গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ার পরে এখনও গেয়ে চলেছেন, ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম….’

আজ মহাত্মা গান্ধির প্রয়াণ দিবস

একটা খুশির খবর দিয়ে শুরু করছি আজকের এই লেখা। খবরটা হল, ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধির উপর নাথুরাম গডসে যে পর পর তিনটি গুলি চালিয়েছিলেন, তার পরেও গান্ধির মৃত্যু হয়নি। গান্ধিকে খুন করা যায়নি। আর মারা যাননি বলেই, কখনও হিন্দু মহাসভার নেতারা গান্ধির ছবিতে গুলি করছেন। কখনও বিজেপি সাংসদ প্রজ্ঞা নাথুরাম গডসের নামে জয়ধ্বনি দিচ্ছেন, কখনও বিজেপি নেতা অনন্ত হেগড়ে গান্ধিকে নস্যাৎ করতে চিৎকার করে বলে উঠছেন, গান্ধির আন্দোলন নাটক ছিল, সত্যাগ্রহ নাটক ছিল, অনশন নাটক ছিল, লবণ আন্দোলন নাটক ছিল, কারাবাস নাটক ছিল, তাঁর অসহযোগ আন্দোলনও নাটক ছিল।

১৯৪৮ সাল থেকে হিন্দুত্ববাদীরা প্রতিদিন গান্ধিকে খুন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কখনও গুলি করে, কখনও ঘৃণা মেশানো ভাষা দিয়ে। গান্ধির রক্তে দেশ ভেসে যাচ্ছে। তবুও ৭৩ বছর ধরে ক্রমাগত এই খুনের চেষ্টার পরেও দেখা যাচ্ছে, ওই হাঁটুর উপর কাপড় পরা লাঠি হাতে মানুষটা হেঁটে চলেছেন। তাঁর প্রিয় ভজন, ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম’, অতি সাধারণ একটা গান, এত বছর পার হয়ে গেল, তবু এখনও দেশের নানা ভাষার শিল্পীরা গেয়ে চলেছেন। এক দোর্দণ্ডপ্রতাপ সরকারের দেখানো সমস্ত ভয় উপেক্ষা করে গত বছর আমরা দেখেছিলাম তাঁরই দেখানো পথে শাহিনবাগে ‘অমানবিক আইন’-এর বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহ। আমরা এখন দেখছি, কৃষি-আইন প্রত্যাহারের দাবিতে কৃষকদের সত্যাগ্রহ।  

গান্ধিকে খুন করতে নাথুরাম গডসে যে রিভলভার ব্যবহার করেছিলেন, সেটা তিনি কিনেছিলেন গোয়ালিয়র থেকে। তাই গোয়ালিয়র নাকি হিন্দুত্ববাদীদের কাছে খুব পবিত্র শহর, গর্বের শহর।

গান্ধিকে খুন করতে নাথুরাম গডসে যে রিভলভার ব্যবহার করেছিলেন, সেটা তিনি কিনেছিলেন গোয়ালিয়র থেকে। তাই গোয়ালিয়র নাকি হিন্দুত্ববাদীদের কাছে খুব পবিত্র শহর, গর্বের শহর। যে শহর থেকে গান্ধি হত্যার অস্ত্র কেনা হয়েছিল, সেই স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে এ বছর ১০ জানুয়ারি গোয়ালিয়র শহরে ‘গডসে লাইব্রেরি’ খুলল অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভা। এই লাইব্রেরির নাম ‘গডসে জ্ঞানশালা’। গডসে লাইব্রেরিতে রাখা হবে গডসের চিঠি-পত্র, গডসেকে নিয়ে লেখা হিন্দুত্ববাদীদের বই ইত্যাদি। যার মাধ্যমে প্রমাণ করা হবে গান্ধি হত্যাকারী নাথুরাম গডসে কত বড়ো জাতীয়তাবাদী ছিলেন, সাংবাদিকদের জানিয়েছেন হিন্দু মহাসভার সহ-সভাপতি জয়বীর ভরদ্বাজ। 

গান্ধিকে সারা পৃথিবী কী চোখে দেখে? পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল ঘোষ যে একসময়ে নিয়মিত বিদেশি জার্নালে কেমিস্ট্রির উপর বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লিখতেন, সেটা খুব একটা লোকজন জানেন না। বিজ্ঞানে তাঁর প্রবল উৎসাহ। সেই প্রফুল্ল ঘোষ ১৯৫৩ সালে প্রিন্সটোনে গিয়েছিলেন আইনস্টাইনের সঙ্গে দেখা করতে। আত্মজীবনীতে প্রফুল্ল ঘোষ লিখেছেন, ‘তাঁর ঘরে দেখলাম মহাত্মাজির ছবি। আইনস্টাইন আমাকে বললেন, তিনি (গান্ধি) এ যুগের শ্রেষ্ঠ মানুষ।’ 

আইনস্টাইন ও গান্ধিজি 

২০২০-এর ২ অক্টোবর, গান্ধি জয়ন্তীতে ট্যুইটার ট্রেন্ডিংয়ে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধির সঙ্গে এক সারিতে উঠে এসেছিল তাঁর হত্যাকারী, নাথুরাম গডসের নাম। সারা দিন টুইটারে শোনা গিয়েছিল গান্ধি হত্যাকারীদের উল্লাস। ভোর ৫টা থেকে নাথুরামগডসেজিন্দাবাদ হ্যাশট্যাগে ক্রমাগত টুইট শুরু। দুপুরের মধ্যেই গডসে নিয়ে টুইটের সংখ্যা আশি হাজার ছাড়িয়ে যায়। গডসের সমর্থনে টুইট যাঁদের প্রোফাইল থেকে হয়েছে, তাঁদের মধ্যে একাধিক ব্যক্তি ঘোষিত বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদের সমর্থককে দেখা গিয়েছে।

নোয়াখালিতে ভয়ংকর দাঙ্গা। গান্ধি পৌঁছলেন নোয়াখালিতে। ঠিক করলেন, খালি পায়ে হেঁটে মানুষের কাছে যাবেন। প্রথম প্রথম তাঁর যাওয়ার পথে ভাঙা কাচ আর মল ফেলে রাখা হত। কিন্তু তাঁকে থামানো যায়নি।

গত কয়েক বছরে হিন্দুত্ববাদীদের হাতে যে দু’জনের মূর্তি আক্রান্ত হয়েছে, তারা হলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি। গান্ধি যখন গান্ধি হননি, দক্ষিণ আফ্রিকায় কর্মরত, ভারতীয়দের অধিকারের দাবিতে প্রতিবাদ করছেিন, কাগজ বের করছেন, সেই সময়, ১৯০৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর, তাঁর কাগজ ‘ইন্ডিয়ান ওপিনিয়ন’-এ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। গান্ধি লিখেছিলেন, বিদ্যাসাগর ১৯ শতকে ভারতের শ্রেষ্ঠ মানুষ। গান্ধি লিখলেন, যদি বিদ্যাসাগর ইউরোপে জন্মগ্রহণ করতেন, তাঁকে মনে রাখার জন্য বড়ো বড়ো স্মারক তৈরি হত। এখনও সেই স্মারক আছে, আছে বাংলার ধনী-গরিব সব মানুষের হৃদয়ে। গান্ধি যখন এই কথা লিখছেন, তখন তাঁর বয়স ৩৬। তিনি হয়তো তখন স্বপ্নেও ভাবেননি, ১৯৪৮ সালে তাঁকে গুলি করে হত্যা করবে হিন্দুত্ববাদী গডসে। আর ২০১৯-এ তাদেরই হাতে কলকাতায় ভাঙা পড়বে বিদ্যাসাগরের মূর্তি। রামকৃষ্ণ যখন মারা যান, গান্ধির বয়স তখন ২০-২২ হবে। কিন্তু কী অদ্ভূত ভাষার মিল। বিদ্যাসাগরের কাছে এসে ১৮৮২ সালে রামকৃষ্ণ বলেছিলেন, ‘বিদ্যার সাগর দেখতে এলাম’। আর ১৯০৫-এ বিদ্যাসাগর সম্পর্কে গান্ধি লিখছেন, ‘ওসেন অফ লার্নিং’।

 

নোয়াখালিতে ভয়ংকর দাঙ্গা। গান্ধি পৌঁছলেন নোয়াখালিতে। ঠিক করলেন, খালি পায়ে হেঁটে মানুষের কাছে যাবেন। প্রথম প্রথম তাঁর যাওয়ার পথে ভাঙা কাচ আর মল ফেলে রাখা হত। কিন্তু তাঁকে থামানো যায়নি। তিনি পায়ে হেঁটে মানুষের মনে আস্থা ফেরানোর চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। অভিযোগ ছিল নোয়াখালির পুলিশ সুপার, ই এস এম আবদুল্লা আক্রান্ত মানুষকে নিরাপত্তা তো দেনইনি, উল্টে দাঙ্গায় উসকানি দিয়েছেন। তাকে দেখে গান্ধি বলেছিলেন, ‘ওহ্, তুমিই তা হলে সেই আবদুল্লা! তোমার কথা আমাকে অনেকে বলেছে। নোয়াখালিতে আক্রান্ত মানুষদের রক্ষা তো তুমি করই-নি, বরং অনেক ক্ষেত্রে আক্রমণকারীদের উৎসাহ দিয়েছ’। আবদুল্লা গান্ধির সামনে কোনও জবাব না দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। গান্ধি আবদুল্লার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘তুমি আমার সঙ্গে এসো’। যে পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে হিন্দুদের পুঞ্জীভূত অভিযোগ, গান্ধি তাকেই নিয়ে এলেন প্রার্থনাসভায়। শ্রোতাদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। গান্ধি আবদুল্লাকে নিজের পাশে বসালেন। পরে প্রতিদিন গান্ধি প্রতিটি আক্রান্ত গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন। বেশ কিছু দিন ছিলেন নোয়াখালিতে। আর আবদুল্লা ততদিনে একজন বিশ্বস্ত গান্ধি-ভক্ত। পরে আবদুল্লা বদলি হয়ে যান মুর্শিদাবাদে। দেশভাগের সময় গান্ধির সঙ্গে দেখা করে তিনি জানতে চাইলেন, তিনি কি ভারতে থেকে যাবেন না পাকিস্তানে চলে যাবেন। গান্ধি আবদুল্লাকে বললেন, ‘না, তুমি পাকিস্তানে যাও। নতুন রাষ্ট্র, পাকিস্তানের তোমার মতো অফিসারের দরকার আছে’। গান্ধিহত্যার পর গান্ধিস্মৃতি রক্ষায় একটি তহবিল তৈরি হয়েছিল। সেই তহবিলে প্রথম যে হাজার টাকার মানি অর্ডারটি ঢাকা থেকে পৌঁছেছিল, সেটা এস এম আবদুল্লার। এই হলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি।

নোয়াখালিতে মহাত্মা গান্ধি 

নোয়াখালি থেকে কিছুদিনের মধ্যেই গান্ধি ছুটে এলেন বিহারে। বিহারে নোয়াখালির বদলা নিতে দাঙ্গা শুরু হয়েছে। বিহারে তখন কংগ্রসের সরকার। সেই সময় একদিন স্থানীয় কংগ্রেস নেতাদের ডেকে গান্ধি বলেছিলেন, ‘যারা বলেন বিহারের দাঙ্গা নোয়াখালির বদলা, তাদের আমি বলি, এমনভাবে ভাবা মানে গুন্ডামির প্রতিযোগিতায় নামা।’ তিনি কংগ্রেস সদস্যদের উদ্দেশে বললেন, ‘চোখের সামনে আপনারা দেখলেন নিরীহ মানুষকে খুন করা হচ্ছে, বাধা দিতে গিয়ে আপনাদের মৃত্যু হল না কেন! হয় করব না হয় মরব, এই ভাবনা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন না কেন!’

এই হলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি। হিন্দুত্ববাদীদের গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ার পরে ৭৭ বছর কেটে গেল, এখনও গেয়ে চলেছেন, ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম…’

____

*মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব

Developed by DXDasia