মেরিকামায়া সাতকাহন : আমেরিকায় গাড়ি ছাড়া এক পাও চলবে না

ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ১৫

নির্জন হাইওয়ে ইন্টারস্টেট ৫৫ – এখানে গাড়ি খারাপ হয়ে গেলে কী যে হবে!

চতুর্দশ পর্বের পর

“হবে জয়, হবে জয়, হবে জয় রে, ওহে বীর, হে নির্ভয়…”

অ্যান্ডারসনের ইকোলজি পরীক্ষায় পঁচানব্বই পেয়ে, আর লাইবারটার প্ল্যান্ট প্যাথলজিতে ফোর-পয়েন্ট-ও গ্রেড করে মনটা ভালো হয়ে গেলো একটু। সহছাত্র ও ছাত্রীরা অন্য চোখে তাকায় আমার দিকে। জানে, আমি ইন্ডিয়া থেকে আসা একটা ভালো ছাত্র। সে আমার পোশাক আর চুলদাড়ি যতই ফ্যাশনবিরুদ্ধ হোক না কেন। দাড়ি রাখতে আরম্ভ করেছিলাম মেয়ে জন্মানোর পর থেকেই। কেন জানি না, মনে হলো, আমার একটা দাড়ি দরকার। রবীন্দ্রনাথ তো হতে পারবো না। অন্ততঃ যদি উপেন্দ্রকিশোর হই।

কিন্তু, বাবরি চুল রাখলেই যদি নজরুল ইসলাম হওয়া যেতো! পঁচানব্বই বছর বাঁচলেই যদি হওয়া যেত নোম চমস্কি! লাঠি হাতে ছাতা মাথায় হাঁটলেই যদি কেউ হতো বিদ্যাসাগর!

সেই মেঘের আড়াল থেকে ভেসে আসা গম্ভীর গলায় “ইটস আ মেস, ইটস আ মেস” দুঃস্বপ্ন একটু একটু করে কেটে যেতে লাগলো। ভয় কেটে যেতে লাগলো। মনে হতে লাগলো, হ্যাঁ, ভুল করেছিলাম, জানতাম না সবকিছু। কিন্তু তাতে আমার জীবন শেষ হয়ে যায়নি। ভুল সংশোধন করে নিয়েছি। সামলে নিয়েছি। লাইবারটা বুঝেছেন, ছেলেটা আসলে বোকা নয়। নতুন করে আবার সেই রিসার্চ শুরু করতে হলো। একটু বেশি কষ্ট করতে হলো, এই যা।

এম এস শেষ করতে যা সময় লাগবে ভেবেছিলাম, তার চেয়ে ছ’মাস বেশি লাগলো। তার মধ্যে বাড়িতে এতো বড়ো ঘটনা। বাচ্চাকে নিয়ে, বউকে নিয়ে। শেষে একটা সিমেস্টার স্কলারশিপ থাকলো না। অর্থনৈতিক দুরবস্থা সামাল দিতে স্টুডেন্ট সেন্টারের রেস্টুরেন্টে কাজ নিতে হলো একটা। হেলথ ইন্স্যুরেন্স বজায় রাখার জন্যে ডিপার্টমেন্টে প্যারাসিটোলজি, আরো কী কী সব কোর্স অডিট করতে হলো। অর্থাৎ, নিয়মরক্ষার জন্যে ক্লাস নেওয়া। পরীক্ষায় বসলেও চলে, না বসলেও চলে।

আইএসইউ’এর স্টুডেন্ট সেন্টার ক্যাফেটেরিয়া – এখানেই দুটো এক্সট্রা ডলারের জন্যে রাতে কাজ করতাম

এসব করার জন্যে এর কাছে তার কাছে একটু দয়াদাক্ষিণ্য যে ভিক্ষা করতে হয়নি, তা নয়। দয়াদাক্ষিণ্য মানে আর কিছু নয়, প্রফেসরদের অনুমতি।

এন্ডারসনের পেপার অবশ্য অনেকদিন পরে হয়েছিল। তখন আমি পিএইচডি’তে শেষ পর্যন্ত ভর্তির সুযোগ পেয়ে নরম্যাল-ব্লুমিংটন থেকে আড়াইশো মাইল দূরে সাদার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে চলে গেছি। সেখানে পৌঁছোনোর কয়েক সপ্তাহ পরেই আমাদের প্ল্যান্ট বায়োলজি ডিপার্টমেন্টের আর এক মাইকেল আমাকে ডেকে বললো, “হে পার্থা, গ্রেট জব ম্যান। গ্রেট পেপার।”

আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। তার ওপরে আবার সাদার্ন ইলিনয়তে রীতিমতো দক্ষিণী অ্যাকসেন্ট। যাকে বলা হয় সাদার্ন ড্রল। আর একটা নতুন প্রজাতির আমেরিকান ইংরিজি একটু একটু করে শিখতে হচ্ছে। মাইকেল তখন একটা জার্নাল নিয়ে এসে আমাকে দেখালো। প্রসিডিংস অফ ইলিনয় একাডেমি অফ সায়েন্স। লিটল ব্লুস্টেমের ওপর পরিবেশ ও জমিতে জল সরবরাহের তারতম্যহেতু উদ্ভিদের কী কী ফেনোলজিক্যাল তফাৎ হয়, অর্থাৎ ফুল ফোটার সময়, ফুলের সংখ্যা ও মান, উদ্ভিদের ওজন, ইত্যাদি। ক্লাইমেট চেঞ্জ সম্পর্কে একটা মাইক্রো রিসার্চ। দেখি, রজার অ্যান্ডারসনের নামের পাশে পার্থা ব্যান্ডিওপাডিআইই নামটাও রয়েছে।

ব্যান্ডিওপাডিআইই অবশ্য কেউ বলতো না আমাকে ওখানে। দাঁত ভেঙেযাওয়া নাম আমেরিকায় কেউ উচ্চারণ করে না। এখানে নামটাম সব এক সিলেবল। রিক, নিক, ভিক, ডিক, রিচ, টিম, পল, শন। মেয়েরা আর একটু জটিল — মেরি, চেরি, ট্রেসি, কেসি, আর খুব বেশি হলে স্যামান্থা যা হয়ে যাবে স্যাম, ভিভিয়েন যা হয়ে যাবে ভিভ, আর আমাদের রাণীর নাম এলিজাবেথ তো আছেই যা অবশ্যই হয়ে যাবে লিজ অথবা বেথ – যে যা চায়। লাস্ট নেম নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।

তাছাড়া, আমেরিকায় হাজার দেশ থেকে আসা হাজার নামের ছাত্রছাত্রী। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই, যেখান থেকে আমেরিকায় ইমিগ্রেন্টরা আসেনি। সুতরাং, আমার কাছে ব্যান্ডিওপাডিআইই যতই ভীষণ ইয়ে হোক না কেন, ওদের তাতে কিছুই আসে যায় না। তোমার একটা নাম আছে, ব্যস। নাম নিয়ে ঢ্যামনামি আমাদের দেশে যত আছে, তা বোধহয় আর কোথাও নেই। প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী বা শিক্ষামন্ত্রী পদে ঢোল, মাকাল, কাঁড়ার তো দূরের কথা, মণ্ডল, মাইতি, গিরি, জানা, ওঁরাও, টুডু, মুর্মু আমাদের তথাকথিত বামপন্থী আন্দোলনের স্বর্ণযুগেও শুনিনি আমরা। যাক গে, পাঠকরা সাবধান করে দিয়েছেন স্মৃতিকথা মোটেই আমার বোরিং রাজনৈতিক প্রবন্ধ নয়, স্মৃতিকথা হলো সুখপাঠ্য সাহিত্য। সুতরাং, কচকচি যেন আমি বেশি না করি। তাই, এখানেই থামলাম।

তবে, ব্যান্ডিওপাডিআইই’এর বোঝা কমানোর জন্যে পরে আমাকে আর মুক্তিকে কোর্ট এফিডেভিট করে অফিসিয়ালি ব্যানার্জী করে নিতে হয়েছিল। সে অবশ্য আরো কয়েক বছর পরের কথা।

এর মধ্যে মনে রাখার মতো ঘটনা আর কী ঘটেছে?

স্মৃতি যদি তঞ্চকতা না করে থাকে, তাহলে গর্ডনের বিয়ের কথাটা বলি। আর ও হ্যাঁ, আমাদের সেই প্রথম গাড়ি কেনার কথা। মুক্তির এ্যাডভান্সড প্রেগনেন্সির সময়ে সবাই পরামর্শ দিলো, যে করেই হোক একটা গাড়ি তোমরা এবার কেনো। কারণ, ওই যে আগেই বলেছি, আমেরিকায় গাড়ি ছাড়া এক পাও চলবে না। সে তুমি রাত্তির দশটার সময়ে যদি দুধ কিনতে যাও, বা দিনের বেলা হঠাৎ যদি তোমার বাচ্চার ডাইপার ফুরিয়ে যায়। বাস টাস কিছু নেই এখানে। ট্যাক্সি চড়ার পয়সা নেই। সুতরাং, যে করেই হোক একটা গাড়ি কেনো। এদেশে খুব কম দামে পুরোনো গাড়ি কিনতে পাওয়া যায়।

সৌমিত্র ঘোষ রায় একটা নীল রঙের পুরোনো ফোর্ড গাড়ি কিনলো আমাদের স্টুডেন্ট নিউজপেপার দ্য ভিডেট’এর বিজ্ঞাপন দেখে। আর আমি কিনলাম, হাসবেন না, নাইনটিন সিক্সটি-ফাইভ মডেলের একটা রং জ্বলে যাওয়া ডার্ক ব্রাউন প্লীমুথ ভ্যালিয়েন্ট গাড়ি। এক সদাশয় বৃদ্ধ মার্কিন দম্পতি বোধহয় আমাদের অবস্থা দেখেই আরো কম দামে গাড়িটা দিয়ে দিলেন।

সে সময়ে আমেরিকার অর্থনৈতিক অবস্থা এখনকার মতো এতো শোচনীয় হয়ে যায়নি (এই রে, আবার প্রবন্ধ হয়ে যাচ্ছে), সুতরাং বাড়ির গ্যারেজ খালি করার জন্যেই তাঁরা গাড়িটা যাকে বলে গেট রিড করে ফেললেন। গুণে দেখলাম, হ্যাঁ চারটে চাকা আছে। ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখলাম, হ্যাঁ, একটা স্টিয়ারিং আছে, ব্রেক টেক সবই আছে। এমন কী, সীটগুলোও ছোবড়া বা তুলো বের করা নয়। ওই একটু শকটা যা একটু শকিং। উঁচুনিচু জায়গায় পড়লেই বিশাল ক্যাঁচক্যাঁচ করে ওঠে। তা, মন্দ কী – দুশো পঁচাত্তর টাকায় (ডলারে) একটা আস্ত গাড়ি। আর কী চাও তুমি? রোলস রয়েস?

ঠিক সেইরকম একটা প্লীমুথ ভ্যালিয়েন্ট গাড়ি – এই গাড়িটা অবশ্য আমাদের নয়

তার আগেই অবশ্য লিসা হ্যারিসের মাস্টারনীর দৌলতে, এবং শিকাগোতে বেড়াতে গিয়ে বিশ্বদার আরো কিছু হাতেকলমে টিপসের সৌজন্যে নরম্যাল নামক অতি ক্ষুদ্র শহরের মোটর ভেহিকলস ডিপার্টমেন্টে গিয়ে ড্রাইভিং টেস্ট, এবং এক চান্সেই পাশ করে যাওয়ার মতো রোমহর্ষক ঘটনা ঘটে গেছে। ইয়ালাগালাগাড়ি গোবিন্দা রাও আর সব এক বছরের পুরোনো ভেটারান ছাত্রদের কাছে পরীক্ষার সাজেশন – ড্রাইভিং টেস্ট সম্পর্কে। এখন আমার একটা রীতিমতো ইলিনয় রাজ্যের ড্রাইভার্স লাইসেন্স আছে। হুঁ হুঁ বাবা, ইয়ার্কি নয়!

হৃদয়, এবং পকেট, নিংড়ে দুশো পঁচাত্তর ডলার গুনে গুনে দিলাম বৃদ্ধের হাতে। “গুড লাক” বলে বিদায় সম্ভাষণ জানালেন তাঁর স্ত্রী। হাত ঝাঁকিয়ে দিলেন বৃদ্ধ।

চাবি ঘুরিয়ে দেখি গাড়ির ইঞ্জিন বিউটিফুলভাবেই অভ্যর্থনা করলো। বউ এবং সঙ্গে যারা গিয়েছিলো গাড়ি কেনার সেই আশ্চর্য্য মুহূর্ত শেয়ার করার জন্যে, তাদের নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। পার্টি দেওয়া হয়েছিল কি সে রাতে? হতেই হবে। মুক্তি থাকবে, বন্ধুরা থাকবে, আর রান্না হবে না – তা কি হয়?

তিন সপ্তাহ পরে গর্ডন বললো, সে নাকি তার ফিয়াঁসী, অর্থাৎ বাগদত্তাকে বিয়ে করতে চলেছে। যেহেতু আমার এখন গাড়ি আছে, আমি যেন চলে যাই নরম্যাল থেকে আধঘন্টা ড্রাইভ করে তার বাড়িতে। কী যেন জায়গাটার নাম। লিংকন না কী যেন। খুবই কাছে। সেখানে বাড়ির ব্যাকইয়ার্ডে কেবলমাত্র আংটি বদল করে বিয়ে হবে। রেজিস্ট্রি ম্যারেজ যাকে বলে। আর নিমন্ত্রণ জানানো হয়েছে খুব কম কুড়ি পঁচিশজনকে।

ভাগ্যিস মুক্তিকে ওই অবস্থায় সঙ্গে নিয়ে যাইনি। আই-ফিফটি ফাইভ নামক হাইওয়েতে আমাদের সেই বিশাল ক্যাঁচক্যাঁচে গাড়ি হেঁচকি তুলে জবাব দিলেন।

তখন সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসছে।

(চলবে)

*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।

ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।

‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

Developed by DXDasia