
সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ৬
কলেজস্ট্রিটকে পশ্চিমী শিক্ষার প্রসারের আঁতুড়ঘর বললে অত্যুক্তি হবে না। বাংলার নবজাগরণকে সামনে রেখে সেই সময়কার কলকাতার বেশকিছু যুক্তিবাদী ব্যক্তিগণ ভোরের আলোর মতো কলেজস্ট্রিট অঞ্চলে যে ক’টি স্কুল গড়ে তুলেছিলেন তার অন্যতম হল ‘হেয়ার স্কুল’। ১৮১৮ সালে সাধারণ এক স্কটিশ ঘড়ি ব্যবসায়ী, ডেভিড হেয়ার তাঁর স্বপ্নকে বাস্তব করার জন্যই গড়ে তুলেছিলেন এই স্কুল।
২০১৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর হেয়ার স্কুল ২০০ বছরে পা রেখেছে। সময়টা নেহাত কম নয়। এই সময়ের মধ্যে বাংলায় ঘটে গেছে অনেক ঘটনা। সেই ঘটনাকে সাক্ষী রেখে আজও অম্লান স্মৃতি নিয়ে কলেজ স্ট্রিটে দাঁড়িয়ে আছে হেয়ার স্কুল। আর এই স্মৃতিরই আরেকটি উপাদান হচ্ছে ‘ডেভিড হেয়ার ডে’। প্রতিবছর ১ সেপ্টেম্বর, হেয়ার স্কুলের যেদিন প্রতিষ্ঠা দিবস, সেই দিনটিকে ডেভিড হেয়ার ডে বলে উদযাপন করে হেয়ার স্কুল-এর শিক্ষক ও ছাত্ররা। আধুনিক শিক্ষাদানের ভাবনা নিয়ে ডেভিড হেয়ার যে হেয়ার স্কুল তৈরি করেছিলেন আজও সেই ধারণাকে সামনে রেখেই এই স্কুলে শিক্ষা দান চলে।

অতীতে বহু কৃতি ছাত্র এই স্কুল থেকে পাশ করে বেরিয়েছেন। যাঁরা সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন এবং আধুনিক ভাবনার মাধ্যমে সমাজকে আধুনিকতার বন্ধনে এবং যুক্তিবাদী শিক্ষায় লালন করতে পেরেছেন। এখনও এই স্কুল থেকে প্রতিবছর বহু কৃতি ছাত্র পাশ করে বের হচ্ছেন যাঁরা সমাজকে সমৃদ্ধ ও সুসমন্বিত করে চলেছেন।
হেয়ার স্কুলের পরিবেশ নিয়ে গর্ব করেন এখানকার প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্ররা। করবেন নাই বা কেন? কলেজ স্ট্রিটের মতন জায়গায়, অত বড়ো স্কুল ভবন, তেমনি প্রকাণ্ড স্কুলের মাঠ, সামনে প্রেসিডেন্সি কলেজ। ছাত্রদের বড়ো হয়ে ওঠার জন্য এর থেকে আদর্শ পরিবেশ আর কিইই বা হতে পারে।

হেয়ার স্কুলের নাম নিয়ে একটি কাহিনি আছে। কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটি এবং হিন্দু কলেজ (যা পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ হয়) প্রতিষ্ঠা করার পর ডেভিড হিন্দু কলেজটির ঠিক বিপরীতে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। স্কুলটির নাম প্রথমে ছিল যথাক্রমে অরপুলি পাঠশালা ও কলুটোলা ব্রাঞ্চ স্কুল। তার থেকে পরে ১৮৬৭ সালে পিয়ারীমোহন বন্দোপাধ্যায়ের সময়ে সেই নাম বদলে নাম রাখা হয় ‘হেয়ার স্কুল’ ।
হেয়ার স্কুলের প্রাক্তন পড়ুয়াদের তালিকাটিই প্রমাণ করে হেয়ার স্কুল বঙ্গ সমাজের রত্নপ্রসবিনী। অগনিত ছাত্র এখনও ছড়িয়ে রয়েছেন দেশ-বিদেশে, যাঁরা হেয়ার স্কুলে পড়তেন। এখনও বহু প্রাক্তন ছাত্র কলেজ স্ট্রিট এলে হেয়ার স্কুলের সামনে দু’মিনিট দাঁড়িয়ে যান। হেয়ার স্কুল যে তাঁদের আত্মার আত্মীয়। স্কুলের পরিবেশটাই প্রাক্তন ও বর্নমান ছাত্রদের বারবার টানে। আর হবে নাই বা কেন? এই হেয়ার স্কুল ও প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলিত চৌহদ্দীর মধ্যেই রয়েছে কলকাতার বৃহত্তম স্কুল চত্বরটি।

সাদা ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্য ভাবনায় তৈরি স্কুলটির ছাদ অনেকটাই উঁচু। জানালার বদলে খালি বড়ো বড়ো দরজা ও চওড়া অলিন্দ আছে স্কুল ভবনটিতে। শুরুর দুটি তলার উপর ঐতিহ্যময় প্রাচীন স্থাপত্যটির সঙ্গে সমঞ্জস্য রেখে একটি তৃতীয় তলা বানানো হয়। তারও পরে একটি ছোট আধুনিক স্থাপত্যের আরেকটি ভবন যোগ করা হয় যা নিয়ে ছাত্র মহলে কিছুটা অসন্তোষ ছিল। পূর্বে স্কুলছাত্রদের দুটি খেলার মাঠ ছিল পরে একটি প্রেসিডেন্সি কলেজের কাছে হস্তান্তরিত হয়। তবে সব কিছুর পরও হেয়ার স্কুল স্বমহিমান এখনও দাঁড়িয়ে আছে কলেজস্ট্রিটে।
হেয়ার স্কুলের মাঠেই ১৮৭৭ সালে প্রথম ফুটবল খেলার প্রচলন করেন এই স্কুলের ছাত্র নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী যাকে ভারতীয় ফুটবলের জনক বলা হয়। ভারতের প্রথম ফুটবল খেলার ঐতিহ্যবাহী এই মাঠের বর্তমান নামকরণ তাঁরই নামেই হয়েছে।
হেয়ার স্কুলে পড়েই বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন রাজনারায়ণ বসু, অক্ষয়কুমার বড়াল, রামতনু লাহিড়ী, দীনবন্ধু মিত্র, পিয়ারী মোহন সরকার থেকে স্বপ্নময় চক্রবর্তীর মত সাহিত্যিকরা। নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ, অভিনেতা গুরু দত্ত, পরিচালক ও অভিনেতা প্রমথেশ বড়ুয়া, স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, কলকাতার প্রথম শেরিফ দিগম্বর মিত্র, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, দাবায় গ্র্যান্ডমাস্টার দিব্যেন্দু বড়ুয়া -এরা সবাই হেয়ার স্কুলেরই প্রাক্তনী।
স্বপ্নময় চক্রবর্তীর কথায়, “এখানে যে সমস্ত মানুষরা পড়াশোনা করেছেন, আমি যখন এই স্কুলে পড়তে ঢুকি অনেকের ব্যাপারেই জানতাম না। পরে জেনে বেশ শ্লাঘা বোধ করতাম। হেয়ার স্কুলে এক মৌলবী ছিলেন, ছাত্রদের ইচ্ছে হলে তাঁর কাছে আরবি পড়তে পারতো। তখন তো জানতাম না বড়ো হয়ে লেখক হব, নাহলে সংস্কৃত’র বদলে আরবি শিখতাম।”
হেয়ার স্কুলের ২০০ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ থেকে বর্ষব্যাপী উদযাপন হয়েছিল। যা চলেছিল ১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত। ২০১৭-র ১ সেপ্টেম্বর এক বিশাল বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছিল যা স্কুল প্রাঙ্গণে ডেভিড হেয়ারের মূর্তির পাদদেশে মাল্যদান ও ব্যান্ডের ঐক্যতানে “ধনধান্যপুষ্পেভরা” গানের মাধ্যমে সূচনা হয়। বিধান সরণি ধরে বিবেকানন্দ রোড হয়ে যথাক্রমে রাজা রামমোহন সরণি ও মহাত্মা গান্ধী রোড হয়ে সেই শোভাযাত্রা শেষ হয়েছিল ডেভিড হেয়ারের সমাধিসৌধ প্রাঙ্গণে যা বর্তমানে কলেজ স্কোয়ারের মধ্যে অবস্থিত। এই সমাধিতে মাল্যদান করেছিলেন স্কুলের তৎকালীন সমস্ত শিক্ষক, শিক্ষিকা, বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্ররা। এরপর স্কুল প্রাঙ্গণেই সেদিন এই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন প্রধান শিক্ষক, প্রাথমিক ও দিবা বিভাগের সমস্ত শিক্ষক শিক্ষিকারা, দিব্যেন্দু বড়ুয়ার মত অনেক সুপ্রতিষ্ঠিত প্রাক্তনীরাও সেদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এরই পাশাপাশি সারাদিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়েছিল দুটি বিজ্ঞান প্রদর্শনী যা ১ থেকে ৩ সেপ্টেম্বর এই ৩দিন ধরে চলেছিল। একটি প্রদর্শনী আয়োজিত হয় এই স্কুলেরই কিছু উৎসাহী ছাত্রদের উদ্যোগে হেয়ার স্কুল সায়েন্স সেন্টার থেকে। অন্যটির আয়োজক ছিল ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ সায়েন্স মিউজিয়াম, যার বিষয়বস্তু ছিল “রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞান ভাবনা”। সন্ধ্যায় আয়োজিত হয়েছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যেখানে স্কুলের ছাত্ররা নৃত্যনাট্য, গান, আবৃত্তি করেন। তারপর বিখ্যাত লোকশিল্পীদের লোকসঙ্গীত ও কবিগানের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হয়। বহু প্রাক্তন শিক্ষক ও প্রাক্তন ছাত্রদের পুনর্মিলনের মাধ্যমে এই মহান শিক্ষামন্দিরের ঐতিহ্য আরও সমৃদ্ধ হয় এই ২০০ বছরের উৎসবে। এই ধারা এখনও পর্যন্ত বহমান রয়েছে।

কে জানতো নিজের দেশ ছেড়ে ভারতে এসে এক স্কটিশ ঘড়ি ব্যবসায়ী এ দেশবাসীকে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য যে স্কুল প্রতিষ্ঠা করবেন সেই স্কুলটিইই একদিন হয়ে উঠবে দেশের তথা বাংলার নবজাগরণের কারিগর তৈরির অন্যতম পীঠস্থান! আর এই স্কুল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ছিল হিন্দু কলেজের জন্য উপযুক্ত ছাত্র তৈরি করা। আসলে এভাবেই বোধহয় ইতিহাস তৈরি হয়।

হেয়ার স্কুল মানেই মানবিকতার প্রসার, যা আজও ঘটে চলেছে। হেয়ারিয়ান্সদের এটাই গর্ব। “প্রতিপক্ষ নয় তোমার ছাত্র”, এই বোধ থেকে প্রথমদিন থেকে আজ পর্যন্ত হেয়ার স্কুলের শিক্ষকরা ছাত্রদের পড়িয়ে চলেছেন। তাই ভালোবাসা, শিক্ষা ও অনুশাসন, হেয়ার স্কুল তার ছাত্রদের যা দিয়েছে সমাজ ফিরে পেয়েছে তার সত্যিকারের ফসল।
শিক্ষার পাশাপাশি স্কুলে এখন নানা রকম প্রজেক্টের কাজ চলে। তাতে পরিত্যক্ত কাগজ দিয়ে হ্যন্ডমেড কাগজ তৈরি, বাগান করার মতো কাজ স্কুলে ছাত্ররাই করে। প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় স্কাউটের। এই শিক্ষা থেকেই এখনও সপ্তাহে একদিন স্কাউটের ছেলেরা স্কুল ভবন পরিস্কার করে।
তবে এখন ইংরেজি মাধ্যমে পড়ার ঝোঁক বেড়েছে। তার উপর সরকারি স্কুলে লটারিট মাধ্যমে ভর্তির প্রক্রিয়া চালুর পর থেকে হেয়ার স্কুল তার পূর্ব গরিমা কিছুটা হলেও হারিয়েছে। তাই বলা যায় ২০০ বছর অতিক্রম করেও হেয়ার স্কুল কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে আজ। তাই এই স্কুলের প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রদের ভাবনা একটাই, তাহলে কি সবসময় সাফল্যের প্রথম সারির প্রথম তালিকায় থাকা, সব সময়ের জন্য প্রাসঙ্গিক হেয়ার স্কুলের নাম ক্রমেই লুপ্ত হতে চলেছে? তবে এই স্কুলের শিক্ষকরা মনে করেন প্রবহমান ঐতিহ্যকে বজায় রাখার দায়িত্ব শিক্ষকদের পাশাপাশি ছাত্র ও অভিভাবকদেরও আছে। তবে কলেজস্ট্রিটের সর্বত্র যেমন ছড়িয়ে আছে মহামতি ডেভিড হেয়ারের স্মৃতি, সেই স্মৃতিকে মনে রেখেই হেয়ার স্কুলকে এখনকার স্কুলের শিক্ষক ও ছাত্ররা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন বলেই তাঁরা বিশ্বাস করেন। বাকিটা সময় বলবে, যতই হোক সময়ই তো হেয়ার স্কুলকে মহিমান্বিত করেছিল একদিন।
লেখা ও ছবি সূত্রঃ কলকাতার গর্ব হেয়ার স্কুল ও স্কুলের প্রাক্ত, বর্তমান ছাত্রবৃন্দ
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।
