কৌস্তভের ৭ বছর বয়সে দাবার সঙ্গে প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন তাঁর বাবা
৫৯তম ন্যাশনাল সিনিয়ার চেস চ্যাম্পিয়নশিপ-এ ৭৮তম গ্র্যান্ড মাস্টারের খেতাব জয় করে আরও একবার সমগ্র বাংলার গর্ব হয়ে উঠলেন কৌস্তভ চ্যাটার্জি (Koustav Chatterjee)। জীবনের প্রথম জিএম নর্ম’টি (GM Norm) তিনি জিতেছিলেন ২০২১ সালে, বাংলাদেশের শেখ রাসেল জিএম ২০২১-এ (Seikh Russel GM Norm 2021)। এরপর নভেম্বর ২০২২-এর প্রথম সপ্তাহে এশিয়ান কন্টিনেন্টাল চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২২ (Asian Continental Championship 2022)-এ জেতেন দ্বিতীয় জিএম নর্ম’টি।
বঙ্গদর্শন.কম-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় আপাত লাজুক ছেলেটি বন্ধুত্বপূর্ণ ভঙ্গিতে মেলে ধরেন তাঁর হৃদয়ের কথা। তিনি আমাদের জানান, ঠিক কতখানি পরিশ্রম আর মানসিক কসরত তাঁকে করতে হয় প্রতিটি দাবা টুর্নামেন্টের আগে। তাঁর জীবনের সঙ্গে ঠিক কীভাবে জড়িয়ে পড়ে দাবা, তা প্রশ্ন করতে তিনি বলেন, “২০১০ সালে যখন আমার বয়স মাত্র সাত, তখন দাবা খেলার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেন বাবা। এর আগে যদিও আমি খেলাটা সম্পর্কে তেমন ভাবে জানতাম না, তবে বিশ্বনাথন আনন্দের নাম শুনেছিলাম; যাঁর গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার ঘটনা সমগ্র বিশ্বকে টলিয়ে দিয়েছিল। প্রাথমিকভাবে এই মানুষটিকে দেখেই অনুপ্রেরিত হয়েছিলাম আমি। এই মানুষটাই তো ভারতবর্ষে দাবা খেলাকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। ধীরে ধীরে আমি জানতে পারি ভারতের দাবা খেলার ইতিহাস সম্পর্কে। জানতে পারি, কীভাবে প্রাচীন যুগে ‘চতুরঙ্গ’ নাম নিয়ে শুরু হয়েছিল দাবা খেলার চর্চা।”
দাবার প্রতি কৌস্তভের আগ্রহ সময়ের সঙ্গে বাড়তেই থাকে। “খেলাটির নানান দিক সম্পর্কে অবগত হতেই আমার কৌতূহল উত্তরোত্তর বেড়ে যায়। আমি ইতিহাস ভালোবাসি। প্রাচীন সময়ের যুদ্ধ বিদ্রোহ সম্পর্কে পড়তে, নতুন নতুন তথ্য জানতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। দাবা খেলা যেন ঠিক তেমনই এক যুদ্ধ, এক মস্তিষ্কের সঙ্গে অন্য এক মস্তিষ্কের। দাবার মজা হল, যুদ্ধ যতই জটিল হয়ে উঠুক না কেন, এখানে জেতবার একটা রাস্তা ঠিক রয়েই যায়। আর এই বিষয়টাই সবথেকে বেশি ভাবিয়েছিল, কারণ আমি বরাবরই জিততে ভালোবাসি।”

বর্তমান বিশ্বে যেখানে নানাবিধ বিক্ষিপ্ত চিন্তাভাবনা রাক্ষসের মতো আমাদের হাতছানি দেয়, সেখানে দাঁড়িয়ে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি মনোযোগ অক্ষুণ্ণ রাখা প্রায় অসম্ভব। টেকনোলজির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গেই এই ঘটনা আরও নিয়মিত হয়ে উঠছে। তবে এসব কোনোকিছুই কৌস্তভকে সাফল্যের পথ থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি। “আমার প্রোডাক্টিভিটি যাতে কমে না যায়, তার জন্য বেশ কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করি আমি। আগে ব্রায়ান ট্রেসি’র তৈরি সিস্টেম ‘ইট দ্য ফ্রগ’ অনুসরণ করতাম। এই বিষয়ে তাঁর অসাধারণ একটি বই রয়েছে। বর্তমানে ‘গেটিং থিংস ডান’ নামের একটি নতুন পদ্ধতি অনুসরণ করছি। আমি দেখেছি, নিয়মমাফিক জীবনযাপন করলে সবরকম কাজের জন্যই সময় পাওয়া যায়। এমনকি যদি খানিকটা সময় মনোরঞ্জনের জন্য ব্যয় করি, তারপরেও অনেকটা সময় থাকে।”
নিজের সব ধরনের প্রয়োজনীয়তার জন্য যথেষ্ট সময় থাকে কৌস্তভের। “আমি চেষ্টা করি প্রতিদিন সকাল ৬.৩০টার মধ্যে ঘুম থেকে উঠে পড়ার। যদিও কোনো কোনোদিন ৭টা হয়ে যায়। এক ঘণ্টা ব্যায়াম করি। তারপর প্রাতঃরাশ সেরে পড়তে বসি। বিকেলবেলাগুলো তোলা থাকে দাবার জন্য। চর্চা ঠিক রাখার জন্য মিডল গেম, এন্ড গেম এবং ওপেনিং-ও খেলি। যেসব দিনে দাবা খেলি না, সেদিন হয়তো বই পড়ি, গান শুনি কিংবা পড়াশুনো নিয়ে বসি। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে খানিকক্ষণের জন্য আমি বই পড়ি অথবা শান্ত কোনো মিউজিক শুনি। এতে ঘুম ভাল হয়। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লে, সকালে তাড়াতাড়ি উঠতেও কোনো অসুবিধা হয় না আমার।”

এত কিছুর মধ্যে স্কুলের চাপ সামলান কী করে? “সত্যি বলতে কমার্স শাখা বেছে নিয়ে দেখলাম, আগের অন্যান্য পড়াশুনোর তুলনায় এটা সহজ লাগছে। আমি বলছি না যে এই স্ট্রিমটাই সহজ, তবে আমার ক্ষেত্রে কমার্সের কন্সেপ্টগুলো অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক মনে হয়েছে। পড়াশুনো আমার কাছে তেমন কঠিন লাগে না। ইকনমিক্স আমার সবথেকে প্রিয় বিষয়। মজার বিষয় হল, বাকিদের কাছে অন্যতম কঠিন বিষয় এটি। তবে আমার যেন মনে হয়, ইকনমিক্স আমাকে বেশ একটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। তাছাড়া বর্তমানে ইউটিউব চ্যানেলগুলো পড়াশুনোর কঠিন বিষয়গুলোকেও খুব সহজে ব্যাখ্যা করে দেয়।”
সদ্য হাইয়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় বসেছিলেন কৌস্তভ। আর তারপরেই ভারত ও বিদেশের একের পর এক ইউনিভার্সিটি থেকে অফার আসছে তাঁর কাছে। এর মধ্যে রয়েছে টেক্সাস, ডালাস-এর অ্যান্থে ইউনিভার্সিটি থেকে আসা একটি সম্পূর্ণ স্কলারশিপের অফার। “আমার ইচ্ছে ছিল ইউএস থেকে স্নাতকোত্তর স্তরের পড়াশুনো করা। তবে এখনই যখন এত ভালো একটা অফার পাচ্ছি, আমি হয়তো স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর – এই দুইয়ের জন্যই ইউএস চলে যাবো।” কৌস্তভ বরাবরই চেয়েছিলেন একজন আইএএস অফিসার হতে। এর জন্য নিয়মিত ইউপিএসসি’র প্রস্তুতি নেন তিনি। সম্প্রতি ইকনমিক্স ও ফাইন্যান্স-এর প্রতি বেশি আগ্রহ অনুভব করছেন। তিনি আশা রাখেন, কোনো না কোনো ভাবে সামাজিক কাজের সঙ্গেও যুক্ত থাকবেন।

তাঁকে যখন জিজ্ঞাসা করা হল, তাঁরই মতো যাঁরা একসঙ্গে পড়াশুনো ও স্বপ্নকে ব্যালেন্স করতে চাইছে তাঁদের তিনি কী পরামর্শ দেবেন! কৌস্তভ বলেন, “বর্তমানে মানুষ সবকিছু নিয়েই অতিরিক্ত চিন্তা করে। ফলে সহজেই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে তারা। আমি বলি, সবকিছু সহজভাবে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। এমনকি আমার শেষ তিনটি রাউন্ড সেভাবে ভালো হয়নি। কিন্তু তবু বিশ্বাস হারাচ্ছি না। জীবনে কিছু ক্ষেত্রে নির্লিপ্ত হওয়া ভীষণ জরুরি।”
দাবার দুনিয়ার শীর্ষে পৌঁছে কৌস্তভ আজ বহুজনের অনুপ্রেরণা। তিনি কি নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বাকিদের সঙ্গে ভাগ করে নেবেন? “আমি বরাবরই নিজের স্কিল বাকিদের শেখাতে চেয়েছি। এখনও পর্যন্ত তেমন সুযোগ হয়নি। তবে নিজে খেলা এবং তা অন্যকে শেখানো, দুয়ের মধ্যে তফাৎ আছে। তাই আমি জানি না কতটা কী পেরে উঠবো। চেষ্টা করে দেখাই যায়।”
নিজেকে সবরকম মোহ থেকে দূরে সরিয়ে বাক্স বন্দি না করেও যে নিজের স্বপ্নের লক্ষ্য পূরণ করা যায়, বর্তমান প্রজন্মের কাছে কৌস্তভ চ্যাটার্জি তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
সাক্ষাৎকার গ্রাহক: সুরঞ্জনা মিত্র
প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে এখানে করুন।