
অনেকে ভেবেছিলেন, সুনীল ইচ্ছে করেই এটা করেছেন, যদিও তাঁর বইতে সুনীল জানিয়েছেন, ব্যাপারটা ইচ্ছাকৃত ছিল না
সিগনেট প্রেসের কর্ণধার দিলীপকুমার গুপ্ত বা ডিকের পরামর্শে এবং সক্রিয় সহযোগিতায় ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার যাত্রা শুরু হয়েছিল, যে পত্রিকার প্রাণপুরুষ ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সেই সূত্রে দিলীপকুমার গুপ্তের সঙ্গে এক হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল সুনীলের। ডিকে একদিন সুনীলকে প্রস্তাব দিলেন পত্রিকার বাইরে তরুণদের নিয়ে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য। সেখানে গান, কবিতা-পাঠ, সাহিত্য নিয়ে বিতর্ক, সব কিছুরই ব্যবস্থা থাকবে। সুনীল তো এক কথায় রাজি।
কিন্তু প্রতিষ্ঠানের নাম কী হবে? নামের ব্যাপারে পরামর্শ করার জন্য সুনীলকে ডিকে পাঠালেন তখনকার বাঙালি সংস্কৃতির জ্যোতিষ্কদের কাছে। নীহার রঞ্জন রায়, আবু সয়ীদ আইয়ুব, বুদ্ধদেব বসু, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শম্ভু মিত্র – এঁরা কেউই সুনীলকে চিনতেন না, সুনীলের বয়স তখন কুড়িরও কম। তবে সিগনেট প্রেসের দিলীপ গুপ্ত পাঠিয়েছেন শুনে কেউ তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেননি। যদিও এঁরা কেউই প্রতিষ্ঠানের নাম দিতে পারেননি, শেষ পর্যন্ত ডিকেই নাম দিলেন – ‘হরবোলা’। সভাপতি হলেন দিলীপকুমার দত্ত, সুনীল হলেন সম্পাদক, এবং তাঁর বন্ধুবান্ধবরা অনেকেই সদস্য হয়ে গেলেন।
হরবোলার প্রথম অধিবেশনে এলেন কমলকুমার মজুমদার। ডিকে সবার সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে জানালেন, তিনি হবেন নাট্য পরিচালক। এর আগে সুনীল তাঁর সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। যদিও বাংলার সংস্কৃতি মহলে ততদিনে কমলকুমার বেশ পরিচিত। প্রথম নাটক ঠিক হল ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’। কমলকুমার ঘোষণা করলেন, মহড়া শুরুর আগে সবাইকে উচ্চারণ চর্চা ও গান শিখতে হবে। গান শেখানোর জন্য ডিকে নিয়ে এলেন দু’জনকে – জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র এবং সন্তোষ রায়। কবি জ্যোতিরিন্দ্র ছিলেন গায়ক ও সুরকার। তাঁর গাওয়া রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ড ছিল। আর ওস্তাদ ফৈয়জ খানের শিষ্য সন্তোষ রায় ছিলেন উচ্চাঙ্গ সংগীতের শিক্ষক। কয়েকমাস গান শেখার পর শুরু হল মহড়া। তারই অবসরে চলত আড্ডা। কমলকুমার ও জ্যোতিরিন্দ্রর ছিল অফুরন্ত গল্পের ভাণ্ডার। আর বিদেশি সাহিত্যের ডালি খুলে বসতেন ডিকে স্বয়ং।
এর আগে সুনীল একবারই মঞ্চে অভিনয় করেছিলেন, সিটি কলেজে পড়ার সময়ে। সহ-অভিনেতা ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, যিনি ছিলেন কলেজে সৌমিত্রের থেকে এক বছরের জুনিয়ার। গলসওয়ার্দির ‘অ্যান ইনস্পেকটর কল্স’ নাটকে ভাবানুবাদটির মঞ্চায়নে সৌমিত্রের তুলনায় সুনীলের ভূমিকা ছিল বড়ো। যদিও সুনীলের জন্যই নাটকটি ডুবে যায়। সে আরেক গল্প।
‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’ নাটকের স্টেজ রিহার্সাল হয়েছিল দেড় মাস ধরে প্রতিদিন, যাতে অভিনেতাদের মঞ্চভীতি কেটে যায়। সিগনেট প্রেসের বাড়ির সামনে লনে কলকাতার সেরা ডেকরেটরদের দিয়ে মঞ্চ বানানো হয়েছিল দেড় মাস আগেই। নাটকের পোশাক নিয়ে কমলকুমারের নিজস্ব ভাবনা ছিল। রামকে পরানো হয়েছিল সবুজ অয়েল ক্লথ দিয়ে বানানো গাছের পাতার মতো সাজের পোশাক। বিভীষণের গায়ে ছিল গলায় গিঁট বাঁধা আলোয়ান। সুনীল ছিলেন জাম্বুবানের চরিত্রে, তাঁর হাতে ধরা থাকত হুঁকো।
নাটকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল কলকাতার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের। কোনো টিকিট ছিল না। নাটক জমে গিয়েছিল, কলকাতার নামজাদা পত্রিকাগুলোয় বেরিয়েছিল তার প্রশংসা।
হরবোলার দ্বিতীয় নাটক ছিল ‘মুক্তধারা’। এর আগে কখনও নাটকটির পূর্ণাঙ্গ অভিনয় হয়নি। কমলকুমার চেয়েছিলেন, নাটকের একটি শব্দ বা চরিত্রও বাদ দেওয়া হবে না, তাঁরাই হবেন এই নাটকের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মঞ্চায়নের দাবিদার। এই নাটকে যন্ত্ররাজ বিভূতির চরিত্র পেয়েছিলেন সুনীল। বছরখানেক ধরে মহড়া হল। শো হয়েছিল দু’দিন। দিন আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও খ্যাতনামা নাগরিকদের। প্রথম দিন এসেছিলেন তখনকার বাংলা সিনেমার বিখ্যাত নায়িকা অরুন্ধতী মুখোপাধ্যায়। তাঁর দু’পাশে বসেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও বিকাশ রায়। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, রাজশ্বরী দত্ত, বুদ্ধদেব বসু ছিলেন প্রথম সারির কোণে। অতিথিদের তদারক করছিলেন সত্যজিৎ রায়।
সুনীলের ওপর নির্দেশ ছিল, নাটকের শেষ দৃশ্যে বিভূতি “আমার বাঁধ কে ভাঙলে, বাঁধ কে ভাঙলে” বলে কাতর আর্তনাদ করতে করতে গলার মালা ছিঁড়ে ফেলবে, যাতে গোটা মঞ্চে ফুল ছড়িয়ে যায়। প্রথম শো-এ সুনীল অত্যোৎসাহে এত জোরে মালাটা ছিঁড়লেন, যে আধখানা মালা গিয়ে পড়ল অরুন্ধতী দেবীর কোলে। অনেকে ভেবেছিলেন, সুনীল ইচ্ছে করেই এটা করেছেন, যদিও তাঁর ‘অর্ধেক জীবন’ বইতে সুনীল জানিয়েছেন, ব্যাপারটা ইচ্ছাকৃত ছিল না।
