
রেকর্ড হয়ে যাবার পর বেরিয়ে পকেট থেকে টাকা দিয়ে ও পি নাইয়ার বলেন, বিয়ার খেয়ো
মানুষ তো শুধু নারীর প্রেমে সীমাবদ্ধ থাকেনা। বিভিন্ন লোকের বিভিন্ন প্রেম, ডাক্তারের যেমন নাড়ি – প্রেম । আমার মত আনাড়ির কাছে সঙ্গীত প্রেম হিসেবে এসেছে। সঙ্গীত শুধু নয়, যন্ত্র সঙ্গীত । এই যন্ত্র সঙ্গীতের বাজারে এমন একজনের কথা বলতে যাচ্ছি, যিনি ‘ সিং’( সিংহ ও) কিন্তু আমাদের দক্ষিণ ২৪পরগনার বাটানগরের বাসিন্দা। মনোহারি আধুনিক ভারতীয় পেশাদার সঙ্গীত জগতে স্যাক্সোফোনকে তিনি জনপ্রিয় করেছেন, বললে অত্যুক্তি হবে না। তাঁকেও স্যাক্সোফোন জনপ্রিয়তা দিয়েছে। ১৯৪৫ সাল নাগাদ বাটানগরে একটা ব্যান্ডে বাজাতেন। নিউম্যান সাহেব –নামে এক ভদ্রলোকের চোখে পড়ে যাওয়ায় তিনি H M V তে নিয়ে আসেন। পরে বম্বে যান, সলিল চৌধুরী ওঁকে রেফার করেন।
স্যাক্সোফোনের প্রয়োগকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন মনোহারি তা দীর্ঘ আলোচনার অবকাশ রাখে সুরের দিক থেকে। বম্বেতে প্রথম একক বাজালেন ছোট্ট একটা পিস, ১৯৬০ সালের কালাবাজার ছবির, সচ হুয়ে সপনে তেরে, গানটাতে। মনোহারি ম্যান্ডোলিন, বাঁশিও বাজাতেন সমান দক্ষতায়। এরমধ্যে ‘মধুমতি’ ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বাজিয়ে ফেলেছেন সলিলের নির্দেশনায়। যেমন হিন্দিতে এস ডি, আর ডি, সলিল, ও পি নাইয়ার, শঙ্কর- জয়কিসেন, চিত্রগুপ্ত, লক্ষ্মীকান্ত-প্যারেলাল সহ প্রায় সবার সাথে বাজিয়েছেন, তেমন বাজিয়েছেন কমল দাশগুপ্ত নচিকেতা ঘোষ-সুধীন দাশগুপ্ত শৈলেন মুখোপাধ্যায় অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় সবার সঙ্গে। প্রথম যে গানটাতে ওঁকে লোকেট করি, সেটা একটা বাংলা গান। ‘তারপর! তার আর পর নেই।’ নচিকেতা ঘোষের সুরে। সে অভিজ্ঞতা ভোলার নয়। হেমন্তের গলা, মুকুল দত্তের লিরিক, আর চাঁদ ওসমানি, মুকুল দত্তের তৎকালীন স্ত্রী এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী বলছেন, ‘তারপর!’
শুধু স্যাক্সোফোন হয় তিন রকমের, alto, tenor, soprano । এ ছাড়াও Trombone, Trumpet ও মনোহারি বাজাতেন। এই পাঁচটা যন্ত্রের পাঁচ রকমের আওয়াজ, এবং এর আওয়াজের খুব সুক্ষ ফারাক আছে। তিন রকমের স্যাক্সোফোন বাজালেও মূলত মনোহারি soprano– বাজাতেন। বাঁশির উদাহরণ দিই, মদনমোহনের সুরে গাইছেন ‘এক হসিন সাম কো দিল মেরা খো গ্যায়া’ ওর বাঁশিটা কিন্তু মনোহারি সিং এর বাজানো। ‘তুম বিন যাউ কাঁহা’ তে ম্যান্ডোলিন, সেটাও বাজানো ওঁর ‘যা রে উড় যা রে পঞ্ছি’, ওতে বাঁশি এবং স্যাক্সোফোন দুটোই ছিল মনোহারির বাজানো। বাজানোটা শুনে এত খুশি হয়েছিলেন লক্ষীকান্ত – প্যায়ারেলাল জুটির প্যায়ারেলাল যে ওটা শুনে ওঁকে ১০০ টাকা উপহার দিয়েছিলেন। সঙ্গীত পরিচালক কল্যাণজি – আনন্দজি দুই ভাইয়ের সিনেমা ‘সত্তাবাজার’- এর রেকর্ডিং হবে, এঁদের তখন সহকারী লক্ষীকান্ত – প্যায়ারেলাল। রিহার্সালে যে কোরাস স্যাক্সোফোনটা বাজছে সেটাতে ঠিক খুশি নন লক্ষীকান্ত । পরেরদিন মেহবুব স্টুডিয়ো তে মনোহারিকে বললেন যেটা কোরাসে বাজাচ্ছিলেন উনি, সেটা যেন সোলো বাজান। মনোহারি উদগ্রীব। সেটা শুনে লক্ষীকান্ত খুশি হলেন, বললেন কাল সবাই কে কনভিন্স করবেন, যাতে ওটা একা মনোহারিই বাজান। হলও তাই, সেভাবে দেখতে গেলে লোকের চোখে পড়ার মত একটা গোটা তিন মিনিটের গানে বাজালেন, ‘তুমহে ইয়াদ হোগা কভি হম মিলে থে’—সেই গান লতা আর হেমন্তের ডুয়েট। মনোহারি সিং ভি বালসারার মত লোক সঙ্গীত জগতে আসেন গোটা টা বদলে দেবার জন্য।
পাঠক, শুনে দেখুন ওঁর বাজানো ‘হ্যায় দুনিয়া উসিকি জমানা উসিকা’ রফির গানে স্যাক্সোফোন। ও পি নাইয়ার সুরকার- শুনে তাজ্জব হয়ে গেছিলেন, শোনা যায় ও পি নাইয়ার ওঁকে রেকর্ড হয়ে যাবার পর বেরিয়ে পকেট থেকে টাকা দিয়ে বলেন, বিয়ার খেয়ো। এ কান্ড ও পি নাইয়ারের মত উদার দিল দরিয়া লোকের পক্ষেই সম্ভব।
বৃষ্টিতে বম্বে ভেসে যাচ্ছে, তবু ঠিক সময়ে রেকর্ডিং- এ হাজির লতা মংগেশকর। ‘আরজু’ সিনেমার গান রেকর্ড হবে, সঙ্গীত পরিচালক জুটি শঙ্কর – জয়কিষেণ ও আছেন। আসেননি মনোহারি। লতাকে অপেক্ষা করিয়েছিলেন জয়কিষেণ মনোহারির জন্য, মনোহারির ঐটুকু পিস, ‘বেদরদি বালমা তুঝকো মেরা মন ইয়াদ করতা হ্যায়’ গানটাকে কোন উচ্চতায় নিয়ে গেছে আজকে সবাই জানে।
একটা মিথ এখানে ভাঙা দরকার, রাহুল দেববর্মনের অ্যারেঞ্জার ছিলেন মনোহারি সবাই জানি, কিন্তু সেটা দ্বিতীয় ছবি ‘ভূত বাংলো’ ছবি থেকে। প্রথম ছবি ‘ছোটে নবাব’- এর বাঁশি স্যাক্সোফোন ওঁর বাজানো কিন্তু অ্যারেঞ্জার ছিলেন লক্ষী – প্যায়ারে।
অ্যারেঞ্জারের কাজ কী সেটা পরোক্ষে বলেইছি ‘সত্তা বাজার’ সিনেমার গান উল্লেখ করতে গিয়ে লক্ষী – প্যায়ারের অনুষঙ্গে। সুর করতেন পরিচালক, কিন্তু সেখানে প্রথম লাইনের পর কতক্ষনের pause যাবে, সেই pause এর পর বাঁশি বাজবে না গিটার বাজবে, বাজলেও কতক্ষণের জন্য, সেসব দেখায় দায়িত্ব থাকে একজন অ্যারেঞ্জারের। মনোহারি সেটা করেছেন রাহুলদেব বর্মন শচীন দেব বর্মন এঁদের সবার জন্য। এর সঙ্গে আছে নিজের বাজনা। বাসু চক্রবর্তীর সাথে মিলে বাসু – মনোহারি নামে সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন, তার মধ্যে বিখ্যাত একটা গানের উল্লেখ করে লেখা শেষ করি, ‘তার চোখে নেমে আসা/ রঙে রঙে ভালোবাসা।’ ও পি নাইয়ার প্রকাশ্যে বলতেন লোককে মনোহারি এবং আরো যন্ত্রীদের দেখিয়ে, এঁরা আমার অলঙ্কার। এরপর কিছু বলার থাকে আর!
