
ঠাকুরবাড়ি, দুর্গাপুজো এবং রবীন্দ্রনাথ
অমল ধবল পালে যখন মন্দ মধুর হাওয়া লাগে, তখন বুঝতে হয় শরৎ এসেছে। শরৎ ঋতু মানেই বাঙালির বুকের মধ্যিখানে অনেকখানি নস্টালজিয়া নিয়ে জেগে ওঠেন এক ত্রিনয়না দেবী। টুকরো টুকরো আবেগ ছুঁয়ে শুরু হয় দুর্গোৎসব। জানি না কেন, দুর্গাপুজোর কথা ভাবলেই আমার চোখে ভেসে আসে রবি ঠাকুরের ‘সহজপাঠ’ বইয়ের হলদে হয়ে যাওয়া পাতায় ঘরমুখো মানুষের ভিড়। উৎসব সেখানে মিলন। যে দেবীকে নিজের সাহিত্যে আঁকবেন রবীন্দ্রনাথ যত্ন করে, যাঁর দুই নয়নে স্নেহের হাসি আর ললাট নেত্র আগুনবরণ সেই দেবীর আরাধনা কেমন হত ঠাকুরবাড়িতে? আজ কথায় কথায় সেই গল্পই বলি। মহাকালের অনন্ত রথে চড়ে মনে মনে পাড়ি দিই উনিশ শতকের ঠাকুরবাড়িতে, যেখানে একচালার প্রতিমাকে ঘিরে ঝলমলিয়ে উঠতো ঠাকুরবাড়ির পূর্ব প্রজন্মের খুশি।
পুরোনো দিনের ঠাকুরবাড়ির কথা মানে আমাদের সম্বল কিছু স্মৃতিচারণ। সেই স্মৃতিকথাগুলিকে একত্র করলে একটি বিশেষ ছবি ভেসে ওঠে আর মন চলে যায় সাবেকি গন্ধমাখা পুজোর দিনগুলিতে। ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে জোড়াসাঁকোর দুর্গোৎসব শুরু হয়েছিল নীলমণি ঠাকুরের উদ্যোগে। প্রথম দুর্গাপুজো নাকি খোলার ঘরে হয়েছিল। শোনা যায়, নীলমণি ঠাকুর ও তাঁর ভাই দর্পনারায়ণ ঠাকুরের মধ্যে মান অভিমানের কারণে নীলমণি জোড়াসাঁকোতে থাকতে শুরু করেন। তখন স্থানাভাব ছিল। কিন্তু এই পুজোই প্রবল বৈভবের সঙ্গে পালন করা হয় প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের সময়। দ্বারকানাথ নাকি পুজোর ছুটির জন্য ইংরেজ সরকারের উপর জোর খাটিয়েছিলেন। দর্পনারায়ণের বাড়ির পুজোর খবর যেমন আগাম সংবাদপত্রে প্রকাশিত হত, তেমনি দ্বারকানাথের বাড়ির দুর্গাপুজো সেই সময় অন্য ধনী পরিবারগুলির কাছে রীতিমতো ঈর্ষার কারণ ছিল। পুজোর আগে আকাশে ছেড়ে দেওয়া হত শঙ্খচিল, মা দুর্গাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসার জন্য। বিজয়া দশমীর দিন সকালবেলা উড়িয়ে দেওয়া হত নীলকণ্ঠ পাখি, মহাদেবকে খবর দেবে বলে। শোনা যায় মোট একান্নরকম ভোগ রান্না করা হত। দ্বারকানাথের আমলে মোয়া, ক্ষীর মেশানো মস্ত বড়ো মিষ্টি তৈরি হত। গঙ্গার পাড় থেকে মাটি আনা হত। গরুর গাড়িতে করে দেবীর চালচিত্র আসতো ঠাকুরবাড়িতে। ধীরে ধীরে সেজে উঠতেন ঠাকুরবাড়ির দেবী প্রতিমা। একচালার কাঠামোয় সপরিবার দুর্গা, পায়ের তলায় সিংহ এবং অসুর! নজর কাড়ত ত্রিনয়নী প্রতিমার টানা টানা চোখ। দ্বারকানাথের আমল থেকে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির প্রতিমার মুখের আদল দ্বারকানাথের স্ত্রী দিগম্বরীর মতো হতো। পুজোর নিমন্ত্রণ পত্র লেখা হতো দ্বারকানাথের বাবা রামমণি ঠাকুরের নামে। দেবীকে পুজো করার সময় বেনারসি শাড়ি ছাড়িয়ে গরদ পরানো হতো। দেবীর অঙ্গে থাকতো বহুমূল্য অলংকার। দ্বারকানাথ নিজের বৈভব প্রচারের জন্যই বুঝি সালঙ্করা দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন দিতেন। মাঝি, মাল্লা, ভৃত্যরা সে গয়না নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সংগ্রহ করার চেষ্টা করতো। সে গয়না ঠাকুরবাড়িতে আর গ্রহণ করা হতো না। বিজয়ার দিন ঠাকুরবাড়ির পুরুষ সদস্যরা নতুন পোশাক পরে, প্রতিমা ভাসানে যেতেন। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা থাকতেন তেতলার ছাদে। সৌদামিনীদেবী স্মৃতিকথায় বলেছিলেন, বিজয়ার দিন ছাদে ওঠা তাঁদের একটুকরো মুক্তি ছিল। বিনয়িনীদেবীর স্মৃতিচারণায় যেন চোখের সমুখে জেগে ওঠে ওই একচালার দুর্গামূর্তি। মেয়েরা চিকের আড়াল থেকে আরতি দেখতেন। রুপোর প্রদীপদানিতে একহাজার একটি ঘিয়ের প্রদীপ দিয়ে, রুপোর ঘন্টা বাজিয়ে আরতি শুরু হতো। প্রতিমার দুপাশে আলো হয়ে জ্বলতো ঘিয়ের প্রদীপ। তিনদিন তিনরাত্তির ধরে প্রদীপ জ্বলবে—এমনটাই ছিল রীতি। ধুমধাম করে যাত্রা, গানের আসর বসতো। বৈষ্ণব পরিবার বলে, পশুবলির জায়গায় কুমড়ো বলি হতো। বিজয়ার দিন মিষ্টিমুখ আর কোলাকুলির স্মৃতিচারণ করেছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরও। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর পুজো ভালোবাসতেন। বলতেন, তাঁদের প্রতিমা দেশের মধ্যে সবচাইতে বড়ো আর সুন্দর হতো। পুজোর আগে নতুন পোশাক , নতুন জুতোর জন্য দরজি, মুন্সীদের আসা যাওয়া আনন্দের বার্তা নিয়ে আসতো। সত্যেন্দ্রনাথও বাড়িতে দুর্গা আর জগদ্ধাত্রী — এই দুই পুজোর কথাই বলেছিলেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ দুর্গা প্রতিমা তৈরির প্রতিটি ধাপ বর্ণনা করেছিলেন। তিনি শিল্পী মানুষ! প্রতিমা তৈরির প্রতিটা ধাপ তিনি মন দিয়ে দেখতেন। পটুয়াদের পানের খিলি পৌঁছে দেওয়া তাঁর কাজ ছিলো। পুজোর সময় ঠাকুরবাড়িতে যাত্রা হতো। পৌরাণিক যাত্রাপালার আলুলায়িত কেশের দুর্গা যখন রূপে আলো করে আসতেন— জ্যোতিরিন্দ্রনাথ মুগ্ধ হতেন। প্রতিমা বিসর্জনের পর সকলের স্মৃতিচারণাতেই ছুঁয়ে গেছে বিচ্ছেদের নীলাভ বিষাদ।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর একসময় পিতামহী অলকাসুন্দরীর সঙ্গে নিত্য কালীঘাটে যেতেন। ঠনঠনিয়া সিদ্ধেশ্বরী কালীর কাছে মানত করতন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে চেয়ে। তিনি তখন বিশ্বাস করতেন— ঈশ্বরই শালগ্রাম শিলা, ঈশ্বরই দশভুজা দুর্গা আর ঈশ্বরই চতুর্ভুজা সিদ্ধেশ্বরী। কিন্তু রামমোহন রায়ের সাহচর্য আর পিতামহীর মৃত্যুদিনে ভেসে আসা ঈশোপনিষদের একটি শ্লোক লেখা পাতা তাঁকেই করে তুলবে একেশ্বরবাদী প্রতিষ্ঠান। তত্ত্ববোধিনী সভা, আদি ব্রাহ্ম সমাজ, রাজা রামমোহন রায়কে ঘিরে তৈরি হবে দেবেন্দ্রনাথের নতুন পৃথিবী। দ্বারকানাথ থাকাকালীন নীরবে প্রতিবাদ করে গিয়েছেন মূর্তিপুজোর আর যখন তাঁর চুয়াল্লিশ বছর বয়স, তখন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে মূর্তিপুজো নিষিদ্ধ করে দিলেন দেবেন্দ্রনাথ। ঠাকুরবাড়ির পুরুষেরা কিছুটা চলতি হাওয়ার পন্থী হয়ে আর মেয়েরা নিরুপায় হয়েই গোঁড়া বৈষ্ণব পরিবার থেকে ব্রাহ্ম হয়ে উঠলেন। দেবেন্দ্রনাথের ইচ্ছে থাকলেও দুর্গাপুজো তুলতে পারলেন না। পুজোর সময় দেশ ভ্রমণে চলে যেতেন। অথচ তাঁর স্ত্রী সারদাদেবী তাঁকে অনুসরণ করে উৎসবে যোগ দিতেন না। পুজো বন্ধ হওয়া ঠাকুরবাড়ির পুরুষ বা মহিলা— কেউই সদর্থকভাবে গ্রহণ করেননি। পরের প্রজন্মও নয়। অবনীন্দ্রনাথ ষষ্ঠীর দিন থেকে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি দুর্গোৎসবে নিমন্ত্রণে যাওয়ার কথা লিখেছিলেন। রথীন্দ্রনাথও পুজো না হওয়ার আক্ষেপের কথা স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন।
আর রবীন্দ্রনাথ? সাহিত্যে কত ভঙ্গিতে গিরিনন্দিনীর ছবি আঁকবেন। একবার সুরেশ সমাজপতির বাড়িতে দুর্গা প্রতিমা দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, হঠাৎ দিনকতকের জন্য ছেলেমানুষ হয়ে সকলে একটা বড়ো গোছের পুতুল খেলায় প্রবৃত্ত হয়েছে। এইকথাও বলেছিলেন — ‘সমস্ত বাংলাদেশের লোক যাঁকে উপলক্ষ্য করে আনন্দে ভক্তিতে প্লাবিত হয়ে উঠেছে, তাকে আমি মাটির পুতুল বলে যদি দেখি, তবে তাতে কেবল আমারই ভাবের অভাব প্রকাশ পায়।’ ব্রাহ্ম পিতার বাধ্য সন্তান বরাবরই পুজো পার্বণ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত মন্তব্য করতেন। দুর্গোৎসব তাঁর ভালো লাগলেও ঠাকুরবাড়িতে মূর্তিপুজো নয়, ব্রাহ্ম উৎসবগুলির প্রচলনই করতে চেয়েছিলেন। যেমন ১১ মাঘের অনুষ্ঠান। এই ব্রাহ্ম অনুষ্ঠানগুলিতে উৎসবের আনন্দ ছিল। মিঠাইয়ের পিরামিড ,গুণীজন সমাগম, পবিত্র আনন্দ— ঠাকুর পরিবারে পুজোর আমেজ নিয়ে আসতো। দুর্গাপুজো না হলেও গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি বিজয়া সম্মিলন হতো ধুমধাম করে। মিষ্টি, আতর, গানের জলসায় মেতে উঠতেন সকলে। ১৯১৮ সালে নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত প্রথম বাংলা পূজাবার্ষিকী ‘পার্বণী’-তে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
দুর্গোৎসবের সঙ্গে বাঙালির আনন্দের সমীকরণটা হিসেবের বাইরে। রবীন্দ্রনাথও সেই উৎসবের কাছে নিশ্চয়ই নত হয়েছিলেন মনে মনে। ব্রাহ্ম ছিলেন! তাই মূর্তিপুজো করতে পারেননি। কিন্তু নিজের সাহিত্যের ভুবনে শব্দের অঞ্জলি দিয়ে নির্মাণ করেছেন শৈলজা, গিরিবালা, মহামায়া, অপর্ণার মতো চরিত্র। প্রত্যেকটি চরিত্রে মিশিয়ে দিয়েছিলেন বাঙালির এক ত্রিনয়নী দেবীকে, বাঙালির ঘরের মেয়ে উমাকে। আসলে,কলমই লেখকের শ্রেষ্ঠ পুজোর উপচার। শব্দই সেরা অঞ্জলি।
সহায়ক গ্রন্থঃ
ঠাকুরবাড়ির বাহিরমহল, চিত্রা দেব
ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, চিত্রা দেব
ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপুজো, চিত্রা দেব(প্রবন্ধ)
রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়স্বজন, সমীর সেনগুপ্ত
https://www.thedailystar.net/bangla/anandadhara

