…লাশ পড়বে শ্মশানে

মোদির নতুন অতিথির নাম মিঠুন চক্রবর্তী

গত রবিবার ব্রিগেডের সভায় বিজেপির প্রধান বক্তা ছিলেন নরেন্দ্র মোদি। একটি অসত্য তথ্য দিয়েই ভাষণ শুরু করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী জানালেন, তিনি জীবনে অনেক জনসভায় ভাষণ দিয়েছেন, কিন্তু এত জনসমাগম আর কোনও সভায় হয়নি। বোঝাই যায়, ভোট বড়ো বালাই। কারণ সাম্প্রতিককালে তাঁর দলের ঢোল বাদকেরা এই কথা জানিয়ে এসেছে, মোদি আমেদাবাদে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে যে সভা করেছিলেন সেটাই ছিল বৃহত্তম সমাবেশ। তাছাড়া নর্মদা প্রকল্প সর্দার প্যাটেলের নামে যে অতি দীর্ঘ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল সেটাও নাকি বৃহৎ জন-সমাবেশের রেকর্ড।

ভোট বাজারে সেইসব পুরোনো সংবাদ পকেটে গুঁজে রেখে তিনি ব্রিগেড সমাবেশের যে লোকগণনা করলেন তা শুনে ঘোড়াও হাসবে। বাংলার মানুষের আর যাই হোক, একটি বিষয়ে কোনও অরুচি নেই – তা হল দল বেঁধে ব্রিগেড ভরানো। তার জন্য বাঙালিদের পরনির্ভর হতে হয় না। ব্রিগেড ভরানোর মতো ভারি নেতা তাঁরা নিজেরাই তৈরি করে নেয়। সেই তালিকায় অবশ্যই জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উঠে আসবে।

তবে একটি বিষয়ে বাঙালির অরুচি আজও কাটল না। তারা কোনও জবরদস্ত হিন্দুত্ববাদী নেতা তৈরি করতে পারেনি। সেই কারণেই মোদিদের আজও সাত দশক আগের শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে টেনে আনতে হয়। যদিও তিনি ব্রিগেডের মাঠে কোনোদিন নিজের জনপ্রিয়তা যাচাই করেননি।

‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিয়ে ভোট বাজার মাত করার জন্য বিজেপিকে এখনও গুজরাটের ভরসাতেই থাকতে হয়। তাঁর কারণ এই রাজ্যে যারা বিজেপির মুখ তাঁরা সকলেই হঠাৎ নবাব। যে ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে বাজপেয়ী-আদবানি-হরিপদ ভারতী-বিষ্ণুকান্তরা নিজেদের তৈরি করেছিলেন, এরা তার ধারে কাছে নেই।

২০১৯-এর লোকসভা ভোটের পর রাজ্যভিত্তিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার যে সুযোগ বিজেপির এসেছিল, তার পায়ে তাঁরা নিজেরাই কুড়ুল মেরেছেন। দলটি থলি হাতে বাজার থেকে আলু-পটল খরিদ করতে বেরিয়ে পড়েছে। তৃণমূলের খাঁচা খালি করে আসা এইসব পরিযায়ী পাখিদের গলায় এখন একই গান – জনসেবা করতে না পারার জন্য তাঁরা বিজেপির দরজায় এসেছেন।

এই সাফাই গাইবার সময় তাঁরা গোটা দেশের দিকে একবার চোখ ফেরালে ভালো করতেন। ত্রিপুরায় বিজেপি দলটাই তৈরি হয়েছিল তৃণমূলের মুকুল রায়ের বদান্যতায়। আজ সেই রাজ্যে বিজেপির ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা। মধ্যপ্রদেশে জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া এখন আর সংবাদের শিরোনামে জায়গা পান না। রাজপুত্রের পথের ভিখারি হতে এখন কেবল দিন গোনা বাকি।

সেবা-খ্যাপা এই প্রাক্তন তৃণমূলীরা একবার বিজেপি দলটিকেও খুঁটিয়ে দেখলে পারতেন। ২০১৪ সালেই নরেন্দ্র মোদি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন পেট্রোল-ডিজেলের দাম ৪০ টাকায় নামিয়ে আনবেন। আজ সেই অঙ্ক ১০০ টাকা ছুঁতে চলেছে। রান্নার গ্যাসের দহন আরও মর্মান্তিক। এসব যদি হয় প্রশাসনিক ব্যর্থতা, তবে দলের ভেতরের ব্যর্থতাও নিতান্ত কম নয়। এই বাংলায় রাহুল সিনহা তার সাক্ষী দেবেন। গত মঙ্গলবারেই পদত্যাগ করেছেন উত্তরাখণ্ডের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী টিএস রাওয়াত। বিধানসভায় তাঁর নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা ছিল। আগামী বছর সেই রাজ্যে বিধানসভা ভোট। তবুও রাওয়াতকে গোষ্ঠী দ্বন্দ্বের জেরে সরে দাঁড়াতে হল।

তৃণমূলছুট সেবা-খ্যাপার দল ব্রিগেডের সভাতেই মালুম পেয়েছেন যে কোন আখড়ায় তাঁরা ঢুকেছেন। সেখানে সবাই লাইন দিয়ে কাঠ পুতুলের মতো দাঁড়িয়েছিলেন। কোনও মুকুল, কোনও শুভেন্দু বক্তার তালিকায় ঠাঁই পাননি। কারণ মোদি ততক্ষণে নতুন অতিথি পেয়ে গেছেন- যার নাম মিঠুন চক্রবর্তী। নকশাল-সিপিএম-তৃণমূল ঘুরে মিঠুন এখন চার নম্বর ঘাটে তরী ভিড়িয়েছেন। আমজনতার মন জয় করতে মাইকের সামনে গিয়েই তিনি ডায়ালগ দিয়েছেন, “মারব এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে”। এই সংলাপ মোদির নিশ্চয় পছন্দসই হবে। কারণ ২০০২ সালে মোদি-অমিত জুটি গুজরাটে সংখ্যালঘুদের জন্য শ্মশান রচনা করেছিলেন।

তবে মিঠুনের শেষ সংলাপ নিয়ে কিছুটা সংশয় তৈরি হয়েছে – “আমি জাত গোখরো, …এক ছোবলে ছবি”। বাংলা-সহ দেশের আমজনতা নরেন্দ্র মোদির ছোবল খেয়েই চলেছে। এখন দেখা যাক মিঠুনের দাঁতে কত বিষ আছে।

Developed by DXDasia