আমার নাম চন্দন বসু, পিতা জ্যোতি বসু

বাবার সঙ্গে আমার অনেক অমিল। কিন্তু কিছু মিলও আছে। আমার বাবা ঠাকুরদার পথে হাঁটেননি

আমার নাম চন্দন বসু। পিতা জ্যোতি বসু। ১৪২২ সালের ২৪ অগ্রহায়ণ (১১ ডিসেম্বর ২০১৫) ঘোর অমাবস্যার রাতে আমি মায়ের হাতে সোনার খাঁড়া তুলে দিয়েছি। পঞ্জিকা মতে তাতে অষ্টোত্তর শনি এবং বিংশত্তরি বুধের দশা কাটবে। খাঁড়ার দাম পঞ্চাশ লক্ষ টাকা। জৈনদের আসলি চাঁদি সোনার দোকানে বিশেষ অর্ডার দিয়ে সেই খাঁড়া তৈরি হয়েছে। কয়েক বছর আগে তার বর্ষপূর্তি হয়ে গেল। কিন্তু তা নিয়ে কারও কোন তাপ উত্তাপ নেই।

বাঙালি যে আত্মবিস্মৃত জাতি সে কথা আমি নিজের জীবন দিয়ে বুঝলাম। মায়ের হাতে খাঁড়া অনেকেই দেয়। কিন্তু আমি সেই কাজ করতেই হইহই পড়ে গেল। ফেসবুক ট্যুইটারে শুরু হল ফোঁড়ন কাটা। আপনি কি দিদির মঙ্গল কামনায় খাঁড়া দিলেন? তবে কি এবার রাজ্য সভায় যাবেন? ৩৪ বছরের বাম জমানায় যা গুছিয়েছেন, এবার কি তার প্রায়শ্চিত্ত হল? ওই সময়ে বামেদের একটা প্লেনামের আয়োজন হয়েছিল কলকাতায়। তবে কি আপনি প্লেনামের সাফল্য কামনা করে খাঁড়া দিলেন?

প্লেনাম বলতেই একটা কাহিনি মনে পড়ল। তখন গাড়ুলিয়া প্লেনাম চলছিল। রাতে খাবার টেবিলে বাবাকে জানালাম, খোকনদা বলেছে প্লেনাম হল ভিয়েতনামের একটা গ্রাম। যেখানে জোর মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। বাবার বরাবরই একটা ব্ল্যান্ড লুক ছিল। তিনি সেইভাবে আমার দিকে তাকালেন। মনে হল আমি যেন ভিন্ন গ্রহ থেকে এই মাত্র হিন্দুস্থান পার্কে নেমেছি।

বাবার সঙ্গে আমার অনেক অমিল। কিন্তু কিছু মিলও আছে। আমার বাবা ঠাকুরদার পথে হাঁটেননি। আমিও বাবার পথে চলিনি। বাবার দুই বিয়ে, আমারও তাই। আমি বাবার একমাত্র ছেলে। আমারও একটি ছেলে। তবে আগের পক্ষের তিন কন্যা আছে। তবে বাপের ব্যাটা হয়ে, আমার সুবিধের চেয়ে অসুবিধে হয়েছে বেশি। বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি ঠাকুর দেবতা মানেন না। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ বাপ কা বেটা হয়ে তোমার কেন দেব-দ্বিজে ভক্তি? তাহলে আমি যাব কোথায় বলুন তো! কম্যুনিস্ট পার্টিতে পরিবার তন্ত্র চলে না। তাই আমি কম্যুনিস্ট পার্টির ছায়া মাড়াইনি। কিন্তু পাড়ার লোক বলত বাপ এত বড়ো নেতা, তবে তার ছেলে কেন পার্টি করবে না? সারাজীবন এই দু’মুখো জনমতের চাপে কেবল চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে গেলাম। বাবা মারা যাওয়ার পর গয়ায় পিণ্ড দিতে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন উঠল সারা জীবন বাপের পিণ্ডি চটকে এখন আবার গয়া কেন?

বাবার পিণ্ডি তো চটকাল তার নিজের পার্টি। সবাই বলল তার প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত। কিন্তু তার নিজের পার্টি বলল, অমন কাজ কখনও নয়। তাতে দেশের বিপ্লব পিছিয়ে যাবে। আজব কথা! যে কাজটা কোনোদিন একচুলও এগোয়নি, সেটা পেছনোর কথা আসে কোথা থেকে?

বাবা জনসভায় ভাষণ দেওয়া ছাড়া পাড়ত পক্ষে কোনো কথা বলতেন না। বাবাকে কেউ কোনোদিন প্রাণ খুলে হাসতেও দেখেনি। নিন্দুকেরা বলে বাবা নাকি ইন্দিরা গান্ধীকে প্রপোজ করেছিলেন, তাতে ইন্দিরা এত জোরে না বলেছিলেন যে বাবার কথা- হাসি দুটোই বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু আমি আসল কারণটা অনেক পরে বুঝেছি। বাবার পার্টি এবং বাবার স্ত্রী (অর্থাৎ আমার মা) রোজ তাকে এত পরস্পরবিরোধী সার্কুলার ধরাতেন, যে বাবা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বোবার শত্রু নেই।

আমার কথায় ফিরে আসি। আমি কেন কালী ভক্ত হলাম? তার প্রধান কারণ হল, বাবাকে দেখে। বাবা এবং তার পার্টি বরাবর ভালো কথা বলে গেল। কিন্তু দেশ হাঁটল উল্টো পথে। পাবলিক বুঝে গেল, এদের কথায় কোনো কাজ হবে না। পার্টির লোকেরাও বুঝল, পরিস্থিতি অনুযায়ী এগোতে হবে। ঘুষ আটকানোর জন্য কিছুটা ঘুষ পার্টির লোকদের খেতে হবে। শ্রেণি সংগ্রামের জন্যই শ্রেণি বিভেদ বাড়াতে হবে। ধর্মের দাপট কমাতে হলে, শনি- শীতলায় মন দিতে হবে। কারণ এরা প্রান্তিক মানুষের দেবতা।

নিজেকে দিয়েও আমি অনেক কিছু ঠেকে শিখেছি। অশোক কুমার নাইটের দিন রবীন্দ্র সরোবরের গোলমালে আমার নাম জড়িয়ে গেল। আমি বাবার বকুনি খেলাম। কিন্তু বদনাম পুঁজি করে যে সেলিব্রেটি হতে হয় তেমন পাকা বুদ্ধি আমার তখন ছিল না। সেই বুদ্ধি আমার হল, বাবা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর।

মাধব রাও সিন্ধিয়া আমাকে এয়ার ইন্ডিয়ার গভর্নর করেছিল। বুঝে গেলাম, আমি উপলক্ষ মাত্র, আসলে তিনি বাবাকে সন্তুষ্ট করতে চান। করুন সন্তুষ্ট। দেখা গেল পার্টির মন্ত্রীরাও আমাকে সন্তুষ্ট করতে চায়। করুন সন্তুষ্ট। বাবাও বুঝলেন তিনি বেঁচে থাকতে বিপ্লব হবে না। মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়ার পরেও তিনি ইন্দিরা ভবনে থেকে গেলেন। তার কনভয়ে গাড়ির সংখ্যা কমল না। দলের সেন্ট্রাল কমিটি তার বাড়িতে গিয়ে মিটিং বসাল। সুভাষ চক্রবর্তী সকাল সন্ধে বাবার পায়ের ধুলো নিতে লাগল। প্যারেড গ্রাউন্ডেও লোক থই থই করতে লাগল।

বাবা কোনোদিন ফুল বেলপাতা নিয়ে অঞ্জলি দেননি। কিন্তু ঘড়ি ধরে আমার বাড়ির পুজোয় প্রসাদ খেতে আসতেন। বস্তুবাদী বলে কথা। আমি বুঝলুম বাবা মার্ক্সবাদী বর্মের আড়ালে পার পেয়ে যাবেন। ফাঁদে পড়ব আমি। আমি ভাবের ঘরে চুরি না করে মায়ের পায়ে জবা হয়ে ফুটতে চেয়েছি।

এই পরিচয় নিয়ে সময় মত কালীঘাটের মন্দিরেও ঢোকা যায়। আলিমুদ্দিনেও যাওয়া যায়। বাবা বুঝতেন বোবার শত্রু নেই। আমি বুঝেছি জবার শত্রু নেই।

*মতামত লেখকের নিজস্ব

Developed by DXDasia