কাগজ-কালির প্রতি কবির ছিল অমোঘ ভালোবাসা
রবীন্দ্রনাথের ডাকপিয়ন ছিলেন গগন হরকরা, পানওয়ালা ছিলেন লালন ফকির আর গুরু ছিলেন পালকিবাহকের একজন। এরকমই লিখেছেন শান্তিদেব ঘোষ, তাঁর 'রবীন্দ্রসংগীত' বইতে। তাঁর লেখায় ফুটে ওঠে, কবিগুরুর জীবনে পত্রবাহকেরা কত গুরুত্বপূর্ণ। গগন হরকরার 'আমি কোথায় পাবো তারে'-র সার্থক রূপান্তর করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই গান 'আমার সোনার বাংলা' আজ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত।
রবি ঠাকুরের কাছে চিঠি লেখা ছিল শিল্প। কাগজ-কলম-দোয়াত নিয়ে তাঁর ভালোবাসার অন্ত ছিল না। 'আপদ' গল্পে তিনি লিখছেন – "কলিকাতা হইতে সতীশ একটি শৌখিন দোয়াতদান কিনিয়া আনিয়াছিল, তাহাতে দুই পাশে দুই ঝিনুকের নৌকার উপর দোয়াত বসানো এবং মাঝে একটা জর্মন রৌপ্যের হাঁস উন্মুক্ত চঞ্চুপটে কলম লইয়া পাখা মেলিয়া বসিয়া আছে; সেটির প্রতি সতীশের অত্যন্ত যত্ন ছিল, প্রায় সে মাঝে মাঝে সিল্কের রুমাল দিয়া অতি সযত্নে সেটি ঝাড়পোঁচ করিত। কিরণ প্রায়ই পরিহাস করিয়া সেই রৌপ্যহংসের চঞ্চু-অগ্রভাগে অঙ্গুলির আঘাত করিয়া বলিতেন, “ওরে রাজহংস, জন্মি দ্বিজবংশে এমন নৃশংস কেন হলি রে” এবং ইহাই উপলক্ষ করিয়া দেবরে তাঁহাতে হাস্যকৌতুকের বাগ্যুদ্ধ চলিত।"
ছেলে রথীন্দ্রনাথকে লেখা চিঠিতেও এই ভালোবাসার পরিচয় মেলে। ১৯৩০-এর অক্টোবরে এমনই এক চিঠিতে প্রচুর রঙিন কালি আর কাগজ আনতে বলছেন। জার্মানির কাগজ আর ফ্রান্সের কালির প্রতি দুর্বলতা ছিল তাঁর।

কবি, দার্শনিক, শিক্ষক
'খাতা' গল্পে তুলে ধরলেন কাগজ-কালি-কলমের প্রতি নিবিড় আকর্ষণ –
"লিখিতে শিখিয়া অবধি উমা বিষম উপদ্রব আরম্ভ করিয়াছে। বাড়ির প্রত্যেক ঘরের দেয়ালে কয়লা দিয়া বাঁকা লাইন কাটিয়া বড়ো বড়ো কাঁচা অক্ষরে কেবলই লিখিতেছে — জল পড়ে, পাতা নড়ে।
তাহার বউঠাকুরানীর বালিশের নিচে ‘হরিদাসের গুপ্তকথা’ ছিল, সেটা সন্ধান করিয়া বাহির করিয়া তাহার পাতায় পাতায় পেনসিল দিয়া লিখিয়াছে— কালো জল, লাল ফুল।
বাড়ির সর্বদাব্যবহার্য নূতন পঞ্জিকা হইতে অধিকাংশ তিথিনক্ষত্র খুব বড়ো বড়ো অক্ষরে এক-প্রকার লুপ্ত করিয়া দিয়াছে।
বাবার দৈনিক হিসাবের খাতায় জমাখরচের মাঝখানে লিখিয়া রাখিয়াছে— লেখাপড়া করে যেই গাড়িঘোড়া চড়ে সেই।
এ প্রকার সাহিত্যচর্চায় এ পর্যন্ত সে কোনো-প্রকার বাধা পায় নাই, অবশেষে একদিন একটা গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটিল।
উমার দাদা গোবিন্দলাল দেখিতে অত্যন্ত নিরীহ, কিন্তু সে খবরের কাগজে সর্বদাই লিখিয়া থাকে। তাহার কথাবার্তা শুনিলে তাহার আত্মীয়স্বজন কিংবা তাহার পরিচিত প্রতিবেশীরা কেহ তাহাকে চিন্তাশীল বলিয়া কখনো সন্দেহ করে না। এবং বাস্তবিকও সে যে কোনো বিষয়ে কখনো চিন্তা করে এমন অপবাদ তাহাকে দেওয়া যায় না, কিন্তু সে লেখে; এবং বাংলার অধিকাংশ পাঠকের সঙ্গে তার মতের সম্পূর্ণ ঐক্য হয়।
শরীরতত্ত্ব সম্বন্ধে য়ুরোপীয় বৈজ্ঞানিকমণ্ডলীর মধ্যে কতকগুলি গুরুতর ভ্রম প্রচলিত আছে, সেগুলি গোবিন্দলাল যুক্তির কোনো সাহায্য অবলম্বন না করিয়াও কেবলমাত্র রোমাঞ্চজনক ভাষার প্রভাবে সতেজে খণ্ডন-পূর্বক একটি উপাদেয় প্রবন্ধ রচনা করিয়াছিল।
উমা একদিন নির্জন দ্বিপ্রহরে দাদার কালিকলম লইয়া সেই প্রবন্ধটির উপরে বড়ো বড়ো করিয়া লিখিল— গোপাল বড়ো ভালো ছেলে, তাহাকে যাহা দেওয়া যায় সে তাহাই খায়।
গোপাল বলিতে সে যে গোবিন্দলালের প্রবন্ধ-পাঠকদের প্রতি বিশেষ লক্ষ করিয়াছিল তাহা আমার বিশ্বাস হয় না, কিন্তু দাদার ক্রোধের সীমা ছিল না। প্রথমে তাহাকে মারিল, অবশেষে তাহার একটি স্বল্পাবশিষ্ট পেনসিল আদ্যোপান্ত মসীলিপ্ত একটি ভোঁতা কলম, তাহার বহুযত্নসঞ্চিত যৎসামান্য লেখ্যোপকরণের পুঁজি কাড়িয়া লইল। অপমানিতা বালিকা তাহার এতাদৃশ গুরুতর লাঞ্ছনার কারণ সম্পূর্ণ বুঝিতে না পারিয়া ঘরের কোণে বসিয়া ব্যথিত-হৃদয়ে কাঁদিতে লাগিল।"
এখন স্মার্টফোনের যুগে চিঠি লেখার শিল্প গিয়েছে হারিয়ে। দোয়াতের কালি ব্যবহার করে না কেউ। রবীন্দ্রনাথের চিঠিগুলো তাই আমাদের নিয়ে যায় এক রূপকথার জগতে। দোয়াতের কালি যেখানে স্বপ্নের জাল বোনে।
(সুশান্ত দত্তগুপ্তের ‘A random walk in Santiniketan Ashram’ এবং শান্তিনিকেতন বিষয়ক আরও নানা বই থেকে অনুপ্রাণিত)
