রবীন্দ্রনাথের লেখালেখিতে প্রান্তিক কণ্ঠস্বর, শ্রেণিসংগ্রামের ছায়া

রবীন্দ্রনাথের অনেক ছোটোগল্পেই প্রতিনিধিত্ব করেছে প্রান্তিক শ্রেণি

‘সমাজ’ শব্দটিকে ভাঙলে ও তার শব্দরূপ বিশ্লেষণ করলে হয় — ‘সম্-অজ্+অ(ঘ‌ঞ্)’। ‘সম্’ এখানে উপসর্গ, যা ‘একত্রে’ বা ‘সমানভাবে’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে; অন্যদিকে ‘অজ্’ হচ্ছে ধাতু, যার মানে ‘গমন করা’ বা ‘চলা’ এবং ‘অ(ঘঞ্)’ হল কৃৎ প্রত্যয়। এখন এইসব মিলিয়ে যে-শব্দটি তৈরি হল, ‘সমাজ’, তার চলনসই একটি মানে করলে দাঁড়ায়: এমন একটি স্থান, যেখানে সবাই সমানভাবে চলে বা সংহত হয়। (রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্প)

কিন্তু এই শব্দতত্ত্বের বাহুল্য ত্যাগ করে ভাবলে প্রশ্ন আসবে, ‘সবাই কি সমানভাবে চলে বা চলতে পারে?’ আর উত্তর স্বাভাবিকভাবে ‘না’ হবে। এখন কথা হচ্ছে, এই সমানভাবে চলার ব্যাপারটি কাদের উদ্দেশ্য করে ভাবা হচ্ছে? মানুষ? কিন্তু মানুষ তো তেমন নয়, কেন না, মানুষের মধ্যে অবস্থানগত বিভেদের বহুবিধ উপাদান এই সমাজেই বর্তমান। যার মধ্যে বিত্ত (অর্থাৎ, টাকাপয়সা, অর্থ, সম্পত্তি) রয়েছে, তেমনই জাতিগত বৈষম্য ও আধিপত্য রয়েছে। ফলে সমাজ দৃশ্য বা অদৃশ্যভাবে টুকরো হয়ে আছে নানাভাবে। এই যে বিভেদ বা আধিপত্য, তা একজন আরেকজনকে, এক শ্রেণি আরেক শ্রেণিকে বিপর্যস্ত করে, প্রান্তিক করে তোলে পীড়ন ও শোষণের মাধ্যমে। পাশাপাশি শোষিত মানুষ অথবা শ্রেণিটিকে নিজের অস্তিত্বের অবস্থান ক্ষয় ও খর্ব করে ক্রমশ inferior করে অবশেষে মূল ধারা থেকে ছিটকে ফেলে; যা তাদের অস্তিত্বকে বিপন্ন তো করেই উপরন্তু একটি আত্মগ্লানি এবং ততোধিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাতে বাধ্য করে নিজেদেরই। (রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্প)

ফলে মূল ধারা থেকে, নিজস্ব অবস্থান ও অস্তিত্ব থেকে ছিটকে বা outcasted হয়ে তারা সমাজের মূল আলোর পরিমণ্ডলের বাইরের প্রান্তে চলে যায়, যা তাদের বিপন্নতার পরিচায়ক হয় ও কোথাও যেন ‘endangered species’-এর মতো সংরক্ষণ দাবি করে বসে অজান্তেই। এই যে ‘প্রান্তিকতা’ বা marginalisation, তার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ‘দি এনসাইক্লোপিডিয়া অফ পাবলিক হেল্থই’ সেই কথাটাই লিখছে। অবশ্য তাতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে: ‘privilege and power found at the center’। সংজ্ঞাটি হল — “Marginalization as to be marginalized is to be placed in the margins as thus excluded from the privilege and power found at the center.” এই যে ‘ক্ষমতা’, তার অস্তিত্ব এবং তার প্রয়োগ, তা মিশেল ফুকোর তত্ত্ব অনুযায়ী ‘pervasive’ এবং ‘relational’; এবার এর যে ‘exercise’, তার oppression থেকে রক্ষার জন্য যে ‘resistance’, তা-ই পাওয়া যায় সাহিত্যে। সেটা চরিত্র, ভাষা, উপস্থাপনা ইত্যাদির দ্বারা। আমরা যদি রবীন্দ্রনাথের লেখাগুলির দিকে সূক্ষ্মভাবে তাকাই ও পর্যালোচনা করি, তাহলে তা বুঝতে পারব। সমাজের কর্মপীড়িত জীবনের নানাবিধ শ্রেণির অবস্থান ও বক্তব্য থেকে পাব। বিষয়টি স্পষ্ট করে বোঝার জন্য আমরা তাঁর কয়েকটি ছোটোগল্পের দিকে নজর দিতে পারি এবং তার প্রেক্ষিত বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারি। (রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্প)

এক্ষেত্রে বলতেই হয় — যেহেতু ছোটোগল্প, এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore) বাংলা ছোটোগল্পের প্রথম পরিচয়দাতা, সেক্ষেত্রে সার্থক ছোটোগল্পের যেক’টি বৈশিষ্ট্য বর্তমান, সেগুলির অবস্থান খুব জোরালো। সেসব বুঝে নিতে পাঠককে বেশ কিছুটা প্রণোদিত হতে হবে, তেমনই একটা undercurrent বা গল্পের deceiving propension-টিকে কোনওভাবেই এড়িয়ে গেলে চলবে না। (রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্প)

প্রথমেই যদি ‘সমস্যাপূরণ’ গল্পটি ধরি, সেখানে দেখা যাবে ঝিঁকড়াকোটার পূর্বের জমিদার কৃষ্ণগোপাল এবং তাঁর পুত্র বিপিনবিহারীর মধ্যে যে ক্ষমতা এবং শোষণের মানসিকতার দ্বন্দ্ব, তাতে সাধারণ পীড়িত প্রজার অবস্থা কীভাবে ফুটে উঠছে। এখানে যে-দুই কেন্দ্রীয় চরিত্রকে পাওয়া যাবে, তাঁরা হলেন অছিমদ্দি ও তাঁর মা মির্জাবিবি। যেখানে কৃষ্ণগোপাল প্রজাপালক ও দানী ছিলেন, সেখানে তাঁর পুত্র জমিদারি প্রথার নগ্ন নিপীড়ক রূপকে তুলে ধরে, যে যেকোনও মূল্যে দান করা যেকোনও ভূমির অংশ কেড়ে বা অন্যান্য খরচ বন্ধ করে ব্যয় সংকোচ ও নিজের কোষ মজবুত করতে চায়। এই যে অন্যায় জমি কেড়ে নেওয়ার, ভূমিহীন করার চক্রান্ত ও তার বিরুদ্ধে অছিমদ্দির সাহসী ও বেপরোয়া প্রতিবাদ এবং তার মামলা আদালত পর্যন্ত গড়িয়ে যাওয়া, হার না-মানা, ‘শেষ দেখে ছাড়া’-র মতো মনোভাব, তা কিন্তু মানুষের প্রতিরোধ ও শেষসম্বলকে আঁকড়ে বাঁচার চেষ্টা করার প্রতীক।

যেহেতু ছোটোগল্প, এবং রবীন্দ্রনাথ বাংলা ছোটোগল্পের প্রথম পরিচয়দাতা, সেক্ষেত্রে সার্থক ছোটোগল্পের যে-কটি বৈশিষ্ট্য বর্তমান, সেগুলির অবস্থান খুব জোরালো।

‘শাস্তি’ গল্পের দুখিরাম রুই এবং ছিদাম রুই হতভাগ্য, হতদরিদ্র, নিষ্পেষিত মানুষদের প্রতিনিধি। সেইসঙ্গে কী চূড়ান্ত অমানবিক বিভীষিকাময় তাদের বেঁচে-থাকা, তা বুঝে নিতে এই গল্পের কিছু লাইন উল্লেখ করা যাক।

‘কেবল কাছারি হইতে পেয়াদা আসিয়া এই দুই ভাইকে জবর্দস্তি করিয়া ধরিয়া লইয়া গেল। …তাহারা সমস্ত দিন খাটিয়াছে। বাড়ি আসিতে পায় নাই, কাছারি হইতেই কিঞ্চিৎ জলপান খাইয়াছে। মধ্যে মধ্যে বৃষ্টিতেও ভিজিতে হইয়াছে – উচিতমত পাওনা মজুরি পায় নাই, এবং তাহার পরিবর্তে যে-সকল অন্যায় কটু কথা শুনিতে হইয়াছে, সে তাহাদের পাওনার অতিরিক্ত।’

উপরোক্ত লাইনগুলি মানুষদের দৈনন্দিন অবস্থা সম্পর্কে বুঝিয়ে দিচ্ছে। এরকম আরও কিছু গল্পের উদাহরণ দেওয়া যায়। ‘জয়পরাজয়’ গল্পের দাসী মঞ্জরী, ‘মাল্যদান’ গল্পের মালী ধনা, ‘জীবিত ও মৃত’ গল্পের বিধু বা ‘দালিয়া’ গল্পের রহমত আলি ও এমনই অসংখ্য বিভিন্ন পেশায় খেটে খাওয়া চরিত্ররা এক বিপুল পুঞ্জ তৈরি করেছে, যা ধারণ করেছে, উপস্থাপন করেছে এবং সেইসঙ্গে প্রতিনিধিত্ব করেছে প্রান্তিক শ্রেণিরই।

এর সঙ্গে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয়কে জুড়ে দিতেই হয়; তা হল নারীদের অবস্থান ও তাদের বিস্তৃত বর্ণনা। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, ‘প্রান্তিকতা’-র মধ্যে নারীরা কীভাবে আসতে পারে? পারে। আমরা যদি প্রথাগত সমাজের ইতিহাসের দিকে তাকাই, তাহলে বুঝতে পারব, অধিকার খর্ব করা থেকে শুরু করে হাজার দায়িত্ব, বিধিনিষেধের নাগপাশে আবদ্ধ করার মাধ্যমে তাদেরকে সবদিন কোথাও যেন প্রকৃতঅর্থে মানুষ নয়, ‘মনুষ্যেতর’ কোনও প্রাণী করে রেখেছে। ফলে এই যে তাদের মানসিক অবস্থা, শোষণ-পীড়ন, ভাষাহীন ক্রন্দন, সেসবের ব্যাহৃতি ও মোচন ঘটেছে একাধিক গল্পে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক –

আমরা যদি ‘দেনাপাওনা’ গল্পটিই ধরি, দেখতে পাব, নতুন বৌ নিরুপমা অপমানে-মৌখিক অত্যাচারে লাঞ্ছিত হয়ে যখন মারা গেল, তখন সেই মৃত্যুতে সামান্যতম শোক বা অনুশোচনা বা আত্মগ্লানিতে ভোগার বদলে তার শ্বাশুড়ি তার ছেলেকে পুত্রবধূর মৃত্যু সম্পর্কিত চিঠিতে লিখছেন: “বাবা তোমার জন্যে আর-একটি মেয়ের সম্বন্ধ করিয়াছি, অতএব অবিলম্বে ছুটি লইয়া এখানে আসিবে।” এর কারণ, মনোনীত মেয়েটির বাড়ি থেকে বিশ হাজার টাকা পণ হাতে-হাতে আদায় হবে। অন্যদিকে মৃত বড়ো বৌ নিরুপমার পিতৃগৃহ থেকে দশহাজার টাকা পণ চাওয়া হয়েছিল, যা তাঁরা দিয়ে উঠতে পারেননি। এর থেকেই আমরা বুঝব, নারীদের ঠিক কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা হত।

‘জয়পরাজয়’ গল্পের দাসী মঞ্জরী, ‘মাল্যদান’ গল্পের মালী ধনা, ‘জীবিত ও মৃত’ গল্পের বিধু বা ‘দালিয়া’ গল্পের রহমত আলি ও এমনই অসংখ্য বিভিন্ন পেশায় খেটে খাওয়া চরিত্ররা এক বিপুল পুঞ্জ তৈরি করেছে, যা ধারণ করেছে, উপস্থাপন করেছে এবং একইসঙ্গে প্রতিনিধিত্ব করেছে প্রান্তিক শ্রেণিরই।

রবীন্দ্রনাথের অনপনেয় ভঙ্গি, অনুভব, বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে তাঁর লেখা স্থান পেয়েছে প্রায় প্রতিটি ভাষায়। কখনও মূল ভাষায় কখনও অনুবাদের মাধ্যমে। আর সবচেয়ে বড়ো জয় মনে হয় তখনই, যখন প্রতিটি দিন তাঁর লেখা প্রাণ পাচ্ছে শুধু তা-ই নয়, প্রাণ দিয়ে চলেছে অসংখ্য স্বপ্ন, অসংখ্য সম্ভাবনাকে। এমনই এক উদাহরণ দিয়ে এই লেখার ইতি টানা যেতে পারে, আর তা হল ‘গিতেক নেহর’।

এটি কী? এটি হল বিশ্বজয়ের অনুবাদ। রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের কুড়মালি ভাষায় হওয়া প্রথম অনুবাদ। যখন দেখা যায়, বাংলা ভাষার প্রতি সেই ভাষাভাষী মানুষদেরই অনীহা, তখন তথাকথিত মূল ধারা বা ‘বাবু’-সম্প্রদায়ের মুখের ভাষার বাইরে গিয়েও এই যে তথাকথিতভাবে অন্ত্যজ, প্রান্তিক মানুষদের কাছে এমন একটি গ্রন্থ তাঁদের নিজস্ব ভাষায় অনূদিত হচ্ছে, যা পরবর্তী প্রজন্মকে প্রলুব্ধ করবে আকরের সন্ধানে নামতে, তা তো আনন্দের, আশার এবং বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়েও আকাশজয়ের সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখায়; তাই নয় কি?
 

Developed by DXDasia