‘ইজ অ্যান্ডারসন স্টিল অ্যালাইভ?’

জ্ঞান ফেরার পর, এটাই ছিল বিপ্লবী ভবানী ভট্টাচার্যের প্রথম প্রশ্ন

আয়ারল্যান্ডে সিনফিন আন্দোলনের মোকাবিলা করতে গিয়ে ইতিপূর্বে জন অ্যান্ডারসন যে ব্ল্যাক অ্যান্ড ট্যান নীতির প্রবর্তন করেছিলেন, তাতে সাম্রাজ্যবাদী মহলে ধন্য ধন্য পড়ে গিয়েছিল। তাই ব্রিটিশ সরকার বিপ্লব দমনে ব্যর্থ হয়ে এবার বাংলার গভর্নর হিসেবে স্যার জন অ্যান্ডারসনকে নিযুক্ত করেন।

শাসকরূপে অ্যান্ডারসনকে কাছে পেয়ে বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্স, ইউরোপিয়ান অ্যাসোসিয়েশন, স্টেটসম্যান, ইংলিশম্যান প্রমুখ সরকারি মুখপত্রগুলির সে কী আস্ফালন! আর সেই সঙ্গে সুরে সুর মেলাল জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্রসমূহ ও একান্ত রাজভক্তের দল।

গভর্নর সাহেব প্রথমেই গাঁয়ে গাঁয়ে তৈরি করলেন ‘ভিলেজ গার্ড বাহিনী’। অর্থাৎ এখন থেকে তাঁরাই হলেন গাঁয়ের মাতব্বর। তাঁদের কাজ হল বিপ্লবীদের দিকে একটু ভালো করে নজর রাখা। সন্দেহজনক কিছু দেখলেই ধরিয়ে দেওয়া আর সরকার বাহাদুরের কাছ থেকে পুরস্কার নেওয়া।

দলের নির্দেশে সেই কুখ্যাত গভর্নরকে শিক্ষা দিতে এগিয়ে এলেন ঢাকার বি ভি শাখার বিপ্লবীরা। ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে দার্জিলিং অভিমুখে রওয়ানা হলেন উজ্জ্বলা মজুমদার, মনোরঞ্জন ব্যানার্জি, রবি ব্যানার্জি আর ভবানী ভট্টাচার্য। প্রথমে চেষ্টা করা হল ফ্লাওয়ার শো একজিবিশনে। কিন্তু ঠিক সুবিধে হল না। সুতরাং সুযোগের অপেক্ষায় রইলেন তাঁরা।

সুযোগ পাওয়া গেল ৮ মে, ১৯৩৪ সালে লেবং-এর ঘোড়দৌড়ের মাঠে। অ্যান্ডারসন এসেছেন বিজয়ীদলকে পুরস্কার বিতরণ করতে। যথাসময়ে ভবানী ভট্টাচার্য আর রবি ব্যানার্জি দর্শকের টিকিট কেটে ঢুকলেন মাঠের ভিতরে। তাঁদের আসন গ্রহণ করতে দেখেই মনোরঞ্জন ব্যানার্জি আর উজ্জ্বলা মজুমদার ফিরে গেলেন শিলিগুড়ি স্টেশনের দিকে।

গভর্নরের আসনের ঠিক ডান পাশে দর্শকদের স্থান। মাঝখানে একটু নীচু দেওয়াল। দর্শকদের মধ্যে বেশরভাগই শ্বেতাঙ্গ আর ধামাধরা রাজা-মহারাজার দল। আর রয়েছে অজস্র পুলিশ, সার্জেন্ট ও গুপ্তচরের দল।

ঘোড়াদৌড়ের পালা শেষ। এবার পুরস্কার বিতরণের পালা। লাটবাহাদুর উঠে দাঁড়ালেন আসন ত্যাগ করে। সঙ্গে সঙ্গে ভবানী ভট্টাচার্যও উঠে দাঁড়ালেন আসন ছেড়ে। দূরত্ব অনেকটা ছিল এবং তাঁর চারপাশে ছিল প্রহরী, গুপ্তচর, সাহেবসুবো আর মোসাহেবের দল। এগোতে গেলেই তারা সন্দেহ করবে। সুতরাং তিনি লক্ষ্য স্থির করলেন ওই স্থান থেকে। গর্জে উঠল ভবানীর রিভলভার। কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল চিৎকার চেঁচামিচি। গভর্নর এডিকং সাহেব তৎক্ষণাৎ পরপর গুলিবর্ষণ করলেন ভবানীকে লক্ষ্য করে ফলে ভবানী ঢলে পড়লেন গুরুতর আহত হয়ে। সঙ্গে সঙ্গে রবির রিভলভার শুরু করল আগুন ঝরাতে। রবির গুলিতে বিদ্ধ হয়ে পড়ে গেলেন গভর্নরের স্টেনো মিস থর্টন এবং শ্বেতাং সার্জেন্ট। আচমকা রবির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল দেহরক্ষীর দল। রবির রিভলবারের গুলিও শেষ। অবশেষে রবি এবং গুরুতর আহত ভবানী ধরা পড়লেন। অচৈতন্য ভবানীকে হাসপাতালে পাঠানো হল। হাসপাতালে জ্ঞান ফিরতে ভবানী বললেন ‘ইজ অ্যান্ডারসন স্টিল অ্যালাইভ?’

উজ্জ্বলা ও মনোরঞ্জন কলকাতায় এসে পৌঁছোলেন। অবশেষে পুলিশ উজ্জ্বলা মজুমদারকে খুঁজে বের করল ভবানীপুর ‘যুগান্তর’ দলের কর্মী শোভারানি দত্তের বাড়ি থেকে। ১৮ মে উজ্জ্বলা মজুমদার ও শোভারানি দত্তকে গ্রেপ্তার করা হল। কলকাতায় গ্রেপ্তার হলেন মনোরঞ্জন ব্যানার্জি, সুকুমার ঘোষ প্রমুখ।

স্পেশাল ট্রাইবুনালে মামলা শুরু হয়। বিচারে ভবানী, মনোরঞ্জন ও রবির ফাঁসির হুকুম হয়, উজ্জ্বলার সাজা হয় বিশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, অপর বন্দিদের সাজা হয় দ্বীপান্তর। হাইকোর্টের আপিলের রায়ে ভবানী ভট্টাচার্যের ফাঁসির হুকুম বহাল রইল। মনোরঞ্জন ব্যানার্জি ও রবি ব্যানার্জির ২০ বছর এবং উজ্জ্বলা মজুমদারের ১৪ বছর সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ হয়। দণ্ডিত বন্দিরা আন্দামানে দ্বীপান্তরিত হন। উজ্জ্বলা মজুমদারকে পাঠানো হয় মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলে।

১৯৩৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি রাজশাহি সেন্ট্রাল জেলে ভবানী ভট্টাচার্যের ফাঁসি হয়।

(ঋণ – দ্য লেজেন্ড অব অগ্নিযুগ / জয়ন্তকুমার ঘোষ)

Developed by DXDasia