
মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন — পর্ব ১৪
মোহন সিং-এর গানের সবচেয়ে বেশি ভক্ত কিন্তু স্কুল আর কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরাই। তাঁরই একটু কথা বলে আজকের পর্ব ইতি টানা যাক। মোহনবাবু মনে করেন, গানের ক্ষেত্রে স্বরজ্ঞান আর লয়টা সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখন বেশির ভাগ গানই লোকে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে গায়। লোকে শুনবে কেন? শান্তিদেব ঘোষ যাকে বলতেন ‘অশিক্ষিত গলা’। গানের বাণীতে, সুর আর লয়ের মেজাজ থাকলেই সেই গান শ্রোতাদের মন টানবে। আর ঘরানা তো একটাই। রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে অনুসরণ করলেই হল।
(গত পর্বের পর)
"শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শ্রোতা আমার আছে। তাঁরা অধিকাংশ বয়স্ক লোক। আর, তাঁরা তো বলে বেড়ান না। রবীন্দ্রসঙ্গীতের শ্রোতা তো ছোটো থেকে বড়ো সবাই। ফলে, পরিচিতিটা বড়ো। কিন্তু, এর জন্য দুঃখ হয়, সেভাবে বলব না। এটা আসলে, একটা মানুষকে চেনার অভাব। বিশ্বভারতীতে আমি যখন সংগীতভবনের ছাত্র হয়ে আসি, আমার গুরু ছিলেন অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়। বিষ্ণুপুর ঘরানার শিল্পী। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অসাধারণ শিল্পী। তিনি অসাধারণ কণ্ঠ শিল্পী যেমন ছিলেন, তেমনি সেতারেও ছিলেন পণ্ডিত। তাঁর সুরবাহার শুনেছি, তবলা শুনেছি। অসাধারণ এসরাজ বাজাতেন। তাঁর কাছে আমি এসরাজ শিখেছি। অশেষদার অশেষ গুণের জন্যেই রবীন্দ্রনাথ তাঁকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন।" — কথাগুলো একটানা বলে যাচ্ছেন মোহন সিং। পাঞ্জাবের লুধিয়ানা থেকে শান্তিনিকেতনে গান শিখতে চলে আসা এই মানুষটি জীবনের এই পর্যায়ে এসে আর ভাবেন না, কী পেলেন বা কী পেতে চান। কারণ তিনি অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়, ধ্রুবতারা যোশি, বি বি ওয়াজেলওয়ারের মতো গুণী পণ্ডিতদের সান্নিধ্য পেয়েছেন। এইটিই বড়ো পরিচয়। আগের একটি পর্বে মোহন সিং-এর স্ত্রী শুচিস্মিতা গুপ্তের প্রসঙ্গ এসেছিল। আজকের পর্বটিও তাঁকে নিয়ে সাজিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হল।

ক্লাসিক্যাল গানের ক্লাস করতে ভাষার জন্য অসুবিধা হত না। তবে বন্ধু বা সহপাঠীদের সঙ্গে সমানতালে কথা বলতে বেশ অসুবিধা হত মোহনের। তখনও বাংলা শিখে ওঠা হয়নি। হিন্দি কিংবা ইংরেজিতেই কথা বলতেন। মোহন সিং-দের ক্লাসে তখন মোট ছয় জন ছাত্রছাত্রী। পাঁচজন মেয়ে আর মোহন একমাত্র ছেলে। বেশিরভাগ ক্লাস তখন ছেলেদের জন্য আলাদা, মেয়েদের জন্য আলাদা হত। মোহন একা ক্লাস করতেন, বাকি পাঁচজন ছাত্রী আলাদা ক্লাস করত। কিন্তু একসঙ্গে ক্লাস করার সময় বা বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করার সময় অসুবিধে হত বেশ।
এই পাঁচজন মেয়ের মধ্যে একজন ছিলেন শুচিস্মিতা গুপ্ত। বাঙালি। মোহন সিং-এর সহপাঠী। শুচিস্মিতার বড়ো আদরের নাম ছিল সুমু, অর্থাৎ ডাকনাম। কিন্তু এভাবে বাংলা না শিখে তো বেশিদিন চলতে পারে না। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে আছেন, অথচ এক অক্ষরও বাংলা জানবেন না! এ কী করে হয়! বড়ো লজ্জায় পড়লেন মোহন। এমন সময় হঠাৎ শুচিস্মিতা ‘সহজপাঠ’ উপহার দিলেন মোহনকে।বইটি মোহনের হাতে ধরিয়ে বললেন, বাংলা না শিখলে আমরা তোমার সঙ্গে কথাই বলব না।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মোহন সিং বলছেন, ‘সহজপাঠ’ পেয়ে আমি সুমুকে বললাম, আগে ‘অ আ ক খ’ লেখা বই দাও। আমি দেখলাম হিন্দি অক্ষরের সঙ্গে খুব বেশি তফাৎ নেই। এক সপ্তাহ বাদে আমি সুমুকে ‘সহজপাঠ’ পড়ে শোনালাম। শুরু হয়ে গেল বাংলা ভাষার প্রেমে পড়া।
অনেক বছর হল শুচিস্মিতা নেই। এই শুচিস্মিতাই একসময় বাংলা শিখিয়েছিলেন মোহনকে। মোহন বাঁশির রূপ আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন আদরের সুমু। যেখান থেকে শান্তিনিকেতনের মাঠ-ঘাট-রাস্তা-সোনাঝুরি-লালবাঁধ-তেপান্তর ছাড়িয়ে তাঁদের প্রেম হয়ে উঠেছিল জ্যোৎস্না রাতের ক্ষণিক আলো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কবিতায় লিখেছিলেন, "যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই -/ যা দেখেছি, যা পেয়েছি, তুলনা তার নাই।/ এই জ্যোতিসমুদ্র মাঝে যে শতদল পদ্ম রাজে/ তারি মধু পান করেছি, ধন্য আমি তাই।" — এই দেখা আর পাওয়ার মাঝে বিস্তৃত সংসারের সমুদ্র। প্রিয় সুমুরা অন্তরের মায়ায় থেকে যান আদিগন্ত।
(চলবে…)
*মূল সাক্ষাৎকার গ্রাহক— অর্পিতা চ্যাটার্জি
অনিবার্য কারণবশত এখন কোনও ভিডিও ক্লিপিং রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
