
মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন – পর্ব ৭
তখন ধীরে ধীরে পরিচয় হচ্ছে প্রবাদপ্রতিম রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। কণিকা ছিলেন মোহনের প্রিয় ‘মোহরদি’। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে একবার কলকাতা যেতে বললেন। রবীন্দ্র সদনের একটি অনুষ্ঠান। সেখানে বাকি শিল্পীদের সঙ্গে মোহনকেও গাইতে হবে গান। মোহরদির অনুরোধ ফেরাতে পারলেন না মোহন। একের পর এক গান গাইছেন মোহন তিনি। হাততালিতে ফেটে পড়ছে রবীন্দ্র সদন প্রেক্ষাগৃহ। কলকাতার সংগীত রিসার্চ আকাদেমিতে সুযোগ এসেছিল রনধীর রায় আর মোহন সিং-এর স্কলার হওয়ার সুযোগ। শান্তিনিকেতনে মোহরদি’র সঙ্গে দেখা করলেন মোহন। কিন্তু মোহর বললেন, বিশ্বভারতী তোমাদের তৈরি করল। আর তোমরা কলকাতা চলে যাবে? দোনামোনায় পড়লেন মোহন আর টুকু। হঠাৎ একদিন দেখা গেল বিশ্বভারতী থেকে রনধীর রায়ের কাছে চিঠি পৌঁছেছে – সংগীত ভবনে পার্ট টাইম করতে হবে। মোহন সিং-এর চিঠিতে লেখা সংগীত ভবনে ক্লাস নিতে হবে। এই টানাপড়েনের মধ্যে কী যে লেখা আছে আগামীদিনে, তা সত্যিই বোঝা দায় ছিল সেদিন।
(গত পর্বের পর)
মোহরদিকে শোনানো চলছে ‘রাখো রাখো রে’
১৯১০ সালে শ্যাম কল্যাণ রাগে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “রাখো রাখো রে জীবনে জীবনবল্লভে,/ প্রাণমনে ধরি রাখো নিবিড় আনন্দবন্ধনে”। ‘মোহরদি’ অর্থাৎ কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় চেয়ারে, মোহন নিচের শতরঞ্চিতে। মোহন ভালোবেসে শোনাচ্ছেন এই গান – ‘রাখো রাখো রে’। মোহনের তাল, লয় এবং গায়কি সেদিন পছন্দ হয়েছিল কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে মোহরদির। ওপাশ থেকে উত্তর এসেছিল, “এইটাই, এইটাই গাইবে তুমি”। পরবর্তীকালে অনেক শিল্পীই কণিকা বন্দ্যপাধ্যায়ের কাছে আসেন, ‘রাখো রাখো রে’ গানটি তুলতে। মোহরদি তাঁদের না ফিরিয়ে অতি যত্নে শুনিয়ে দিতেন মোহন সিং-এর গায়কি। দিদি এবং ভাইয়ের সম্পর্ক অমোঘ হয়ে উঠত রবীন্দ্রনাথের গানের মধ্যে দিয়ে। এই গানেই তো রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “আলো জ্বালো হৃদয়দীপে, অতিনিভৃত অন্তরমাঝে, আকুলিয়া দাও প্রাণ গন্ধচন্দনে”। এক্ষেত্রে এই গন্ধচন্দন আসলে গানকে নিজস্বতায় প্রকাশ করা, যেখানে মূল গানের সুর, লয়, তাল কোনোকিছুই বিচলিত হবে না, আবার গানের যে গতি বা মেজাজ তাও সসম্মানে উজ্জ্বল থাকবে। মোহন সিং রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে এসে আসলে এটাই প্র্যাক্টিস করেছেন বারবার। দুঃখের বিষয়, আজকাল আর এই গানটি তেমন শোনা যায় না।
বিক্রম সিং-এর জন্ম পাঞ্জাবে, মায়ের দেওয়া নাম ‘পিঙ্কু’
আমরা যারা কমবেশি মোহন সিং খাঙ্গুরার গান-বাজনা এবং বিপুল কর্মকাণ্ড সম্বন্ধে অল্পবিস্তর জানি, তারা জেনে গিয়েছি যে, তাঁর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এসরাজ এবং তানপুরা বাদ্যযন্ত্রদুটি। এই জীবনালেখ্য যাঁরা প্রথম পর্ব থেকে পড়ছেন, একথা বিস্তারে জেনে থাকবেন। এই দুটি বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে শাস্ত্রীয় ও রবীন্দ্রনাথের গান লালিত হয়েছে। যার বীজ মোহন সিং বপণ করেছেন দুই পুত্র বিক্রম সিং খাঙ্গুরা এবং আবির সিং খাঙ্গুরার মধ্যেও। তবে মোহন সিং তাঁদের কখনও জোর করেননি। সারাদিন বাড়িতে গানের পরিবেশের মধ্যে থাকতে থাকতে দুই ছেলেও বুঝে গিয়েছিলেন একমাত্র আরাম ও বেঁচে থাকার জায়গা আসলে এই গান। ঘটনাচক্রে এক পুত্র বিক্রম তুলে নিয়েছিলেন গানকে আর আবির তুলে নিয়েছিলেন বাদ্যযন্ত্রকে।
শৈশবের বিক্রম-আবির
টুকু অর্থাৎ রনধীর রায়ের বাদ্যযন্ত্র দেখলেই টুং টাং করতেন আবির। একবার কোনো একটি তার খুলে যাওয়ায় ছোট্ট আবির বাঁধতে শুরু করেছিল। সেই দেখে চমকে উঠেছিলেন রনধীরবাবু। এতটুকু বয়সে এত সুন্দর করে তার বাঁধছে বাদ্যযন্ত্রে! সেই শুরু। আরেক সন্তান বিক্রম। স্বাতন্ত্রতায় যিনি আজও প্রত্যেকটি সংগীতপ্রেমীর হৃদয়ের নয়ন জুড়ে থেকে গেছেন। বিক্রম সিং-এর কথা উঠতেই বাবা মোহন সিং বলেন, বিক্রমের জন্ম পাঞ্জাবে। গায়ের রং ছিল গোলাপি। সেই থেকে মায়ের দেওয়া নাম ‘পিঙ্কু’। প্রথম ‘সা’ লাগিয়েছিল মাত্র দেড় বছর বয়সে। উস্তাদজি প্রথমদিন চমকে গেছিলেন। এই বয়সে এমন সুর! কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে বিক্রমের যাতায়াত ছয় বছর বয়স থেকে। তাঁর কোলে বসে গান শিখেছেন, কবিতা লিখেছেন। মোহরদির দেওয়া তাই আদরের নাম ‘কবি’। বিক্রম সিং-এর ক্ষণজন্মের সাক্ষী থেকেছি আমরা। তাঁর গলায় রবীন্দ্রনাথের গান শুনে কেঁদে উঠেছি, অস্থির হয়েছি। মোহন সিং, বিক্রম সিং এবং আবির সিংকে নিয়ে বিস্তৃত লেখা পরের পর্বের জন্য তোলা রইল।
(চলবে…)
*অর্পিতা চ্যাটার্জির নেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত
অনিবার্য কারণবশত এই পর্বে কোনো ভিডিও ক্লিপিং রাখা সম্ভব হল না।
