মেরিকামায়া সাতকাহন : আমেরিকার দুর্গাপুজো কাকে বলে, প্রথম দেখলাম সেন্ট লুইসে

ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ৩৭

সেন্ট লুইসে দুর্গাপুজো ১৯৮৮ কিংবা ১৯৮৯। মাঝখানে রত্না সিনহা

ষট্‌ত্রিংশ পর্বের পর

বার একটু পিছন ফিরে দেখি।

বহু বছর পর দুর্গাপুজো দেখার অবকাশ মিললো কার্বনডেলে চলে যাবার ঠিক আগেই। পিওরিয়ার হেমন্ত-প্রেমিক ভাস্কর মুখোপাধ্যায় ও তাঁর ফ্যামিলির সৌজন্যে। ওঁরা নিয়ে গেলেন আমাদের তিনজনকে, আর সঙ্গে করে সৌমিত্র ও রঞ্জনকে।

দুর্গাপুজোর কথাটা বলার খুব দরকার আছে এখানে এই স্মৃতিকথায়। কারণ, ওই যে দেশের স্মৃতিকথা ঘটিকাহিনিতে বলেছিলাম পুজোর সঙ্গে ধর্মের যত না সংযোগ, আমার মতো বাঙালিদের কাছে পুজোর হৈহৈ, দু একটা নতুন জামাপ্যান্ট, বাটার “পুজোয় চাই নতুন জুতো”, ছেলেবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে আর বড়ো হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে সারা কলকাতায় ঘুরে বেড়ানো, আড্ডা দেওয়া, আর হাজার প্যাণ্ডেলে গিয়ে ঠাকুর দেখার আনন্দ, গান শোনা, এখানে ওখানে সস্তার রেস্টুরেন্টে একটু কাটলেট আর মোগলাই পরোটা খাওয়া – এগুলোই আমার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল।

এই ঘুরে বেড়ানোর এখন নাম হয়েছে ‘প্যাণ্ডেল হপিং’। আমরা তখনও বাঙালি ছিলাম, তাই এসব নাম জানতাম না।

যখন মুক্তির সঙ্গে “ডেটিং” চলছে, অর্থাৎ সায়েন্স কলেজে পড়ার সময়ে, তখন পুজো দেখার জন্যে আমরা কলকাতার বাইরেও দু একবার গেছি – মনে আছে ব্যাণ্ডেল আর চুঁচুড়া শহরে একেবারে অন্যরকম পুজো দেখতে গিয়েছিলাম। তখনই লক্ষ্য করেছিলাম কলকাতার ফান-কেন্দ্রিক, নাচগান-কেন্দ্রিক (এবং প্যাণ্ডেলের সামনে পিছনে মদ্যপান-কেন্দ্রিক) পুজোর বাইরেও বাঙালি শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশে দুর্গাপুজো করতে জানে। শহরতলীর পুজোগুলো তখনও আজকের মতো কলকাতা-সর্বস্ব, আর কালো ব্যবসার কালো টাকার থীম পুজো হয়ে যায়নি। কলকাতার বারোয়ারি পুজোগুলোও আমরা দেশ ছেড়ে চলে আসার আগে পর্যন্ত এমন ভয়ঙ্কর অ-পুজোতে পরিণত হয়নি। সেসব হয়েছে আশির শেষ থেকে, এবং নব্বইয়ের শুরু থেকে। তখন আমরা পৃথিবীর উল্টোদিকে বাঁচবার লড়াই করে যাচ্ছি।

পঁচাশি, ছিয়াশি – এই দু’বছর আমি দুর্গাপুজো দেখিনি। দেখার কোনো উপায় ছিলো না। কারণ, নরমাল-ব্লুমিংটনে পুজো হতো না। ওখানে যে দু-চারজন বাঙালি থাকতো, তাদের পুজো দেখার তেমন কোনো উৎসাহ বা উদ্যম ছিলো না। আমাদের সেই আদ্যিকালের ভ্যালিয়েন্ট গাড়ি দূরে কোথাও যেতে পারতো না। এবং ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটিতে থাকার সময়ে যে প্রচণ্ড জীবনসংগ্রামের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে, তখন দূরে কোথাও যাবার কথা আমরা ভাবতেই পারতাম না।

তিনশো দুই নম্বর কিংসলি স্ট্রীটে সেই মিসেস হ্যারিসনের বাড়ির দোতলার ঘরে বসে চাঁদের আলোয় লক্ষ্মীপুজোর কথা ভেবেছি। আমাদের সেই বাড়িটার সামনে কয়েকটা ঝাউগাছ ছিল। তার মধ্যে দিয়ে পূর্ণিমার চাঁদ উঠতো। আমি ভাবতাম, “ঝাউয়ের পাতা ঝিরঝিরিয়ে ঘুমপাড়ানি গান গায়” – আর মনের দুঃখে ঘুমিয়ে পড়তাম। দুর্গাপুজোর সময়ে কোনো একদিন কলকাতার বাড়িতে ফোন করতাম দশ মিনিটের জন্যে, আর ফোনটা কানে চেপে ধরে পাড়ার পুজোর ঢাকের আওয়াজ শুনতাম। এই ছিল আমাদের বহুকালের প্রবাসী জীবন।

কিন্তু সাতাশিতে ভাস্করদা আমাদের নিয়ে গেলেন সেন্ট লুইসের পুজোতে। সেখানে গিয়ে আমরা নরমাল নামক গণ্ডগ্রামের কয়েকজন গায়ক গায়িকা – অর্থাৎ আমাদের হোস্ট, তার সঙ্গে পাণ্ডা আমি, আমরা এবং আমাদের তিন মাসের মেয়েকে বেঁধেছেঁদে, উলের চাদর ঢাকা দিয়ে। সৌমিত্র আর ওর বউ কাজল, আর আমাদের “পরমহংস” রঞ্জন, আরো সঙ্গে ভাস্করদার বউ রত্নাদি – হৈহৈ করে কয়েকটা গান গেয়ে এলাম। ঢেঁকি কী যেন একটা করে?

সেন্ট লুইসে দুর্গাপুজো ১৯৮৭। তবলায় আমি, গানে ভাস্কর মুখার্জী। হারমোনিয়ামে সৌমিত্র

মুক্তি দূরে বসে ছিল আমাদের মেয়েকে নিয়ে। ওরও গান গাইবার, আবৃত্তি করবার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু শিশুকন্যাকে কার কাছেই বা রেখে আসবে? কারুকেই তো চিনি না। 

দুপুরবেলা রওনা দিয়ে অনেক রাতে ভাস্করদার বিরাট ভ্যানে চেপে ফিরে এলাম আই এস ইউ’তে। ফেরবার পথে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা নরম অন্ধকারে গাড়ির স্টিরিওতে আবার হেমন্ত – “মুছে যাওয়া দিনগুলো আমায় যে পিছু ডাকে।”

নস্ট্যালজিয়ার নষ্টামো আর কাকে বলে! ধ্যাষ্টামোও বলা যায়।

অষ্টআশিতে কার্বনডেলের নতুন বান্ধবী রত্না সিনহা তাদের গাড়িতে আমাদের নিয়ে গেলো আবার সেন্ট লুইসের পুজোতে। দিনের বেলায়। এবারে সেখানে গিয়েই প্রথম ধারণা হলো আমেরিকায় বাঙালিরা কেমন করে দুর্গাপুজো করে, কেমন করে একটা ইস্কুল বাড়ি ভাড়া করে কেবলমাত্র উইকেণ্ডে পুজো হয়। কেমন করে সেখানে প্রায় একরকম লুকিয়েই উৎসব হয়, কারণ বাঙালি কমিউনিটির বাইরে কেউ আসে না, কারুকে ডাকা হয় না। আমেরিকানরা কেউ জানেই না দুর্গাপুজো কী। মিডিয়া কখনো আসে না এই বর্ণোজ্জ্বল উৎসবের খবর দিতে।

অবাঙালি বলতে কেবলমাত্র বাঙালিদের মার্কিনি স্ত্রী দু-একজনের, অথবা দক্ষিণ ভারতীয়। অধিকাংশ বাঙালি অসম্ভব প্যারোকিয়াল, অর্থাৎ শুধু নিজেদের মধ্যে মধ্যে থাকে, বাংলায় কথা বলে অন্যদের সামনেও, এবং বহিরাগত ওই দু চারজন যাঁরা আসেন, তাঁরা “ফিশ আউট অফ ওয়াটার” অনুভব করেন, এবং কিছুক্ষণ থেকে উঠে চলে যান। শ্বেতাঙ্গরা এলে খাতির পান। কৃষ্ণাঙ্গরা দৈবাৎ কেউ এলে পান না।

আমার অন্য এক স্মৃতিকথা “যে কলকাতাকে ভালোবেসেছি” বইতে আমি আমেরিকার বাঙালিদের দুর্গাপুজো নিয়ে বিস্তারিত লিখেছি। আপাততঃ এই অনুচ্ছেদে সেসব কথা স্থগিত রাখছি।

কিন্তু বহুকাল পরে দুর্গাপুজোর আনন্দ সারা শরীর মন দিয়ে উপভোগ করেছিলাম। সাতাশির দুর্গাপুজো হয়েছিল খুবই ক্ষণস্থায়ী – মাত্র কয়েক ঘণ্টা। নরমাল থেকে সেন্ট লুইস অনেক দূর, আর সঙ্গে বাচ্চা মেয়ে। ফলে, খুব বেশি সময় কাটানো যায়নি।

সেন্ট লুইস দুর্গাপুজো ১৯৮৭। গ্রুপে গান। মাঝখানে কাজল, তার পাশে রঞ্জন

কিন্তু অষ্টআশি একটু আলাদা। কার্বনডেল থেকে সেন্ট লুইস একশো মাইলের মধ্যেই – দুঘন্টার মধ্যেই যাওয়া যায়। আমাদের তখনও পক্ষীরাজ প্লীমুথ, ফলে নিজেদের পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। রত্না নিয়ে গেলো। এবারে সারাদিন সেখানে। আবার গান, নতুন অনেক বন্ধুর সঙ্গে আলাপ পরিচয়। সেন্ট লুইসে কার্বনডেলের তুলনায় দশগুণ বেশি বাঙালি। উজ্জ্বল শরৎকালের উজ্জ্বল সোনারোদ চারদিকে।

সেন্ট লুইস দুর্গাপুজোয় বাইরে সোনারোদ্দুরে আমরা কয়েকজন

আমরাও এস আই ইউ’এর ব্যাটেলিয়ন নিতান্ত ক্ষুদ্র নই। জ্ঞানদা, বিকাশদা-শিপ্রাদি এরা সব ছিল। নতুন পরিচয় হলো দিল্লির বাঙালি আমাদের ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের তরুণ প্রফেসর সুনন্দ সান্যালের সঙ্গে। আর সেন্ট লুইসে নতুন আসা গৌতম ও কথাকলি দেবনাথের সঙ্গে। এদের কথা আবার পরে মেরিকামায়ায় আসবে।

প্রফেসর জ্ঞান ভট্টাচার্য্য আমার মেয়ের পিছনে দাঁড়িয়ে

এবারে নতুন পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা হলো সেখানকার পুজোতে এক নতুন শিল্পীর গান ভালো করে শোনা। নাসীম তার বান্ধবী ইফফাত আরা’র গান শুনিয়েছিল আমাদের। রবীন্দ্রসঙ্গীতের আশৈশব অনুরাগী আমি বহু শ্রেষ্ঠ শিল্পীর গান শুনেছি রেডিওতে। সামনে বসে মুগ্ধ হয়ে শুনেছি স্বর্ণযুগের শিল্পীদের গান – হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, সুমিত্রা সেন, সাগর সেন, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবিনয় রায়।

কিন্তু বাংলাদেশের শিল্পীদের গান আমি কখনো শুনিনি আগে। দূর থেকে ভেসে আসতো কয়েকটা নাম সেই মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে – সানজিদা খাতুন, ফাহমিদা খাতুন। নজরুলগীতি শুনেছি আকাশবাণী কলকাতায় ফিরোজা বেগমের গলায়। কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনার সৌভাগ্য তেমন করে হয়নি কখনো। 

ইফফাত আরার গান শুনে ভেসে গেলাম। একটা অদ্ভুত বিষাদমাখানো গভীরতা তাঁর গলায়। হয়তো সুবিনয় রায়, সুমিত্রা সেন অথবা সুচিত্রা মিত্রের ধ্রুপদী ত্রুটিহীনতা তাঁর নেই। কিন্তু সে অভাব পূরণ করেছে তাঁর কণ্ঠের মায়াময় এক প্রশান্তি।

নাসীমের দেওয়া ক্যাসেট সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলাম সেন্ট লুইসের পুজোতে। কর্ণধারদের অনুমতি নিয়ে সেখানকার প্লেয়ারে চালিয়ে দিলাম। অনেকেই আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলো, কার গান, কার গান? পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি সে সময়ে বাংলাদেশের সম্পর্কে, তার সঙ্গীত সাহিত্য সংস্কৃতি সম্পর্কে কিছুই জানতো না প্রায়। আজকের মতো ঘরে ঘরে অদিতি মহসীন, শামা রহমান, রেজওয়ানা বন্যা, পাপিয়া সারওয়ার, মিতা হক তখনও আসেননি।

আমার মনে হয়েছিল, আমার মতোই ইফফাতের গান সবার ভালো লাগবে। কিন্তু লাগেনি। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি বিশালভাবেই নিজেদের গণ্ডীর বাইরে আর কিছু জানতে চায় না।

দু এক বছর পরের কথা।

আমি তখন এস আই ইউ’তে পিএইচডি গবেষণা অনেকটা শেষ করে ফেলেছি। একটা বৈজ্ঞানিক কনফারেন্সে রিসার্চ পেপার পড়ার জন্যে গিয়েছিলাম সেন্ট লুইসে। তখন আমাদের “নতুন” গাড়ি পঁচাশি মডেলের নিসান সেন্ট্রা। সঙ্গে গিয়েছিলো আমাদের ল্যাবের নতুন ছাত্র টিম এটিনজার। শ্বেতাঙ্গ মার্কিন যুবক – আমারই বয়সী।

আমাদের নতুন নিসান সেন্ট্রা গাড়ি

সান্ডবার্গের প্রথম পিএইচডি ছাত্র আমি। তারপরেই টিম। যদিও পরে শুনেছিলাম ভাগ্যলক্ষ্মী তার প্রতি সদয় হননি। কম্প্রিহেন্সিভ পরীক্ষায় পাশ করতে না পেরে সেই মঞ্জুলার মতোই তাকে চলে যেতে হয়েছিল।

ঠিক সেই একই সময়ে সেন্ট লুইসের দুর্গাপুজো। এক ঢিলে দুই পাখি মারার সুবর্ণ সুযোগ।

=আমাকে থাকতে হবে সেখানে দিন দুয়েক। একটা দিন পুজো দেখে বউকে আর মেয়েকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম কোনো এক বন্ধু পরিবারের সঙ্গে। আমি থেকে গেলাম। পরের দিন কনফারেন্সে পেপার পড়ে টিমকে নিয়ে ফিরবো।

অনেক রাতে আমি আর টিম জনশূন্য মিসৌরির রাস্তা দিয়ে ফিরছি। টিম আমার পাশে বসে ঢুলতে ঢুলতে ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি গাড়ি চালাচ্ছি।

এক মুহূর্তের জন্যে চোখটা বুজে এসেছিলো। গাড়িটা রাস্তা থেকে স্লিপ করে কাঁচা ঢাল দিয়ে নেমে পাশের শুকনো জমিতে গড়িয়ে পড়লো। আমার ঘুম ভেঙে গেলো এক ঝটকায়। শেষ চেষ্টায় মনকে সংযত করে, সমস্ত শিক্ষা প্রয়োগ করে গাড়িটা সোজা করে রেখে থামানোর চেষ্টা করলাম। একটা পাক ঘুরে কীসে যেন ধাক্কা খেয়ে গাড়িটা থেমে গেলো।

একটা অদ্ভুত শব্দ। ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলো।

টিমও উঠে পড়েছে সে ঝাঁকুনিতে। ডাকছে আমাকে, “পার্থা, পার্থা, হোয়াট, হোয়াট?”

(চলবে)

*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।

ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।

‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

Developed by DXDasia