সিঙ্গাপুর-প্যারিস বা লন্ডন নয়, কলকাতা নিজেই নিজের অলংকার হয়ে উঠুক

কলকাতার সৌন্দর্য রক্ষায় নেওয়া হোক নতুন পরিকল্পনা

এটি একটি কাল্পনিক ছবি

ই কংক্রিটে ভরা কলকাতা শহরে কি আদৌ হাঁটার জন্য যথেষ্ট ফুটপাথ আছে? এই বুড়ো শহরে দেখার মতো তো কত কিছুই আছে। চাইলেই খুঁজতে যাওয়া যায় স্মৃতির ইতিহাসকে। সাজানো শহরে অলিতে গলিতে এখনও রয়ে গিয়েছে অপ্রকাশিত কত গল্প, কত ইতিহাস। আজও উঁকি দেয় সেইসব সুপ্ত ইতিহাস, অজানা গল্প। সিটি অফ জয়-এর আঁচল ভরা ওম নিয়ে দিন শুরু করা যুগলদের জন্য কি এই শহরটা একটা নতুন ঠিকানা দিতে পারে না? একটা ভেনিস দিতে পারে না সিটি অফ জয়? স্মৃতির শহরে কি ভগ্নপ্রায় বাড়িগুলোর পুনর্নিমাণ করা যায় না? সাজিয়ে তোলা যায় না স্মৃতির শহরকে? খুঁড়ে বের করা যায় না একটা অরণ্য?

বিশ্বের বহু শহর তাদের পুরোনো স্থাপত্যকে ভেঙে না ফেলে নতুনভাবে ব্যবহার করার পথ খুঁজে নিয়েছে। ইতালির বহু পুরোনো প্রাসাদ আজ বুটিক হোটেল, প্যারিসের শতাব্দীপ্রাচীন ভবন আধুনিক ক্যাফে বা আর্ট স্পেসে বদলে গিয়েছে, লন্ডনের পুরোনো ওয়্যারহাউস আজ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। কলকাতাও চাইলে তার বনেদি বাড়িগুলোকে শুধুমাত্র ‘হেরিটেজ’ তকমার মধ্যে আটকে না রেখে নতুনভাবে জীবন্ত করে তুলতে পারে।

কলকাতার সৌন্দর্য নিয়ে ভাবতে গেলে আমরা সাধারণত মাটির দিকেই তাকাই। রাস্তা, পার্ক, নদীর ধারে উন্নয়ন ইত্যাদি কিন্তু শহরের মাথার ওপর পড়ে থাকা অগণিত ফাঁকা ছাদ যে এক বিশাল সম্ভাবনার ভাণ্ডার, তা এখনও যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়নি। অথচ সামান্য পরিকল্পনা, কিছু গাছের টব আর একটু সামাজিক উদ্যোগেই এই ছাদগুলো ছোটো ছোটো সবুজ দ্বীপে বদলে যেতে পারে, যা একসময় যুক্ত হয়ে গড়ে তুলতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ রুফটপ গার্ডেন নেটওয়ার্ক। বিশ্বের নানা শহরে এই ধারণা ইতিমধ্যেই বাস্তবায়িত হয়েছে। সিঙ্গাপুর নিজেকে ‘সিটি ইন গার্ডেন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। টরেন্টো আইন করে ‘গ্রিন রুফ’ বাধ্যতামূলক করেছে, নিউ ইয়র্ক শহরে ‘ব্রুকলিন গ্রেঞ্জ’ ছাদের চাষকে অর্থনৈতিক মডেলে পরিণত করেছে। প্যারিসের নেচার উরবেন প্রমাণ করেছে যে শহরের মাঝেও বৃহৎ কৃষিক্ষেত্র গড়ে তোলা সম্ভব। সেই তুলনায় কলকাতায় এই উদ্যোগ এখনও শুরুই হয়নি। কিন্তু এই শহরের আড্ডা, সংস্কৃতি ও মানুষের সহজ মেলামেশা এমন এক ছাদ-ভিত্তিক জীবনের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই মিশে যেতে পারে। এর ফলে একদিকে যেমন শহরের তাপমাত্রা কমবে ও বায়ুদূষণ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে, তেমনি অন্যদিকে তৈরি হবে নতুন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর, এমনকি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও। অর্থাৎ নতুন জমি নয়, শহরের অব্যবহৃত ছাদকেই কাজে লাগিয়ে কলকাতা নিজের মাথার ওপরেই গড়ে তুলতে পারে এক নতুন সবুজ শহর, যা এখনও হয়নি, কিন্তু শুরু হলেই বদলে দিতে পারে পুরো নগর-চিত্র।

কলকাতার বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের কথা উঠলে প্রথমেই মনে পড়ে বইপাড়ার বইয়ের গন্ধে ভরা এক অনন্য পরিসর। কিন্তু এই বইপড়ার সংস্কৃতি এখনও নির্দিষ্ট জায়গার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ শহরের পার্ক, ফুটপাথ বা পাড়ার মোড়ে যদি ছোটো ছোটো ‘ওপেন লাইব্রেরি কর্নার’ তৈরি করা যায় যেখানে থাকবে খোলা বুকশেলফ, ‘take a book, leave a book’-এর ধারণা। বিশ্বের নানা শহরে এই ধারণা সফল হয়েছে। লিটল ফ্রি লাইব্রেরি আন্দোলনের মাধ্যমে হাজার হাজার মুক্ত লাইব্রেরি গড়ে উঠেছে, নিউ ইয়র্ক বা লন্ডনের পার্কে এমন বুক কর্নার এখন নিত্যদৃশ্য; কিন্তু কলকাতায় এই উদ্যোগ এখনও খুবই সীমিত। অথচ এই শহরের পাঠাভ্যাস, কবিতা, আড্ডা সবকিছুই এমন উদ্যোগকে সহজেই প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে। এর ফলে একদিকে যেমন বই পড়ার অভ্যাস নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে, তেমনি অন্যদিকে তৈরি হবে ছোটো ছোটো সাংস্কৃতিক পরিসর, যেখানে অচেনা মানুষও বইয়ের সূত্রে যুক্ত হতে পারে। অর্থাৎ, বড়ো লাইব্রেরি নয় ছোটো ছোটো খোলা বইয়ের আলমারি দিয়েই কলকাতা তার বৌদ্ধিক সংস্কৃতিকে আরও দৃশ্যমান ও জীবন্ত করে তুলতে পারে।

কলকাতার বুকে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য খাল আজ মূলত নিকাশির মাধ্যম হিসেবেই ব্যবহৃত হয়, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণ থাকলে এই জলপথগুলিই হয়ে উঠতে পারে শহরের এক নতুন নান্দনিক ও পরিবেশগত সম্পদ। অনেকেই স্বপ্ন দেখেন ভেনিসের মতো জলনির্ভর শহরের, তবে কলকাতার বাস্তবতা ভিন্ন। খালগুলি প্রাকৃতিক লেগুন নয়, বরং নগর ড্রেনেজ ব্যবস্থার অংশ। তবুও, যদি এই খালগুলো পরিষ্কার করা যায়, নিয়মিত জল পরিশোধন ব্যবস্থা চালু হয় এবং দুই ধারে হাঁটার পথ, সাইকেল ট্র্যাক, সবুজায়ন ও আলোর সুষ্ঠু ব্যবহার করা হয়, তাহলে এগুলো সহজেই ক্যানাল করিডরে পরিণত হতে পারে। শহরের নির্দিষ্ট কিছু অংশে ছোটো নৌ-ভ্রমণ, জলপথের ধারে ক্যাফে বা সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে এক নতুন অভিজ্ঞতাও তৈরি করা সম্ভব। এর ফলে একদিকে যেমন জলদূষণ কমবে ও শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে আসবে, তেমনি অন্যদিকে নাগরিকদের জন্য তৈরি হবে নতুন খোলা জায়গা ও পর্যটনের সম্ভাবনা। পাশাপাশি পূর্ব কলকাতা জলাভূমির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত ব্যবস্থাও এই খালগুলোর মাধ্যমে আরও সুরক্ষিত হতে পারে। অর্থাৎ, ভেনিসকে অনুকরণ নয়, বরং নিজের বাস্তবতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী খালগুলোকে পুনর্জীবিত করলেই কলকাতা তার অজানা সৌন্দর্যের এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

 

কলকাতার সৌন্দর্যের আরেকটি বড়ো অংশ লুকিয়ে আছে তার পুরোনো বাড়িগুলোর মধ্যে। উত্তর কলকাতার অলিগলি, উঁচু জানলা, লোহার বারান্দা, থামওয়ালা উঠোন, এসব শুধু স্থাপত্য নয়, শহরের স্মৃতির শরীর। কিন্তু আজ সেইসব বাড়ির অনেকাংশই ভগ্নপ্রায়, অবহেলিত কিংবা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে বহুতলের চাপে। অথচ বিশ্বের বহু শহর তাদের পুরোনো স্থাপত্যকে ভেঙে না ফেলে নতুনভাবে ব্যবহার করার পথ খুঁজে নিয়েছে। ইতালির বহু পুরোনো প্রাসাদ আজ বুটিক হোটেল, প্যারিসের শতাব্দীপ্রাচীন ভবন আধুনিক ক্যাফে বা আর্ট স্পেসে বদলে গিয়েছে, লন্ডনের পুরোনো ওয়্যারহাউস আজ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। কলকাতাও চাইলে তার বনেদি বাড়িগুলোকে শুধুমাত্র ‘হেরিটেজ’ তকমার মধ্যে আটকে না রেখে নতুনভাবে জীবন্ত করে তুলতে পারে। কোথাও ছোটো মিউজিয়াম, কোথাও সাহিত্য ক্যাফে, কোথাও শিল্পীদের কাজের জায়গা কিংবা সাংস্কৃতিক আড্ডার কেন্দ্র গড়ে উঠতে পারে। এর ফলে একদিকে যেমন শহরের ঐতিহাসিক পরিচয় রক্ষা পাবে, তেমনি অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থান ও পর্যটনের সম্ভাবনাও তৈরি হবে। অর্থাৎ, স্মৃতিকে শুধু সংরক্ষণ নয়, তাকে নতুন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেই কলকাতা তার আত্মাকে আবার ফিরিয়ে আনতে পারে।

কলকাতাকে সবুজ করার কথা উঠলেই সাধারণত বড়ো পার্ক বা নতুন গাছ লাগানোর পরিকল্পনার কথা বলা হয়, কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ এই শহরে বিশাল অরণ্য গড়ে তোলার জায়গা কোথায়? অথচ ছোটো ছোটো পরিত্যক্ত জমি, আবাসনের ফাঁকা অংশ, স্কুলের কোণ, পুরোনো কারখানার অব্যবহৃত এলাকা কিংবা রাস্তার ধারের অনুপযোগী জমিকেই যদি পরিকল্পিতভাবে ‘মাইক্রো ফরেস্টে’ বদলে ফেলা যায়, তাহলে শহরের ভেতরেই তৈরি হতে পারে ক্ষুদ্র অরণ্যের জাল। জাপানের উদ্ভিদবিদ Akira Miyawaki–এর ‘মিয়াওয়াকি পদ্ধতি’ ব্যবহার করে বিশ্বের নানা শহরে ইতিমধ্যেই দ্রুত বেড়ে ওঠা ঘন অরণ্য তৈরি হয়েছে। ভারতের বেঙ্গালুরু, মুম্বই কিংবা দিল্লির কিছু অংশেও এই উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। কলকাতাতেও যদি স্থানীয় গাছপালা দিয়ে এমন ছোটো ছোটো অরণ্য তৈরি করা যায়, তাহলে তা শুধু সৌন্দর্যই বাড়াবে না, শহরের তাপমাত্রা কমাতে, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং পাখি ও প্রজাপতির মতো হারিয়ে যাওয়া প্রাণবৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতেও সাহায্য করবে। সবচেয়ে বড়ো কথা, কংক্রিটে বন্দি শহুরে মানুষের কাছে এই ক্ষুদ্র অরণ্যগুলো হয়ে উঠতে পারে মানসিক স্বস্তির জায়গা। এক টুকরো নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা। অর্থাৎ, নতুন জমি নয়, শহরের অবহেলিত কোণগুলোকেই কাজে লাগিয়ে কলকাতা নিজের বুকের মধ্যে আবার ফিরিয়ে আনতে পারে হারিয়ে যাওয়া সবুজের স্মৃতি।

কলকাতাকে সবুজ করার কথা উঠলেই সাধারণত বড়ো পার্ক বা নতুন গাছ লাগানোর পরিকল্পনার কথা বলা হয়, কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ এই শহরে বিশাল অরণ্য গড়ে তোলার জায়গা কোথায়? অথচ ছোটো ছোটো পরিত্যক্ত জমি, আবাসনের ফাঁকা অংশ, স্কুলের কোণ, পুরোনো কারখানার অব্যবহৃত এলাকা কিংবা রাস্তার ধারের অনুপযোগী জমিকেই যদি পরিকল্পিতভাবে ‘মাইক্রো ফরেস্টে’ বদলে ফেলা যায়, তাহলে শহরের ভেতরেই তৈরি হতে পারে ক্ষুদ্র অরণ্যের জাল।

দক্ষিণ কলকাতার রাসবিহারী কেন্দ্রের নবনির্বাচিত বিধায়ক তাঁর অঞ্চলের ইস্তেহারে উল্লেখ করেছেন, হিন্দুস্তান পার্ক থেকে যোধপুর পার্ক পর্যন্ত এলাকায় বেঙ্গল ক্যাফে ও কালচার ডিস্ট্রিক্ট তৈরি করা হবে, এটি হবে এমন এক কেন্দ্র যা এই অঞ্চলকে বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে ফিরিয়ে আনবে। যদিও সারা দক্ষিণ কলকাতায় ক্যাফে নেহাৎ কম নেই। কিন্তু বিধায়কের কথা মতো যদি ক্যাফে হাব তৈরি হয় এবং তাতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান বাড়ে, তা শহরের সংস্কৃতিকে আরও তুলে ধরতে পারবে। উল্লেখ্য, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নকে বিশ্বের অন্যতম ‘ক্যাফে ক্যাপিটাল’ বলা হয়। সেখানকার ডেগ্রাভস স্ট্রিট ও সেন্টার প্লেসের সরু গলিগুলো ক্যাফে প্রেমীদের জন্য স্বর্গ। ইতালির রোম শহরের নানান এলাকায় গলির ভেতর ছোটো ছোটো অসংখ্য নান্দনিক ক্যাফে দেখা যায়। এছাড়াও লাতিন আমেরিকা বা ভিয়েতনামেও এমন ক্যাফে লেনের সন্ধান মেলে।

দক্ষিণ কলকাতার রাসবিহারী কেন্দ্রের নবনির্বাচিত বিধায়ক তাঁর অঞ্চলের ইস্তেহারে উল্লেখ করেছেন, হিন্দুস্তান পার্ক থেকে যোধপুর পার্ক পর্যন্ত এলাকায় বেঙ্গল ক্যাফে ও কালচার ডিস্ট্রিক্ট তৈরি করা হবে… বিধায়কের কথা মতো যদি ক্যাফে হাব তৈরি হয় এবং তাতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান বাড়ে, তা শহরের সংস্কৃতিকে আরও তুলে ধরতে পারবে।

কলকাতার সৌন্দর্য কেবল বাহ্যিক উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তার চেয়েও বেশি করে লুকিয়ে আছে পুরোনো বাড়ির বারান্দায়, ট্রামের ধীরগতিতে, বইয়ের গন্ধে, কিংবা বৃষ্টিভেজা কোনও গলির অচেনা নস্টালজিয়ায়। প্রয়োজন শুধু সেই সুপ্ত সম্ভাবনাগুলোকে নতুনভাবে দেখার। অব্যবহৃত ছাদ, হারিয়ে যাওয়া খাল, ভগ্নপ্রায় বাড়ি কিংবা ছোট্ট ফাঁকা জমি, সবকিছুকেই যদি নতুন চিন্তা ও সংবেদনশীল পরিকল্পনার মাধ্যমে শহরের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে কলকাতা আবারও নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে পারবে। হয়তো সে আরেকটা ভেনিস হবে না, আরেকটা সিঙ্গাপুরও নয়; কিন্তু নিজের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আবেগকে সঙ্গে নিয়েই গড়ে তুলতে পারবে এক সম্পূর্ণ নিজস্ব নগর। বাংলার নতুন সরকার এই সিটি অফ জয়কে নতুন করে সাজিয়ে তুলতে পারে না? একটা স্বপ্নের মতো তিলোত্তমা সওগাত দিতে পারে না বাংলার জনগণকে? সাধারণ মানুষের পাশাপাশি নতুন সরকারের কাছে এই শহরের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার আহ্বান রইল।

_____________
মতামত লেখকের নিজস্ব

Developed by DXDasia