লীলা মজুমদারের বিয়ে মেনে নেননি বাবা, পাশে দাঁড়িয়েছিলেন পিতৃতুল্য রবীন্দ্রনাথ

আজ লীলা মজুমদারের ১১৩তম জন্মবার্ষিকী

পাহাড়ি পথে চলতে চলতে ছোট্ট মেয়েটি শুনতে পেত নানারকম শব্দ। দুটো পাহাড়ের মাঝ বরাবর বাতাস বইলে শব্দ হত গোঁ-গোঁ, আবার পাইন বনের মধ্যে সেই একই বাতাস সোঁ-সোঁ শব্দ তুলত। আর এসবের মাঝে মেয়েটির খালি মনে হত ওই শব্দের আড়ালে বুঝি লুকিয়ে আছে শেকলে বাঁধা কোনো দৈত্যের আর্তনাদ, নিজেকে যে প্রাণপণে মুক্ত করতে চাইছে। পাহাড়ি পথ, পাইন বন, এমনকি পাহাড়ি মানুষ সবাই মেয়েটির কাছে কোনো না কোনো গল্প হয়ে ধরা দিত। সেসব গল্প সুখের গল্প, মজার গল্প, দুঃখের গল্প, কষ্টের গল্প, হারানোর গল্প, না পাওয়ার গল্প।  মেয়েটির কেবলই মনে হত তার চারপাশে ঘুরে বেড়ানো এই অজস্র গল্পগুলোকে যদি সত্যিই ‘গল্প’ করে তুলতে পারত সে, তাহলে বেশ হত। অবশেষে সুযোগ এল ইচ্ছেপূরণের। স্কুলের ‘প্রসূন’ পত্রিকায় প্রথম হাত পাকানো। এভাবেই শিলং পাহাড় তার অজান্তেই বাঙালির ছোটোবেলার সঙ্গে অবর্থ্যভাবে জুড়ে দিয়েছিল একটি নাম। সকলের ছোটোবেলা জড়িয়ে থাকার সে নাম লীলা মজুমদার। তবে নেহাতই কাঁচা বয়সের আদ্যাক্ষর নয়, বুড়ো বয়সের পাকা মনেও আমাদের যে ছোটোবেলা জমা থাকে, সেই সরল মনের চিরকালের দোসর এই মানুষটি।

জীবনের প্রথম এগারো বছর শিলংয়ে কাটে লীলার। তখন তিনি মজুমদার নন, ‘রায়’। পাহাড়ে প্রথমে ‘লাবানপাড়ার ব্রাহ্ম মন্দিরের ওপরের ছোট্ট একটা বাড়িতে’, তারপর ‘হাই উইন্ডস’-এ দীর্ঘদিন কাটালেও লীলার জন্ম কিন্তু ১৯০৮-এর ২৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতার গড়পাড় রোডের বিখ্যাত রায়বাড়িতে। বাঙালি শিশু কিশোর সাহিত্যের পীঠস্থান এই রায়বাড়ির অন্যতম সদস্য সাহিত্যিক প্রমদারঞ্জন রায় ও তাঁর স্ত্রী সুরমা দেবীর কন্যা লীলা সম্পর্কে কামদারঞ্জন ওরফে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ভাইজি এবং সেই সূত্রে সুকুমার রায়ের খুড়তুতো বোন ও পরবর্তীতে সত্যজিৎ রায়ের পিসি। লেখার সহজ সরল বাল্যদৃষ্টি লীলা পেয়েছিলেন শিলং শহরের পাহাড়ি পরিবেশে আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল অবশ্যই তাঁর এই পারিবারিক লেখার উত্তরাধিকার। কারণ, লীলা মজুমদারের সাহিত্যপ্রীতির শুরুয়াত কিন্তু উপেন্দ্রকিশোরের ‘সন্দেশ’ হাতে নিয়ে। সদ্য ছাপা ‘সন্দেশ’-এর টাটকা সুবাস আজীবন মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল তাঁকে। মন থেকে কোনোদিন ফিকে হয়ে যায়নি সে স্মৃতি। বারো বছর বয়সে কলকাতায় চলে এলে দাদা সুকুমার রায় তাঁকে দিয়ে জীবনের প্রথম গল্প ‘লক্ষ্মীছেলে’ লিখিয়েছিলেন ‘সন্দেশ’-এর জন্য। ১০০, গড়পাড় রোডের বাড়িতেই ছিল ইউ রায় অ্যান্ড কোং-এর ছাপাখানা ও অফিস। নতুন কাগজ, কালির গন্ধ, নিত্যনতুন শব্দ সর্বক্ষণ আবিষ্ট করে রাখত বাড়ির পরিবেশ। সত্যিকারের ‘সন্দেশী’ হওয়ার জন্য সঙ্গে ছিল বড়দি সুখলতা, মেজদিদি পুণ্যলতা কিংবা মণিদা সুবিনয়ের মতো মানুষের প্রত্যক্ষ প্রভাব। লেখালেখি তাই যেন ভবিতব্যই ছিল লীলার।

দার্জিলিংয়ের মহারানী গার্লস স্কুলে পড়ানোর মধ্যে দিয়ে কর্মজীবন শুরু হয় তাঁর। এরপর রবীন্দ্রনাথের ডাকে শান্তিনিকেতনে পড়াতে আসেন এবং নয় মাস পড়ানোর পর আবার ফিরে যান কলকাতায়। আশুতোষ কলেজের মহিলা বিভাগে শুরু করেন অধ্যাপনা। এরই মাঝে নরম সরম এই মেয়েটিই এক দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়ে বসলেন, তার গোঁড়া ব্রাহ্ম পিতা প্রমদারঞ্জনের অমতে বিয়ে করলেন হার্ভার্ড ফেরত দন্ত চিকিৎসক সুধীরকুমার মজুমদারকে। ব্রাহ্ম-হিন্দুর এই বিয়েকে কেন্দ্র করে জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ বাবার সঙ্গে বিচ্ছেদ হল লীলার। কিন্তু পাশে পেলেন পিতৃতুল্য আরেক মহীরুহ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে। 

বিয়ের পর সংসারের জাঁতাকলে লেখালেখি কমে এলেও নানা কথা মনের মাঝে যেন ডানা ঝাপটাত লীলার। স্বামী সুধীরকুমারের যদিও পূর্ণ সমর্থন ছিল লেখালেখিতে, তবুও সংসার সামলে একটু আধটু লিখে ঠিক সেইমতো আরাম মিলছিল না। বন্ধু বুদ্ধদেব বসুর নিরন্তর তাড়নায় তারপর একদিন ‘বৈশাখী’ পত্রিকার জন্য লীলা মজুমদার লিখলেন তাঁর প্রথম বড়োদের গল্প ‘সোনালি রুপালি’। এরপর তাঁর ছেলে রঞ্জন মজুমদারের সাতবছর বয়সে লীলার প্রথম বই বেরলো ‘বদ্যিনাথের বড়ি’। সংসারের হাজার ঠেলা সামলেও লেখালেখি থেকে আর দূরে সরিয়ে রাখতে পারেননি নিজেকে। ‘মৌচাক’, ‘রংমশাল’, ’রামধনু’তে ছোটোদের পাশাপাশি ‘পরিচয়’,  ‘বৈশাখী’তে বড়োদের জন্য সমানে লিখে গেছেন লীলা মজুমদার। তাঁর হাতে জন্ম নিয়েছে একের পর এক মাইলস্টোন। ‘টংলিং’, ‘সব ভুতুড়ে’, ‘পদি পিসির বর্মী বাক্স’, ‘হলদে পাখির পালক’, ‘হট্টমেলার দেশে’, ‘বালী-সুগ্রীব কথন’-এর লীলা মজুমদার তাঁর ছোটোবেলা, বড়োবেলা নিয়ে উন্মোচিত হয়েছেন ‘আর কোনখানে’ কিংবা জীবনের গল্প ‘পাকদণ্ডী’তে। যে পত্রিকার গন্ধে গল্পের ভূত মাথায় চেপেছিল, প্রায় আট দশকের সাহিত্যি জীবনের মাঝে দীর্ঘ ত্রিশ বছরেরও বেশি সেই ‘সন্দেশ’-এর যৌথ সম্পাদকের গুরু দায়িত্ব সামলেছিলেন তিনি। ছোটোদের মনে খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে এমন কোনো লেখা কম্পোজ করা হয়ে গেলেও ছাপতে দিতেন না লীলা, বলতেন “এ লেখা চলবে না”। লীলা আকাশবাণীতে চাকরি করেছেন বেশ কিছু বছর, ‘মহিলা মহল’ অনুষ্ঠানে তাঁর ‘ঠাকুমার চিঠি’, ‘ইষ্টিকুটুম’-এর গল্প খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। 

শতায়ু এই মানুষটির লেখার সঠিক হদিশ আজও পাওয়া যায়নি, তবে লীলার জীবনীকার তাঁর ভাইপো প্রসাদরঞ্জনের হিসেব মতো লীলা মজুমদারের মোট ২৮৯টি বইয়ের উল্লেখ সম্ভবপর হয়েছে। সংখ্যার হিসেবে অজস্র গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার প্রাপ্তি আর এই বিপুল লেখার সমুদ্রলীলা মজুমদারের সাহিত্যচর্চাকে বোঝার জন্য নিঃসন্দেহে একটা জরুরি পরিসংখ্যান। কিন্তু সে সমুদ্র ছাপিয়ে বড়ো সত্যি হয়ে ধরা দেয় জীবনের প্রতি লীলার অটুট শ্রদ্ধার কথা, ভালোবাসার কথা।  গল্প শুনতে শুনতে আমরা আজও যারা ঘুমাতে চাই, তাদের মাথার পাশে বসে কোমল স্পর্শে আজও গল্প বলেন লীলা মজুমদার। বর্ণময় বিচিত্র অভিজ্ঞতাপূর্ণ যে নুড়ি পাথরের জীবন আমাদের সে জীবনের গল্প মৃত্যুর পরে আজও যেন লেখেন তিনি। লীলা মজুমদার ব্যতিত আমাদের জীবনের পাকদণ্ডী তাই অর্থহীন ও অসম্পূর্ণ।                                 
 

Developed by DXDasia