
ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ৫
আমার একটি বইয়ের পাঠ ডঃ শার্লট ফিলিপ্স ও ডঃ অলিভার ফাইনের বাড়িতে। সঙ্গে মুক্তি এবং আমার বহুকালের সঙ্গী ডঃ মাইকেল ইয়েহ।
অনেক, অনেকদিন পরে, অনেক লড়াই করে ক্লান্ত হয়ে নিউ ইয়র্ক শহরেএসে বসবাস শুরু করার পরে বেশ কয়েকজন আমেরিকান বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীর সঙ্গে আমরা সেই ভীষণ বিপদের দিনগুলোর কথাগল্পচ্ছলে বলেছি। যখন আর বলে কোনো লাভ নেই, তখন। বলেছি খুব কাছের কিছু কিছু মানুষকে – রক্তের সম্পর্ক যাদের সঙ্গে নেই, কিন্তু এদেশে থাকতে থাকতে যারা আমাদের আত্মীয়েরও বেশি হয়ে গেছে, তাদের।
প্রত্যেকেই বলেছে, আমরা আমেরিকার ভয়ঙ্কর বৈষম্য এবং অবিচারের শিকার হয়েছি। আমরা যদি শ্বেতাঙ্গ অথবা ধনী হতাম, সেই শ্বেতাঙ্গমার্কিন ডাক্তার ড্যানিয়েল নর্ড আমার স্ত্রীর সন্তানপ্রসবের সময়ে এমন মারাত্মক গাফিলতি করতো না। প্রত্যেকেই বলেছে, আমাদের সেসময়কার বন্ধুদের এবং ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল আমাদের এই মারাত্মক ক্ষতির জন্যে আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করে দেওয়া।
মানসিক যন্ত্রণার কথা, ট্রমার কথা আর নাই বা বললাম। আমার স্ত্রীর চিরকালীন শারীরিক ক্ষতি হয়ে গেলো সেই দুর্বিপাকের পর।
যে সময়ে দীর্ঘকাল দেশে আসতে পারিনি
আমরা ব্যক্তিগত কথা যাকে তাকে বলি না। আমাদের দেশজ মূল্যবোধ ও সামাজিক ব্যবস্থা আমাদের বড্ড বেশি ডিসক্রিশনারি হতে শেখায়। আমরা সবাইকে বিশ্বাসও করতে পারি না, কারণ আমাদের অনেকের মধ্যেই গোপনীয়তা রক্ষার শিক্ষা নেই। একজনকে বিশ্বাস করে অনেক মনের কথা বলে ফেললাম, তারপর দেখা গেলো রেকারিং ডেসিমালের মতো আমাদের গল্প সে ও তার বন্ধুরা বলে বেড়াচ্ছে। পিএনপিসি করে বেড়াচ্ছে। যেন মুখরোচক চানাচুর, পটেটো চিপস। এবং আমাদের দেখলেই চুপ করে যাচ্ছে। যাকে প্রথম বিশ্বাস করে বলেছিলাম, তাকে তো আর চেপে ধরা যাবে না তখন। ধরার মানসিকতাও আমাদের নেই।
আমরা বড্ড বেশি ভালো। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সৎসাহস আমাদের নেই। কী দরকার ঝামেলায় যাবার? আমরা নিজেরাই সে আলোচনা থেকে তখন সরে যাই আত্মসম্মান বাঁচানোর তাগিদে। পিএনপিসি আরো জাঁকিয়ে বসে। কাহিনি পরিণত হয় গল্পে। গল্প পরিণত হয় গুজবে। গুজব পরিণত হয় কেচ্ছায়।
উদ্ভিদ ফসিল ও বিবর্তনবাদ যাঁর কাছে শিখেছিলাম। আর চিনেছিলাম মাথা উঁচু করে বাঁচার রাস্তা। ডঃ লরেন্স ম্যাটেন, সাদার্ন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়।
আমরা বড্ড বেশি ভালো। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সৎসাহস আমাদের নেই। কী দরকার ঝামেলায় যাবার? আমরা নিজেরাই সে আলোচনা থেকে তখন সরে যাই আত্মসম্মান বাঁচানোর তাগিদে। পিএনপিসি আরো জাঁকিয়ে বসে। কাহিনি পরিণত হয় গল্পে। গল্প পরিণত হয় গুজবে। গুজব পরিণত হয় কেচ্ছায়।
অথচ, মার্কিন বন্ধুদের ব্যক্তিগত গল্প বললে একেবারে একশো ভাগ নিশ্চিন্ত হয়ে থাকা যায় যে সে আমাদের একান্ত ব্যক্তিগত কথা কারুকে কখনো বলবে না। তাই আমরা ডাক্তার দম্পতি শার্লট ফিলিপস ও তাঁর স্বামী অলিভার ফাইনকে বলেছি। বলেছি আমার পিএইচডি রিসার্চের প্রফেসর ওয়াল্ট সান্ডবার্গ আর ল্যারি ম্যাটেনকে। বলেছি আমাদের বাঙালি বন্ধু দম্পতি তনুশ্রী আর প্রভাতকে। ওরা কখনো আমাদের বিশ্বাসের মর্যাদা ভঙ্গ করেনি।
তনুশ্রী প্রভাত কেউই কলকাতায় বড়ো হওয়া ছেলেমেয়ে নয়। কলকাতার আঁতেল সোসাইটি, কিংবা সল্টলেক, বালিগঞ্জ, ফার্ন রোড, বেলতলা, নিউটাউন ফ্যামিলি থেকে উঠে আসেনি। তাই বোধহয় নিউ ইয়র্কের পশ্চিমি বাঙালি সমাজে তাদের কদর নেই। ঠিক যেমন নেই শিকাগোর বং সমাজে ওই রেবেকা বৌদি আর বিশ্বদার। যারা আমার জীবন বাঁচিয়েছিলো আমেরিকার সেই একেবারে প্রথম দিনগুলোতে। যারা না থাকলে আমি কোথায় তলিয়ে যেতাম, কেউ জানে না। ওয়ার্কিং ক্লাস পরিবার। পুরোনো নীল রঙের বিউইক গাড়ি চালায়। একতলা পুরোনো বাড়ি। রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারে না। বব আঙ্কেলের বন্ধুরা বেশির ভাগই গুজরাটি, অর্থাৎ বংরা যাদের নাক সিঁটকে বলে গুজু। ওদের কোনো পেডিগ্রী নেই। বাস্তবের কষাঘাতে যন্ত্রণাদীর্ণ নাথ ফ্যামিলি পশ্চিমি বাঙালিদের সঙ্গে আর তেমন যোগাযোগ রাখেনি।
তনুশ্রী প্রভাত কতজন বিত্তবান বং-এর জীবন বাঁচিয়েছে অলব্যানি শহরে, কেউ হিসেব রাখেনি। তনুশ্রী পেশায় রেজিস্টার্ড নার্স। প্রভাত জীববিজ্ঞানী। যাক, সেসব গল্প পরে বলা যাবে।
আবার অন্য দিকও আছে। আমেরিকায় থাকতে থাকতে একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি – এখানে অল্পপরিচিত মার্কিন বন্ধুরাও নিজেদের মনের সব কথা – গোপন, ব্যক্তিগত কথা – বলে ফেলে। কবে কার স্বামী অথবা বয়ফ্রেণ্ড অত্যাচার করতো। হয়তো এক মহিলা বললেন, তার বাবা তিন নম্বর বিয়ে করেছিল বয়েসে কুড়ি-পঁচিশ বছরের ছোট এক যুবতীকে, এবং বিবাহিত জীবনযাপনে অক্ষম হওয়ার কারণে সে যুবতীও কিছুদিন পরে সে ভদ্রলোককে ছেড়ে চলে যায় প্রাক্তন প্রেমিকের হাত ধরে।
ইউ সী (গলা নামিয়ে), দিস ওম্যান ম্যারেড হিম ফর হিজ মানি। দে হ্যাড নো কেমিস্ট্রি বিটুইন দেম। (একটু থেমে) ইউ নো হোয়াট আই মীন? (ধরেই নিলো আমি তখনও ভালো বুঝতে পারিনি) লাইক, মাই ড্যাড ওয়াজ ওল্ড বাই দ্যাট টাইম। দে হ্যাড নো সেক্স লাইফ।” (এবারে একটু দুঃখিত দুঃখিত হাসি।)
এই হলো আমেরিকা। ভালো বলতে পারেন, খারাপ বলতে পারেন। ছিছি করতে পারেন। কারণ, আমাদের প্রজন্মের প্রাচীনপন্থী মূল্যবোধের সঙ্গে একেবারেই মেলে না। এসব কথা শুনে আমরা আশ্চর্য হই, শুনতেই ভীষণ আনকমফর্টেবল লাগে। মনে হয়, এ গল্প কখন যে শেষ হবে! বাড়ি ফিরে এসে বাড়ির লোকের সঙ্গে তামাশার মতো এসব গল্প নিয়ে অশেষ আলোচনা করি। সে আলোচনা কেটে দেওয়া ঘুড়ির মতো কোথায় যে ভেসে ভেসে চলে যায়!
অথচ, আমাদের দেশে কত কোটি দাম্পত্য জীবন যে এভাবেই শেষ হয়ে যায়, তার খবর কে রাখে? কিন্তু চরম অসুখী হয়েও ছেড়ে যেতে পারে না। সমাজ মেয়েদের স্বাধীনতা দেয়নি। আর্থিক মুক্তি দেয়নি। মেয়েরা কোথাও যেতে পারে না। যাবার কোনো জায়গা নেই তাদের।
_________
পিএনপিসি হয়েছিল আমাদের আমেরিকা চলে যাওয়া নিয়ে আমাদেরই পারিবারিক বৃত্তে। সেসব গল্প আমরা অনেক পরে জানতে পেরেছি। আমাদেরই নিকট-আত্মীয়রা আমরা চলে যাবার পরে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে স্থির যা করেছিল, তার সার সংক্ষেপ হলো এই। কল্পিত কথোপকথন নিচে দিলাম।
“পার্থ আমেরিকায় গেলো কী করে রে?”
“কোন পার্থ?”
“আরে, পার্থ মুক্তি পার্থ। আমাদের মুক্তির হাজবেন্ড।”
“ওই পার্থ? পার্থ ব্যানার্জী? পার্থ আমেরিকায় গেছে?”
“হ্যাঁ, এক বছর হয়ে গেলো তো প্রায়। তুই জানিস না?”
“কে যেন একটা বলেছিলো। পার্থ তো সেই সুন্দরবনে…”
“আরে সেটাই তো বলছি। চাকরিই পেলো না কলকাতায়। ফার্স্ট ক্লাস ছিলো না তো এমএসসিতে!”
“ফার্স্ট ক্লাস পায়নি?”
“ধুর, খুব অর্ডিনারি স্টুডেন্ট। সিপিএমকে ধরে সেই সুন্দরবনের গ্রামের একটা কলেজে শেষ পর্যন্ত…”
“মুক্তি কিন্তু কলকাতার কলেজে চাকরি পেয়েছিলো, তাই না?”
“আরে, মুক্তি তো ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তো। পার্থ তো বিদ্যাসাগরের স্টুডেন্ট।”
“তাহলে গেলো কীকরে রে? শালা, আজকাল দেখি সবাই আমেরিকায়যাচ্ছে। আমিও যাবো এবার।”
(আড্ডায় উচ্চকিত হাসি।)
“(প্রথম বক্তা) না সত্যি। আসল ব্যাপারটা তোরা জানিস না। পার্থরবাবা হলো বিগ আরএসএস। বিজেপি। অটলবিহারী বাজপেয়ীর বন্ধু। আমি শুনেছি বাজপেয়ীকে ধরেছিলো ওর বাবা। লাইন করে চলে গেছে।”
(অন্যরা) “তাই নাকি, তাই নাকি?”
(দ্বিতীয় বক্তা) “জ্যোতিবাবুকে ধরেও যেতে পারে। মুক্তির বাবা তো সিপিএম। ওই গ্রামের কলেজ থেকে বেরোনোর জন্যে জ্যোতিবাবুকেও ধরতে পারে।”
(অন্যরা) “তাই নাকি, তাই নাকি, তাই নাকি?”
এসব সযত্নে গোপন করে রাখা কাহিনি আমরা শুনেছি আমেরিকায় প্রায় পঁচিশ বছর কেটে যাবার পর। ঘটনাচক্রে এসব পিএনপিসি আমাদের কানে এসেছে।
ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।
‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
