“আমি বাঙালির ঐতিহ্যকে নিয়ে কাজ করতে চাই, নস্ট্যালজিয়া নয়”

সঙ্গীতশিল্পী তাপস মৌলিকের সাক্ষাৎকার

তাপস মৌলিক, বাংলা গানের একটি অনালোচিত নাম। পেশা নয়, গানকে বেছে নিয়েছেন নেশা হিসাবে। তাঁর গানের সুরে অনায়াসে চলে যাওয়া যায় ছেলেবেলায় কিংবা সাহিত্যের পাতায়। গান লেখেন, সুর করেন মূলত ছোটদের জন্যই। জীবনে প্রথমবার সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে বলছেন গান নিয়ে সারাদিন গল্প-আলোচনা করে যেতে পারেন। বঙ্গদর্শনের পক্ষ থেকে সঙ্গীতশিল্পী তাপস মৌলিকের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন সুমন সাধু। 
 

• গানটা কি শুধুমাত্র ভালোবাসা থেকেই? আপনার গান যে আরও অনেক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার, এই ব্যাপারে আপনার দায় আছে কোনও?

আমি প্রথাগতভাবে কখনও গান-বাজনা শিখিনি। নিজের খুশিতেই গান বানাই। বাড়িতে অনেকে গান-বাজনা করতেন, সেইসব শুনে শুনে নিজের মতো শিখে নিয়েছি। কলেজে পড়ার সময় নানা অনুষ্ঠানে বন্ধুদের জন্য গান লেখা বা গান গাওয়া চলত। শুরুটা এভাবেই। তারপর বন্ধুদের জন্যই ইউটিউবে একটা চ্যানেল খুললাম। তখন ভার্চুয়াল বন্ধু কম ছিল আমার। প্রত্যেকেই পূর্ব পরিচিত। আস্তে আস্তে অনেকে আমার গান শুনলেন। তারাও পরে বন্ধু হয়ে গেলেন। তারপর থেকে কিছু কিছু প্রজেক্টে জড়িয়ে গেলাম। যেমন ‘জয়ঢাক’-এর জন্য দুটো অ্যালবাম করলাম। গতবছর আবার একটা ছোটদের আনন্দবার্ষিকী পত্রিকার জন্য অ্যালবাম করলাম। ওখানে ছয়টা গান ছিল। তো এইভাবে মজার ছলেই গানগুলো হচ্ছে। আর ছোটদের জন্য লিখতে আমার ভালোলাগে। তাছাড়া আলাদাভাবে কোনও দায় আমার নেই। 

• একজন সঙ্গীতশিল্পী হিসাবে আপনি কখনও লাইম লাইটে আসেননি। এটা কি সচেতনভাবেই?

সচেতনের প্রশ্নই আসছে না। আমি পেশাদার সঙ্গীতশিল্পী নই। তাই লাইম লাইটে আসা সম্পূর্ণ অন্য একটা দিক। আমি প্যারালাল জগতে বাস করি। এইভাবেও তো অনেক শিল্পী কাজ করে চলেছেন। এটাই তফাৎ, আর কিছুই না।

• কত সাল থেকে আপনি কাজ করছেন?

নিয়মিত কাজ করছি ২০১২ সাল থেকে। তবে শুরুটা হয়েছিল আমার কলেজ জীবনে। 

 

• বাংলা গান যে প্রথাগত ঘরানার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, সেখান থেকে সম্পূর্ণ বাইরে বেরিয়ে এসে কীভাবে আপনি গানকে দেখতে চাইলেন?

দেখুন বাংলা আধুনিক গানের ঘরানা বহুযুগ ধরেই চলে আসছে। আমার গানগুলো সত্তর–আশি দশকের বাংলা গানের ধারার মতো। আমার ওই দিনগুলোয় ফিরে যেতে ইচ্ছা করে। আমার সুরের মধ্যেও এই খোঁজটা আছে। গানের সুর আর কথা দুটোই খুব গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রথম জীবনে বলেছিলেন, গানের কথা আর সুরকে একই আসনে বসালাম। কিন্তু পরে তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে এসে বলেছিলেন, গানের মধ্যে সুর হল সেই জিনিস, যা মানুষকে তাড়াতাড়ি রিলেট করানো যায়। আমারও সেটাই মনে হয়। স্বর্ণযুগের বেশকিছু গান আছে যেখানে কথা খুব দুর্বল কিন্তু সুরের মাহাত্ম্যের জন্য বারবার শুনতে ইচ্ছা করে। একটা গানের ক্ষেত্রে সুরকে যেমন জোরালো হতে হবে, তেমন কথাকেও শক্তিশালী হতে হবে। এই আমার গান। এই আমার ধারণা। 

• আপনার গানের প্রধান একটা দিক হল নস্ট্যালজিয়া। আমরা অনায়াসে ছেলেবেলায় ফিরে যাই কিংবা সাহিত্যের পাতা থেকে আপনার গান উঠে আসে। এই যে নিজেই গাইছেন, নিজেই সুর দিচ্ছেন, কখনও নিজেই লিখছেন। বাঙালির এই নস্ট্যালজিয়া আপনাকে কতটা গ্রাস করে?

আমি কিন্তু নস্ট্যালজিয়া মনে করি না। অনেকেই এটা বলে তার কারণ বাঙালির কাছে সুরটা পুরনো গানের সঙ্গে মিলে যায়। 

• না না, তাছাড়া সুকুমার, সত্যজিৎ, লীলা মজুমদার বা বিভূতিভূষণ প্রত্যেকেই আপনার গানে বারবার এসেছে এবং এঁদের প্রত্যেকের সঙ্গে বাঙালির নস্ট্যালজিয়া জড়িয়ে আছে।

যে জিনিস আমরা ফেলে এসেছি, সেগুলোর স্মৃতি যখন আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে সেটাকেই নস্ট্যালজিয়া বলি। কিন্তু লীলা মজুমদার বা বিভূতিভূষণ এঁরা এখনও সাংঘাতিকভাবে প্রাসঙ্গিক। এটাকে নস্ট্যালজিয়া না বলে ঐতিহ্য বলা উচিত। আমি বাঙালির ঐতিহ্যকে নিয়ে কাজ করতে চাই, নস্ট্যালজিয়া নয়। আমার সুরের ধাঁচ একটু পুরনো। আমার ওইসব গান শুনতেই বেশি ভালোলাগে। 

• এখনকার বাংলা গান শোনেন?

খুব কম শুনি। কেউ হয়ত বলল ওই গানটা ভালো হয়েছে, অন্যরকম হয়েছে, তখন শুনে ফেলি। খুব  সাম্প্রতিক গান আমার নিয়মিত শোনা হয় না। 

• আপনার প্রিয় সঙ্গীতশিল্পী কে?

পঞ্চাশের আগে শচীন দেব বর্মণ, পঙ্কজ কুমার মল্লিক। পঞ্চাশের পরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। লতা, সন্ধ্যা, প্রতিমা এঁরাও আছেন। আশির দশকের পর অবশ্যই কবীর সুমন। ভূমি ব্যান্ডের গান বেশ ভালো লাগত। রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পীদের মধ্যে দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র। সাম্প্রতিকদের মধ্যে জয়তী চক্রবর্তী খুব ভালো লাগে।

Developed by DXDasia