লাঙল যার জমি তার : ইতিহাস ছুঁয়ে ফিরছে অতীতের প্রেত

দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এই প্রদর্শনীর উপস্থাপক জে.এন.ইউর স্কুল অফ আর্টস এন্ড এস্থেটিকস

৯৯৩ সালে প্রকাশিত ‘স্পেক্টর্স ডি মার্কস’ গ্রন্থে জাক দেরিদা ‘হন্টলজি’ নামক এক দার্শনিক ধারণার প্রবর্তন করেন। গবেষক মার্লিন কোভেরলেইর মতে ‘হন্টলজি’র সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা হলো বর্তমানের অন্তরে অতীতের উপস্থিতি। এই ধারণা অনুযায়ী অতীত কেবল বর্তমানকে প্রভাবিতই করে না, তা বর্তমানকে ভর করে। তাই অতীতের ভৌতিক উপস্থিতি অনুভব করা যায় বর্তমানের নির্মাণ আঙ্গিকে – তার হয়ে ওঠায়। এবং বর্তমানের মধ্যে দিয়েই ফিরে ফিরে আসে অতীতের প্রেত। গ্রন্থে সোভিয়েত কমিউনিজমের পতনের পর মার্কস-এর পরম্পরা বিষয়ক আলোচনায় এই ধারণার সূত্রপাত ঘটে। কিন্তু কোভেরলেই জানাচ্ছেন, আপাতভাবে জটিল ও অস্পষ্ট হলেও, প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই হন্টলজি দেরিদার দার্শনিক পরিসর অতিক্রম করে বিভিন্ন বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক চর্চা ক্ষেত্রে পৌঁছে যায় ও গভীর প্রভাব ফেলে। এই ধারণাকে কেন্দ্র করে যেমন আজও তৈরি হচ্ছে সাহিত্য থেকে সংগীত, স্থিরচিত্র থেকে চলচ্চিত্র – ঠিক তেমনি, এই ধারণার মাধ্যমে পাঠ করা হচ্ছে সেই সব টেক্সট। কখনও বা এই ধারণাকে ব্যবহার করা হচ্ছে কোনও বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাঠন পদ্ধতি হিসেবে, যা খোদ দেরিদাই করেছেন। সম্প্রতি ১৯৪৬-৪৭ সালের তেভাগা আন্দোলন নিয়ে ‘লাঙল যার জমি তার’ (Langol Jar Jomi Tar) শীর্ষক এক প্রদর্শনীতে হন্টলজির দুর্ধর্ষ প্রয়োগ দেখা গেল।

গোটা দোতলা জুড়ে দেখা যাবে বিভিন্ন ছবি ও নিউজপেপার। এখানে স্থান পেয়েছে সোমনাথ হোর, চিত্তপ্রসাদ ও হরেন রায় কর্তৃক শিল্পকর্ম, পিপল’স ওয়ার ও পিপল’স এজের কাট-আউট এবং বেশ কিছু ঐতিহাসিক স্থিরচিত্র। তাদের ভেতর থেকে ভেসে আসে অশরীরী মানুষের কণ্ঠস্বর – ভৌতিক প্রতিধ্বনি।

এই প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য তেভাগা আন্দোলনের ডকুমেন্টেশন নয়  বরং, কোনও দর্শকের মনে তেভাগার স্মৃতি উস্কে দেওয়া, যে হয়তো এই আন্দোলন সম্পর্কে বিশেষ অবগতই নয়। এখানে প্রদর্শনীর উদ্যোক্তারা চাননি কেবল ঐতিহাসিক তথ্য জোগাতে, সে তো অনায়াসেই ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। তাঁরা তৈরি করতে চেয়েছেন একটি স্পর্শকাতর ন্যারেটিভ, যা দর্শককে সাহায্য করবে তার বিস্মৃতির অতল থেকে ইতিহাসকে কুড়িয়ে আনতে। যা বুঝিয়ে দেবে, আমরা তেভাগার কথা না জানলেও এই আন্দোলন আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে। দর্শক তখন আর নিষ্ক্রিয় পর্যবেক্ষক থাকবে না, হয়ে উঠবে আন্দোলনের শরীক। অতীত এসে ঘিরে ধরবে তার বর্তমান।

লাল ব্যানারে সাদা অক্ষরে লেখা বিখ্যাত স্লোগান: আধি নয়, তেভাগা চাই

প্রদর্শনী কেন্দ্রের একতলা থেকে দোতলায় ওঠার সময় দর্শক দেখতে পাবে বড়ো বড়ো লাল ব্যানারে সাদা অক্ষরে লেখা বিখ্যাত স্লোগান: “আধি নয়, তেভাগা চাই”, “জোতদারের জুলুম চলবে না”, “সার্টিফিকেট প্রথা বাতিল করো”, “বিনা খেসারতে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করো”, “কৃষকদের সকল ঋণ মকুব করো”। উদ্যোক্তাদের তরফে জানানো হয়েছে যে এই স্লোগানগুলি তাঁরা কবিতা পাঞ্জাবির তেভাগা আন্দোলন বিষয়ক বই থেকে সংগ্রহ করেছেন। তবে শিল্পী রণবিজয়ের তুলির টানে স্লোগানগুলি আরও বেশি জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এই পর্যায় থেকেই দর্শক বর্তমান পেরিয়ে অতীতের মধ্যে প্রবেশ করতে আরম্ভ করবে।

পিপলস এজ অ্যান্ড পিপলস ওয়্যার থেকে কাট-আউট

চট্টগ্রামের মৃতপ্রায় মেয়েটির স্বগতোক্তি খোদাই করা সাদা কাপড় (চিত্তপ্রসাদ) [বাঁদিকে] পিপলস এজ অ্যান্ড পিপলস ওয়্যার থেকে কাট-আউট [ডানদিকে]

তেভাগা আন্দোলনে মেয়েদের অবদানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এই প্রদর্শনীতে। আলোচিত ও উদযাপিত হয়েছেন যশোদারানি ও ইলা মিত্রের মতো যোদ্ধারা। এই প্রসঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মেয়েদের একটি ছবির অ্যালবাম ও তাঁদের ভয়েস রেকর্ড।

গোটা দোতলা জুড়ে দেখা যাবে বিভিন্ন ছবি ও নিউজপেপার। এখানে স্থান পেয়েছে সোমনাথ হোর, চিত্তপ্রসাদ ও হরেন রায় কর্তৃক শিল্পকর্ম, পিপল’স ওয়ার ও পিপল’স এজের কাট-আউট এবং বেশ কিছু ঐতিহাসিক স্থিরচিত্র।  তাদের ভেতর থেকে ভেসে আসে অশরীরী মানুষের কণ্ঠস্বর – ভৌতিক প্রতিধ্বনি। যেমন সোমনাথ হোরের ‘এ পেসেন্ট মিটিং ইন এ উইন্টার নাইট’ শীর্ষক উডকাটের প্রবীণ বক্তা দরাজ গলায় বলে ওঠেন, “শোনো, আমার সহযোদ্ধা সাথীরা — আমরা ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি।” ঠিক তখনই তাঁকে ঘিরে বসে থাকা মানুষের দলে যোগ দিতে হবে দর্শককে। আবার যখন একটি দীর্ঘ সাদা কাপড়ের সুতো ভেদ করে বেরিয়ে আসবে চাটগাঁওের কোনও মরণাপন্ন অভাগিনীর সম্বোধন: “শোনো, আমার দেশের মা বোনেরা, তোমাদের ছেড়ে আমি চললাম” – সেই মর্মস্পর্শী বাক্য হয়তো দর্শককে মনে পরিয়ে দেবে ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’র নীতার শেষ আর্তনাদ।

সোমনাথ হোরের চিত্রকর্ম: শীতের রাতে কৃষকদের সভা (কাঠখোদাই চিত্র)

 

তেভাগা আন্দোলনে মেয়েদের অবদানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এই প্রদর্শনীতে। আলোচিত ও উদযাপিত হয়েছেন যশোদারানি ও ইলা মিত্রের মতো যোদ্ধারা। এই প্রসঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মেয়েদের একটি ছবির অ্যালবাম ও তাঁদের ভয়েস রেকর্ড। দর্শক ইলা মিত্র, পোকো ওরাওঁ কিংবা বিনা গুহর মতো আন্দোলনকারীদের ছবি দেখতে দেখতে তাঁদের কণ্ঠস্বর শুনতে পাবে — যে কণ্ঠস্বর অভিমানী নয়, দৃঢ়। এবং যে কণ্ঠস্বর ভেঙে দেয় অতীত ও বর্তমানের বিভাজন।

আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নারীদের ছবির অ্যালবাম, সঙ্গে রয়েছে সেই নারীদেরই কণ্ঠস্বরের রেকর্ড

তেভাগা আন্দোলনে নারীদের অবদান নিয়ে চিত্তপ্রসাদের একটি শিল্পকর্ম

তাই প্রদর্শনীর শেষ পর্বে আমরা ফিরে আসি বর্তমানে, যে বর্তমান অতীত আক্রান্ত। ট্রলি টাইমস পত্রিকার কাট-আউট বলে দেয় তেভাগার পরম্পরা বয়ে নিয়ে চলে ২০২০-২১ সালে সিংহু বর্ডারে আন্দোলনরত কৃষকেরা। তেভাগার মশাল জ্বালিয়ে রাখে শ্রমজীবী, প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু মানুষের লড়াই, শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের বিদ্রোহ, এবং হয়তো দর্শক নিজেও।

‘লাঙল যার জমি তার’ প্রদর্শনীর উপস্থাপক জে.এন.ইউর স্কুল অফ আর্টস এন্ড এস্থেটিকসের শিক্ষার্থীবৃন্দ ও দিল্লি আর্ট গ্যালারি এবং সহযোগিতায় DAG। কিউরেশানের দায়িত্বে রয়েছেন সূর্যাভো, হারশালি, উৎসা, শিবাঙ্গী, জিসান, মুঞ্জরিতা ও দিলের। প্রদর্শনীর স্থান: জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল অফ আর্টস এন্ড এস্থেটিক্স – ১, নিউ দিল্লি। প্রদর্শনীটি চলবে ২৩ মে পর্যন্ত। সময়: সকাল ১০টা থেকে সন্ধে ৬টা।

__________
ছবি: প্রতিবেদক

Developed by DXDasia