জয়নাল আবেদিন : এমন কত কবি মরে গেল চুপি চুপি একা একা

প্রান্তিক বাংলার কবি জয়নাল আবেদিন

সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি বলছে— খেমা দে। ঘুমে ঢুলুঢুল চোখ। হ্যারিকেনের ম্লান আলোয় লিখতে বসেছেন কবি। কলমের আঁচড় টানছেন। মাথার মধ্যে ঘুরছে— কাল ভোরে আবার কাজে বেরোতে হবে। দেরি হলেই বিপদ। এসব টানাপোড়েনের কালি দিয়ে কবি লিখছেন— 

“আমার কোনও আয়না নেই/ পুকুরের জলে, রোদের প্রতিবিম্বে চুল আঁচড়াই/ মুখ দেখি।”

এই দৃশ্য কবি জয়নাল আবেদিনের জীবনে ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। যেভাবে গ্রাম্য কবি শহুরে আলোর কেন্দ্রবিন্দু থেকে সরে একটু একটু করে গড়ে তোলেন যাপনের স্বকীয় মিনার। ক্লান্তির ধারদেনা সামলে যেটুকু বাঁচে সেটুকুও সানন্দে তুলে দিতে চান পাঠকের হাতে। যদি কেউ পড়ে। কখনও পড়ে৷ মিলে যায় পাঠক-কবির যোগসূত্র। ঘুম কামাইয়ের কবিতা নির্মাণের প্রক্রিয়া বড়ো করুণ। কবিতা বিলাসিতা মনে হয় সেখানে। ভাঙাচোরা টেবিলে ভর দিয়ে জয়নাল আবেদিন লিখছেন—

“ধান কাটতে কাটতে ফসল কাটার গান ভুলে যাই/ ছেলের বই হাতে নিলে পাঠশালার কথা মনে করতে পারি না;/ ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার পর ওষুধের নাম জানা হয় না।”

তাঁর বাবা ছিলেন দিনমজুর। স্বভাবতই অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা। প্রাথমিক শিক্ষকের ট্রেনিং নেওয়ার পরও চাকরির জন্য ঘুরে বেড়ানোর পর যখন চাকরি জুটলো না, জয়নাল বুঝলেন অন্য পথ বাছতে হবে। শুরু হল কেক-রুটি ফেরির কাজ। এরপর সংবাদপত্র বিলির কাজ তাঁর পেশা হয়ে ওঠে। অসম্পূর্ণ ঘুম ফেলে রেখে ঘন কুয়াশার স্তর ফুঁড়ে সাইকেল নিয়ে কাজে বেরোচ্ছেন কবি। পেটে ক্ষুধা, মাথার মধ্যে অভাবের দিনবদলের তাগিদ। এই দৃশ্যময়তাই সেই মুহূর্তে কবিতার জন্ম দিচ্ছে। কবিতা হয়ে উঠছে প্রতিটি প্যাডেলের ঘূর্ণন। শুধু অভাব-অনটন নয়, এ কবিতা কর্মযোগের। কবিতা তখন আর বিলাসিতা নয়। ‘দশটা-চারটের অফিস করে অবসরে কিছু লিখবো’-র মতো সুখকর অবস্থান নয়৷ খেটে খাওয়া শ্রমিক-মজুরের প্রখর বাস্তব দিনযাপন। বাস্তবে ফেরিওয়ালার পোশাক গায়ে ফেরিওয়ালা কবিতায় কবি জয়নাল লিখছেন—

“আমি সেই ভোরবেলা যে ভোরে পায়চারি করে/ আমি সেই দুপুরবেলা, যে দুপুরে ভাতঘুম দেয়।”

প্রাথমিক শিক্ষকের ট্রেনিং নেওয়ার পরও চাকরির জন্য ঘুরে বেড়ানোর পর যখন চাকরি জুটলো না, জয়নাল বুঝলেন অন্য পথ বাছতে হবে। শুরু হল কেক-রুটি ফেরির কাজ। এরপর সংবাদপত্র বিলির কাজ তাঁর পেশা হয়ে ওঠে।

বাংলা কবিতায় শ্রমের জয়গান নানাভাবে হয়েছে। শ্রমিকের জয়গান হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশই দূর থেকে দেখা টুকরো টুকরো অনুভূতি জুড়ে শ্রমিক-মজুরের বন্দনা। জয়নাল আবেদিন সেই বিরল বাঙালি কবিদের একজন, যিনি নিজে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে করতে নিজের অনুভূতির কথা লিখে গেছেন। স্কুলের ম্যাগাজিনে কবিতা ছাপা দিয়েই তাঁর লেখার হাতেখড়ি। খুব সম্ভবত ১৯৮৪ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়। এরপর নানা পত্রিকার সূচিপত্রে তিনি বিচরণ করতে থাকেন। বলাই বাহুল্য আজকাল, কলম, নন্দন, কৃত্তিবাস, আনন্দমেলা, সন্দেশ, বর্তমান, আরম্ভ, সংবাদ প্রতিদিন ইত্যাদিতে জয়নাল আবেদিনের কবিতা নিয়মিতভাবে প্রকাশ পেতে লাগলো।

জলঙ্গি নদীতে সাঁতরে বড়ো হয়ে ওঠা জয়নালের কবিজীবনে এই নদী এবং তাঁর গ্রামের বড়ো ভূমিকা ছিল। কবিদের একটি নিজস্ব নদী থাকে৷ সে নদী আপন হয়ে ওঠে। গ্রাম্য জীবনের নানা দিক, শিশির বিন্দুতে রোদের বিচ্ছুরণ, মেঠোপথ, শিশুমুখ ইত্যাদি যেভাবে ছুঁয়ে যায়। সেই অকৃত্রিম ভাবনারা এসেছে কবিতায়—

“ওলটপালট হয় না কিছুই। একদিকে গরু চরে বেড়ায়/ অন্যমাঠে ফসলের দানা।/ দুইয়ের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে/ সরু একটি আলপথ।”

সাতের দশকের শেষভাগ। বন্ধুদের সঙ্গে শুরু করলেন লিটল ম্যাগাজিন। শুধু আবেগ দিয়ে ম্যাগাজিন বাঁচে না। টাকা-পয়সার আয়োজন লাগে৷ নিজ জীবনে প্রশিক্ষণ নিয়েও জোটেনি চাকরি। বেকারত্বের জ্বালায় অস্থির। বন্ধ হয়ে গেল ‘পরোয়ানা’ ম্যাগাজিন। টিউশনের টাকা তখন পেট পালতেই কম পড়ছে। এমন তীব্র অভাবের দিন যে কবিতা লেখাকে অপচয় মনে হবে৷ তবু কবিতা ছিল তাঁর বলতে চাওয়ার মাধ্যম৷ কবির যখন কিছুই থাকে না, কবিতারা থাকে৷ 

“আমার কি দুঃসময় যাচ্ছে/ যাকে দেখি, তাকে ধরেই কাঁদি/ গাছের কাছে গেলে/ ঝরিয়ে দেয় পাতা।”

লিটল ম্যাগাজিন করার ইচ্ছে এক নিশির ডাক৷ কিছুতেই পিছু ছাড়ে না৷ সঙ্গত কারণেই লিটল ম্যাগাজিন করার স্বপ্ন মুছে যায়নি। চেয়েচিন্তে চলা জীবনে বন্ধুদের নিয়ে কবি জয়নাল ‘আনন্দম’ নামে আরও একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের স্পর্ধা দেখান। প্রায় বছর চারেক চলার পর এটিও বন্ধ হয়ে যায়। ততদিনে কবি হিসেবে কিছুটা পায়ের তলায় মাটি পেয়েছেন।

আটের দশকের শেষলগ্নে এল তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঘরে নেই বাইরেও নেই আমি’। এই পথ ধরে আরও পাঁচখানা কবিতার বই এসেছে৷ ‘সাঁকোর নীচে জীবন’, ‘ক্ষেত জুড়ে অক্ষর ঘুমায়’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থে তিনি নিজ কবিতাশৈলীর ছাপ রেখেছেন৷ কবি-প্রকাশক সেলিম মণ্ডলের প্রচেষ্টায় ‘তবুও প্রয়াস’ থেকে প্রকাশিত হয় ‘মেঘ দিলাম, বৃষ্টি নামিয়ে নিও’। এরপর ‘অন্তর্গত বাঁশি’ নামে আরেকটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পায়।

জয়নাল আবেদিনের জীবনে আশা-আশঙ্কার পেণ্ডুলাম দোদুল্যমান। অভাব আর কবি জীবনের নিয়ত দোল খাওয়া৷ কবির স্পর্ধা এটাই যে ছিন্ন চাটাইয়ে শুয়ে পাণ্ডুলিপি সাজিয়ে পাঠককে ভরসা দেন— মেঘ নিলাম, বৃষ্টি নামিয়ে নিও। গভীর রাতে একাকী বসে জীবনের হিসেব মেলাতে গিয়ে কবি দেখেন প্রচুর দেনা৷ হিসেব মেলে না৷ 

“হিসেব মেলাই/ কিছুই মেলে না,/ কী পেলাম আর কী পেলাম না।”

ক্ষুধার প্রহরে জ্যোৎস্নার হাতছানি কবিকে ভাবায়– 

“রাতের ভিতর রাত ঘুমিয়ে থাকে/ জ্যোৎস্নাও নামে/ জ্যোৎস্নার ভেতর জীবন নড়ে ওঠে/ ফুল আর বালিশ এক হয়ে যায়৷”

প্রচারবিমুখ কবিজীবন৷ নানান সমস্যায় জর্জরিত। স্বীকৃতির পরোয়া না করে আমৃত্যু লিখে চলা৷ বোধহয় বুঝে গিয়েছিলেন, শহরের দৃষ্টি গ্রামের দিকে ফিরবে, এ আশা না করাই ভালো৷ এই অসাম্যের একমাত্র উত্তর লিখে যাওয়া৷ নতুন গতি, বুলবুল প্রভৃতি পত্রিকার পক্ষ থেকে তাঁকে পুরস্কৃত করা হয়৷ সাহায্যের কিছু উদ্যোগ হয়েছিল, কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়। বার্ধক্যজনিত অসুস্থ শরীরে কাগজ ফেরির খাটুনি বয়ে বেরিয়েছেন। আপোষ কিংবা তোষামোদের স্রোতে নিজেকে ভাষাতে পারেননি। ‘সুবিধাবাদী’ কবিদের তালিকায় নিজের নামটুকু জুড়ে দিতে পারলে হয়তো বার্ধক্য অন্যভাবে কাটতো।

আরও পড়ুন: ‘মাতাল’ তারাপদ

‘সুনীল গাঙ্গুলির দিস্তে দিস্তে লেখা/ কত কবি মরে গেল চুপি চুপি একা একা’ গানে অমোঘ সত্যি লিখেছেন কবির সুমন। এই নাইনের গূঢ় অর্থে চড়ে চলে গেলেন কবি জয়নাল আবেদিন। যাওয়ার দিনেও সেভাবে কেউ পাশে ছিলেন না। প্রায় চল্লিশ বছরের কবিতা চর্চার মূল্যায়ন আগামীর হাতে৷ প্রয়াণে বাংলার লেখালিখি জগতের মানুষজন সেভাবে কেউ হা-হুতাশ করেননি। খুব সাধারণ একটি মৃত্যু হয়ে রয়ে গেল বিষয়টা৷ লিটল ম্যাগাজিন আঁকড়ে লিখে যাওয়া কবির প্রয়াণে লিটল ম্যাগাজিন মেলাতেও তাঁর প্রতি কোনও শ্রদ্ধার্ঘ্য প্রকাশের চেষ্টা চোখে পড়লো না। মৃত্যুর পরেও কবি যথার্থই প্রচারবিমুখ রইলেন। আক্ষেপ করে লিখেছিলেন— “কী নিয়ে বাঁচবো!/ তার চেয়ে মৃত্যুই ঢের ভালো।”

প্রচারবিমুখ কবিজীবন৷ নানান সমস্যায় জর্জরিত। স্বীকৃতির পরোয়া না করে আমৃত্যু লিখে চলা৷ বোধহয় বুঝে গিয়েছিলেন, শহরের দৃষ্টি গ্রামের দিকে ফিরবে, এ আশা না করাই ভালো৷ এই অসাম্যের একমাত্র উত্তর লিখে যাওয়া৷

সেই কাঙ্খিত মুহূর্তে পদার্পণ করলেন কবি। শেষকৃত্যে গ্রামের মানুষরাই দায়িত্ব নিলেন৷ হায় রে বাংলা কবিতা! হায় গ্রাম্য কবি জয়নাল৷ উপেক্ষা আর অবহেলাটুকুই যেন সারাংশ৷ এই উপেক্ষা আর অবহেলায় যে কবির নির্মাণ হয়, সেই কবির উদাহরণ কবি জয়নাল আবেদিন৷ কতটা ব্যথা পেলে কেউ লিখতে পারেন–

“ঘৃণা করতে চাইলে করো মেনে নেবো/ করুণা করোনা,/ আমার মাথা নিচু হয়ে যায়।/ রাস্তায় দাঁড় করিয়ে আমাকে খুন করতে পারো, আশা দিয়ো না,/ আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলি।”

সুন্দরবনের এক গ্রামে বসে কাগজে লেখার স্বপ্ন দেখতাম, শুধু লিখে যেতে চাইতাম। সেদিনের সেই স্কুলপড়ুয়া কিশোরের কাছে জয়নাল আবেদিনের নামটা প্রেরণার কাজ করতো৷ যেন দূর থেকে একটা আলো দেখছি, আর সেই আলো লক্ষ করে এগোনোর কথা ভাবছি…

Developed by DXDasia