‘মাইকেল’ মধুসূদন এবং ভুলে যাওয়া লাল গির্জা

মধুসূদনের ধর্মান্তরণ ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠল গোটা কলকাতা

“I sat in darkness, Reason's eye
Was shut, – was closed in me; –
I hastened to Eternity
O'er Error's dreadful sea…."

১৮৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি। বৃহস্পতিবার। সন্ধেবেলা। কলকাতার লাল গির্জায় হাইম গাইছেন এক যুবক। বয়স উনিশ। আজ তাঁর ধর্মান্তরণের পালা। গির্জার প্রধান পুরোহিত এবং আর্চডিকন মি ডিয়ালট্রি জর্ডানের বারি দিয়ে ধুয়ে  দিচ্ছেন তাঁর অতীতের সব পাপ। আসলে ধোয়াতে চাইছে  সমস্ত অতীতটাই। বাঙালি উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলে স্বেচ্ছায় বেছে নিচ্ছেন খ্রিস্টধর্ম। তাঁর গানে ফুটে উঠছে হিন্দু ধর্মের অন্ধতা থেকে খ্রিস্টধর্মে মুক্তির আকুতি। স্বেচ্ছায় ধর্ম পরিবর্তন। অথচ গির্জার সামনে কড়া প্রহরা, অবশ্যই সশস্ত্র। অদূরে কারা যেন লেঠেল পাঠিয়েছে। এই ছেলেকে কিছুতেই তারা খ্রিস্টান হতে দেবে না। অন্যদিকে মিশনারিরাও বদ্ধপরিকর । এই ছেলেকে হাতছাড়া করবে না তারা। শহরে তখনো বেশ শীত। কিন্তু হিন্দু পরিবারের এই ছেলের ধর্মান্তরকে ঘিরে আতপ্ত হয়ে রয়েছে গোটা কলকাতা।

ছেলেটি আমাদের সুপরিচিত মাইকেল মধুসূদন দত্ত। খ্রিস্টান হওয়ার দিন-দুই আগে ফিরিঙ্গি ছাটে চুল কেটে বন্ধুদের তাক লাগিয়ে দিয়েছিল সে। আর তারপর হঠাৎ করে এই ঘটনা।

কলকাতার লাল গির্জার সুউচ্চ থামগুলির সামনে গিয়ে দাঁড়ালে আজও সেদিনের সন্ধ্যার এই দৃশ্যপটকে অনুভব করতে পারে যে কেউ। মানসচোখে দেখেও নিতে পারে মধুসূদনের অবস্থাটা। ঠিক কোন গূঢ় কারণে পরিবারের সমস্ত বাধা, পিছুটানের বলয়কে উপেক্ষা করে সে খ্রিস্টান হল, তা আজও অনেকের কাছেই ধাঁধাঁ। 

এমনকি, কলকাতার লাল গির্জাকে এখনও মনে রাখার একটি গুরত্বপূর্ণ কারণ এই ঐতিহাসিক ঘটনাটিই।  নাহলে বাস্তবিকই গির্জাটিকে খুঁজে পেতে বড়ো মুসকিল হয় আজকাল। চারপাশের অনেক দানবীয় অট্টালিকা তাকে আড়াল করেছে তো বটেই। পাশাপাশি গির্জার সদর দরজা জুড়ে অসংখ্য দোকান। গাড়িতে ঠাসা রাস্তা। তাতে গির্জার নামটিই যায় চাপা পড়ে। যদিও। তার নাম এখন লালগির্জা নয়। ওল্ড মিশন চার্চ। ওল্ড শব্দটা ভারি প্রতীকী। আর লাল গির্জা নামটায় তো ইতিহাস বুঁদ হয়ে রয়েছে।

আর এন মুখার্জী স্ট্রিটে দাঁড়ানো এই গির্জা থেকে ঠিক দু-পা দূরেই লালদিঘি। শোনা যায়, গির্জার লাল দেওয়ালের ছায়া পড়ত দিঘির জলে, সেই থেকেই ‘লালদিঘি’। যদিও, এই নামকরণ নিয়ে মতান্তর আছে। গির্জার লাল দেওয়াল, তাই লাল গির্জা। তবে, কলকাতার পুরোনো মানচিত্রের সাথে আজকের যোজনখানেক দূরত্ব। তাই গির্জার ছায়া আর দিঘিতে পড়ে না। মজার কথা হল, গির্জাটিও আর লাল নেই।

আর্মেনিয়ানদের বলা হত কলকাতা শহরের দাদামশাই। ইংরেজরা আসার ঢের আগে এসেছিল তারা। তাদের তৈরি চার্চই কলকাতার প্রথম চার্চ। তারপর তৈরি হয় এই লাল গির্জা। ১৭৭০ সালে। কলকাতার প্রথম প্রোটেস্ট্যান্ট গির্জা এটাই। জোহান জাকারিয়া কিয়ার্নান্ডার নামের একজন ব্যক্তি নির্মাণ করেছিলেন এই গির্জা। তিনি ছিলেন সুইডিশ  লুথেরান মিশনারি। ১৭৪০ সালে তিনি ভারতে এসেছিলেন। রবার্ট ক্লাইভের ডাকে কলকাতায় আসেন ১৭৫৮তে। পলাশির যুদ্ধের পরে। সোসাইটি ফর প্রমোটিং খ্রিস্টান নলেজের হয়ে কাজ করতেন তিনি। ১৭৬৭ সালে নিজের খরচেই গির্জা বানাতে শুরু করেন। তা শেষ হয়, ১৭৭০-এ।

লাল গির্জা নামটি মুখে মুখে প্রচারিত ছিল। আসল নাম কিন্তু ছিল ‘মিশন চার্চ’। পরে সেন্ট জন গির্জা (১৭৮৭) নির্মিত হওয়ার পর এই চার্চের নাম হয়ে পড়ে ‘ওল্ড চার্চ’ বা ‘ওল্ড মিশন চার্চ’।

কিয়ার্নান্ডার অবশ্য এই চার্চকে বলতেন 'Beth Tephillah', অর্থাৎ – House of Prayer।

সুবিশাল এই গির্জার গম্বুজওয়ালা চূড়াটি নাকি ছিল ভারি চমৎকার। অনেকটা উঁচু, তিনকোণা। কিন্তু, ১৮৯৭-এর আসাম ভূমিকম্পে তা ধ্বংস হয়ে যায়। সংস্কারের পরেও আর সেই চুড়োকে নতুন করে স্থাপন করা সম্ভব হয়নি কিছুতেই। সেই থেকে আজো বিশাল এই গির্জাটি আজও দাঁড়িয়ে অতীতের চূড়াটি ছাড়াই। সেন্ট জনের গির্জার মতো পরিচিতি আর নেই। কলকাতার অনেকের স্মৃতি থেকেই এই গির্জা মুছেই যেতে বসেছে। শহুরে অট্টালিকা, গাড়ি, গাছপালার ভিতরে মুখ ঢেকে দাঁড়িয়ে থাকা গির্জাটাকে দেখলে যেন সত্যিই মনে হয় আত্মগোপন করে আছে সে। যে চুড়ো তাকে দূর থেকে চেনাত, সেটিও নেই। যেটুকু পড়ে আছে, তাকে বুকে চেপে লুকিয়ে থাকাই যেন শ্রেয়।

অথচ, এমন বিস্মৃতি পাওনা ছিল না লালগির্জার। সারি সারি থামে ঘেরা, সামনে পিছনে মিলে সে এক বিশাল জায়গা। গাছপালা বাগানে ঢাকা। ভিতরে রঙিন কাঁচে তৈলচিত্র। লম্বা এক করিডর। ইতিহাস বড়ো নিবিড় উচ্চারণে কথা বলে এখানে। তবে, বেলা গড়িয়ে গেলে মিলবে না প্রার্থনাগৃহে প্রবেশের অনুমতি। এমনকি, অপরিচিতর পথ আটকে দাঁড়াতে পারে বেশ কিছু সারমেয় নন্দন। নিষ্কৃতি পেতে পকেটে কিছু বিস্কুট রাখা যেতে পারে।

কলকাতায় যখন অলি-গলি-পাকস্থলীর ভিড় ছিল না, স্ট্রিটের নামে, রোডের নামে যখন ভরে ওঠেনি সে, তখনকার স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই গির্জা। খ্রিস্টান মিশনারিদের সে প্রথম যুগ। এদেশের সমস্ত ধর্মকে হারিয়ে প্রতিষ্ঠা পেতে হবে তাকে। তারই এক নিদর্শন হিসেবে থেকে গেছেন মধুসূদনও। ধর্মান্তরিত হওয়ার আগে মধুসূদনকে নাকি রীতিমতো কড়া পাহারায় লুকিয়ে রাখতে হয়েছিল মিশনারিদের। উনিশ শতকের সেই বহুখ্যাত ধর্মান্তকরণের সাক্ষী এই গির্জা। খ্রিস্টান হওয়ার পর জীবনের বাঁক বদলাল মধুকবির। সময়ও বাঁক নিল অন্য খাতে। বদলাতে থাকা সময়ে কখন যেন বিস্মৃত হয়ে পড়ল এই গির্জা। ভুলে যাওয়া আমাদের অভ্যেস। হয়তো ট্রাজেডিও। 

এখনো যদি সেই বিগত সময়ের সামান্য আঁচ পোহাতে ইচ্ছে করতে, নিভু নিভু শীতে বা প্রথম বসন্তে চলে আসুন এই গির্জায়। ইতিহাস আপনার সঙ্গে কথা বলবেই, নিশ্চিত।

Post Tags
Developed by DXDasia