাথ। ঋত্বিক আর মোহনের ভিতর হয়তো তখন একটাই গান অনুরণিত হচ্ছে – “আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে/ বসন্তের এই মাতাল সমীরণে”।

রামকিঙ্কর বেইজ একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন। একবার ঠিক করলেন গাছ লাগাবেন, তবে তার আগে মোহনকে গুরু নানকের একটা ভজন গাইতে হবে। এহেন জরুরি তলবে মোহনকে ক্যান্টিন থেকে ছুটে আসতে হল। আরো কত মজার সব স্মৃতি ‘কিঙ্করদা’র সঙ্গে।

(গত পর্বের পর)

‘রক্তকরবী’ নাটকে বিশু পাগলের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন রামকিঙ্কর

গত পর্বে বলা হয়েছিল, সোনাঝুরির বনে রামকিঙ্কর বেইজ এবং ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা। আমরা অনেকেই জানি, মধ্যকৈশোরে রামকিঙ্কর অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছবি আঁকতেন। মেট্রিক ক্লাস পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর ষোলো বছর বয়সে তিনি বাঁকুড়ার বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং ‘প্রবাসী’ পত্রিকার সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের নজরে পড়েন। চার বছর পরে রামকিঙ্কর বিশ্বভারতীতে চারুকলার ছাত্র হিসেবে যোগ দেন। প্রবাদপ্রতিম নন্দলাল বসু ছিলেন তাঁর শিক্ষক। রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় প্রমুখকে পেয়েছিলেন সহপাঠী হিসাবে। চারুকলায় ডিপ্লোমা অর্জন করে বিশ্বভারতীর ভাস্কর্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের পদে নিযুক্ত হন। অবসর গ্রহণ করেন ১৯৭১ সালে। মোহন সিং-এর সঙ্গে রামকিঙ্করের সম্পর্ক ছিল দেখার মতো। মোহন গান গাইলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে শুনতেন রামকিঙ্কর। নববর্ষ, দুর্গাপুজোয় মোহন সিংকে কার্ড পাঠাতেন তিনি। সেই কার্ডে আঁকা থাকত বেইজের নিজের কাজ। তখন কেউ জানত না, মোহনের প্রিয় ‘কিঙ্করদা’ কী মানের মানুষ ছিলেন। 

মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন। আজ ষষ্ঠ পর্ব।

রামকিঙ্কর বেইজ একটা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে নাটক শিখিয়েছিলেন। ‘দুই মহল’। নির্দেশক – রামকিংকর বেইজ। আবহ নির্মাণ – মোহন সিং। এমনকি রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকে বিশু পাগলের চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন রামকিঙ্কর। পঞ্চাশের দশকের শুরু থেকে বিশ্বভারতীতেই একের পর এক নাটক মঞ্চস্থ করেছেন। আসলে রামকিঙ্কর বেইজের অভিনয় এবং গানের পারদর্শিতার কথা কেউই প্রায় জানেন না। মোহন সেই সব দিনগুলির সাক্ষী থেকেছেন একাধিকবার।

কণিকা বন্দ্যপাধ্যায়ের সঙ্গে সস্ত্রীক মোহন সিং খাঙ্গুরা। পাশে রয়েছেন বিক্রম সিং খাঙ্গুরা।

কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন মোহনের প্রিয় ‘মোহরদি’

মোহন সিং-এর স্ত্রী শুচিস্মিতার কথা আগের একটি পর্বে বলা হয়েছিল। ‘সহজপাঠ’ পড়ে বাংলা ভাষার প্রেমে পড়েছিলেন মোহন। শুচিস্মিতা ছাড়া যা প্রায় অসম্ভব ছিল। এই শুচিস্মিতা ছিলেন মোহনের সহপাঠী। ক্লাসে পাঁচজন মেয়ে, আর মোহন একমাত্র ছেলে। মেয়েদের স্কেল নিচু ছিল বলে আলাদা ক্লাস হত। মোহন একা ক্লাস করতেন উস্তাদজির কাছে। ১৯৬৭-র শেষের দিক। তখনও মোহন হিন্দি আর ইংরেজিতে কথা বলেন। বাংলা শেখার ইচ্ছে ছিল প্রবল। শুচিস্মিতাই ছিল তাঁর একমাত্র ‘শিক্ষক’। এরপর ১৯৭০ সালে রবীন্দ্রনাথের ‘শ্যামা’ মঞ্চস্থ করেছিলেন শান্তিদেব ঘোষ। তখন ধীরে ধীরে পরিচয় হচ্ছে প্রবাদপ্রতিম রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। কণিকা ছিলেন মোহনের প্রিয় ‘মোহরদি’। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে একবার কলকাতা যেতে বললেন। রবীন্দ্র সদনের একটি অনুষ্ঠান। সেখানে বাকি শিল্পীদের সঙ্গে মোহনকেও গাইতে হবে গান। মোহরদির অনুরোধ ফেরাতে পারলেন না মোহন। একের পর এক গান গাইছেন মোহন তিনি। হাততালিতে ফেটে পড়ছে রবীন্দ্র সদন প্রেক্ষাগৃহ। কলকাতার সংগীত রিসার্চ আকাদেমিতে সুযোগ এসেছিল রনধীর রায় আর মোহন সিং-এর স্কলার হওয়ার সুযোগ। শান্তিনিকেতনে মোহরদি’র সঙ্গে দেখা করলেন মোহন। কিন্তু মোহর বললেন, বিশ্বভারতী তোমাদের তৈরি করল। আর তোমরা কলকাতা চলে যাবে? দোনামোনায় পড়লেন মোহন আর টুকু। হঠাৎ একদিন দেখা গেল বিশ্বভারতী থেকে রনধীর রায়ের কাছে চিঠি পৌঁছেছে – সংগীত ভবনে পার্ট টাইম করতে হবে। মোহন সিং-এর চিঠিতে লেখা সংগীত ভবনে ক্লাস নিতে হবে। এই টানাপড়েনের মধ্যে কী যে লেখা আছে আগামীদিনে, তা সত্যিই বোঝা দায় ছিল সেদিন।
(চলবে…)  

*অর্পিতা চ্যাটার্জির নেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত। 

Developed by DXDasia