কালিম্পঙের আর্ট ক্যাফে এবার কলকাতায়

ক্যাফেটি চালু হয়েছিল ২০২৩ সালের ৩ অক্টোবর

যখন ক্যাফেতে গিয়ে পৌঁছালাম, বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামছে। গোধূলির আলো সবে লেগেছে লাল-সাদা রঙা বাড়ির দেওয়ালে। ৮০ বছরের পুরোনো বাড়ি। বড়ো বড়ো জানালা, কাঠের দরজা, দরজার দুইধারে থামের কাঠামো। বাড়ির সামনের ফুটপাথে সুবৃহৎ আর সুদৃশ্য আলপনা। এই বাড়ির একতলাটাই এখন ক্যাফে। নাম আর্ট ক্যাফে (Art Café)। পাঠকদের অনেকেই নিশ্চয়ই কালিম্পঙের আর্ট ক্যাফের সঙ্গে পরিচিত। কালিম্পং আর্ট ক্যাফে (Kalimpong Art Cafe)-র আদলে তৈরি সেই আর্ট ক্যাফেই এবার খুলে গেছে কলকাতায়। দক্ষিণ কলকাতার লেক মার্কেট সংলগ্ন এলাকার ডঃ শরৎ ব্যানার্জি রোডে অবস্থিত এই ক্যাফেটি।

২০২৩ সালের ৩ অক্টোবর এই ক্যাফেটির উদ্বোধন হয়েছিল। সুমন চেন (Suman Chen) এবং শাহিরা (Shahira), দুজনে এই ক্যাফেটির অংশীদার। “আমরা কালিম্পঙের আর্ট ক্যাফেতে গিয়েছিলাম। ওখানকার পরিবেশ, খাবার, ওঁদের আতিথেয়তা, ব্যবসায়িক মূল্যবোধ আমাদের খুব ভালো লেগেছিল। তাই আমরা ঠিক তেমনই একটা ক্যাফে এখানে চালু করার পরিকল্পনা করেছিলাম”, বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন সুমন। তিনি আরও জানান, “আমরা এখন একটা পরিবারের মতো হয়ে উঠেছি। কালিম্পং ও কলকাতা, দুই জায়গাতেই ক্যাফের মেনু প্রায় সমান। কলকাতার মেনুতে কিছু ফ্লেভার যোগ বা বদল করা হয়েছে এখানকার খাদ্যরসিকদের কথা ভেবে।” 

জিভে জল আনা মেনুতে রয়েছে হরেক স্বাদের বার্গার, পাস্তা, পিৎজা, মোমো, স্যান্ডউইচ, স্যালাড, স্মুদি ইত্যাদি। পানীয়ের মধ্যে মোহিতো, চা, শেকস, কফি। জানা গেল, ক্যাফের কিচেনেই সমস্ত কিছু রান্না করা হয়। সুমনের কথায়, “আমরা স্বাস্থ্যকর ও সুস্বাদু খাবার দেওয়ার চেষ্টা করি। আমাদের মোটো হলো আর্ট থ্রু ফুড।” গোটা ক্যাফে জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে মন ভালো করা আবহ। ক্যাফের অন্দরসজ্জাতেও শিল্পের ছোঁয়া। প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বাংলার নিজস্ব শিল্পধারাকেই। বেতের ঝুড়ি দিয়ে সাজানো হয়েছে ক্যাফের সিলিং। সিলিং থেকে ঝোলানো বাল্বের নরম আলোতে ক্যাফেটি যেন আরও সুন্দর হয়ে উঠেছে। বেতের মোড়া আর চেয়ার, কাঠের টেবিল, কুশন, দেওয়াল আলমারিতে মাটির হস্তশিল্পের বিভিন্ন সামগ্রী, হলুদ রঙা কাঠের মেঝে, জানালায় লাল রঙের ডিজাইনার পর্দা আর টেবিলের পাশে রাখা স্ট্যান্ডে একটি গিটার। সব মিলিয়ে ক্যাফেটি সত্যিই আর্টিস্টিক। 

তবে কলকাতা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে হাজারো ক্যাফে। প্রায়শই নতুন নতুন ক্যাফে খুলে যাচ্ছে ইতিউতি। তার মধ্যে আবার একটা নতুন ক্যাফে কেন? সুমনের জবাব, “আমরা যদি গ্রাহককে সুস্বাদু আর স্বাস্থ্যকর খাবার দিতে পারি, আর তার দাম যদি থাকে নাগালের মধ্যে, তাহলে মানুষ আসবেনই। তাছাড়া কলকাতার মানুষ পাহাড়ি ক্যাফের খাবার পছন্দ করেন। আমরা তাই প্রতিটি খাবারের মধ্যে পাহাড়ি স্বাদ রাখার চেষ্টা করছি। এমনকি কালিম্পঙের ক্যাফে থেকে শেফরা এসে এখানকার শেফদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গেছেন। তাঁরা আবার আসবেন। আমরা কিছু বিশেষ মশলা আর চিজ কালিম্পং থেকে নিয়ে এসেছি।” তাঁর কথার সমর্থন পাওয়া গেল একজন ক্রেতার কাছ থেকে। তিনি অর্ডার করেছিলেন প্যান ফ্রাইড ডাম্পলিং। খাওয়ার পর তিনি সুমনকে জানালেন, “আমি বহুবার পাহাড়ে গেছি। পাহাড়ের মোমো, ডাম্পলিং আমার খুব প্রিয়। তবে এবার থেকে সেসবের স্বাদ নিতে আর পাহাড়ে যেতে হবে না।”

স্মুদি বোল- মরসুমি ফল, নারকেলের দুধ, মধু, বাদাম ইত্যাদি দিয়ে তৈরি

শুধু অন্দরসজ্জাতেই নয়, এই ক্যাফে শিল্পকে ছুঁয়ে থাকতে চাইছে আরও অনেকভাবে। সুমন বলেন, “আমরা চাই এখানে শিল্পী, গায়করা এসে পারফর্ম করুন। সেই সংক্রান্ত পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন পাহাড়ি মশলা রাখার কথা ভাবা হচ্ছে একটা কাউন্টারে। সেখান থেকে মশলা কেনাও যাবে। তাছাড়া বিভিন্ন প্রান্তিক চাষিদের উৎপাদিত দ্রব্য বিক্রি করার কথাও ভাবছি আমরা। এইসব খাদ্যদ্রব্য আর আনুষঙ্গিক দ্রব্যকে আমি শিল্পদ্রব্য হিসাবেই অভিহিত করতে চাই, কারণ রান্না আসলে একটি শিল্পই।” জানালেন, শীতের মরসুমে কেকও জুড়বে ক্যাফের মেনুতে। সেই কেক তৈরি হবে ক্যাফের কিচেনেই।  

ছোটো ছোটো টবে রাখা বিভিন্ন পাতাবাহারি গাছে সাজানো ৩০ সিটের এই ক্যাফে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া আর সুস্বাদু খাবার চেখে দেখার আদর্শ স্থান বললে একেবারেই অত্যুক্তি হবে না। পরবর্তীকালে চেয়ারের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ১-২ কিলোমিটারের মধ্যে খাবারের ডেলিভারিও করা হয়। চালু হওয়ার পর থেকেই নজর কেড়েছে এই ক্যাফে। যতক্ষণ ক্যাফেতে ছিলাম, লোকের যাতায়াত লেগেই ছিল। ক্যাফের ঠিকানা ১৯সি, শরৎ ব্যানার্জি রোড, লেক মার্কেট, কলকাতা- ৭০০০২৯। ক্যাফেটি খোলা থাকে সপ্তাহের প্রতিদিনই, দুপুর বারোটা থেকে রাত ৯:৩০টা পর্যন্ত। বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের দুর্গাপুজো যে গলিতে হয়, সেই গলির শেষপ্রান্তে কলকাতা-কালিম্পং সম্পর্কের একটি স্যুভেনির হিসাবে বিগত দুই বছর রমরমিয়ে চলছে কলকাতার আর্ট ক্যাফে।

 

Post Tags
Developed by DXDasia