দু’বার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়েছিল তাঁকে

শচীন্দ্রনাথই একমাত্র বিপ্লবী, যিনি এই শাস্তি পেয়েছিলেন

শচীন্দ্রনাথ সান্যালের জন্ম উত্তর প্রদেশের বেনারসে, ১৮৯৩ সালে। পিতা শ্রদ্ধেয় হরিনাথ সান্যাল। বারাণসীতে বাঙালিটোলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন শচীন্দ্রনাথ। ১৯০৭ সালে বেনারসে ‘অনুশীলন সমিতি’র স্থাপনা করেন কিন্তু  ব্রিটিশ সরকার দ্বারা বেআইনি ঘোষিত হওয়ার পর নাম বদলে ‘যুব সমিতি’ করে দেন। এই সমিতির মূল উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য অনুপ্রাণিত করা। ১৯১৪ সালে বিপ্লবী নায়ক রাসবিহারী বসুর সঙ্গে মিলিত হয়ে ‘যুব সমিতি’ পুনর্গঠিত করে উত্তর প্রদেশে এবং উত্তর ভারতে ‘গদর পার্টি’র সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে ২১ ফেব্রুয়ারি(পরে ১৯ ফেব্রুয়ারি) ১৯১৫ সালে ভারতীয় ফৌজের সিপাহিদের মধ্যে সশস্ত্র সৈনিক বিদ্রোহ সংগঠনের পরিকল্পনায় সম্মিলিত হন।

পরিকল্পনাটি বিশ্বাসঘাতকতার ফলে বানচাল হয়ে যায়। ১৯১৫ সালের ১২ মে রাসবিহারী বসু ছদ্মবেশে জাপানে পালিয়ে যান এবং শচীন্দ্রনাথ সান্যাল ও নগেন্দ্রনাথ দত্ত(গিরিজাবাবু)কে আন্দোলনের দায়িত্ব দিয়ে যান। কিন্তু তাঁরা ছাড়া পেলেন না, ‘লাহোর ও বেনারস ষড়যন্ত্র’ মামলায় অভিযুক্ত করে মকদ্দমা চালানো হয়। এই মকদ্দমার রায়ে ১৯১৫ সালে তাঁর যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হয় এবং ২১ নং মদনপুরা, বেনারসের পৈতৃক বাড়িটি ইংরেজ সরকার বাজেয়াপ্ত করে নিলাম করে দেয়।

১৯২০ সালে সরকারি দাক্ষিণ্যে আন্দামান জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি এলাহাবাদে বসবাস করেন। কিছু সময় পরে তিনি আর একবার সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং বিপ্লবী রামপ্রসাদ বিসমিলের সঙ্গে মিলে ‘হিন্দুস্তান রিপাব্লিকান অ্যাসোসিয়েশন’ নামে একটি সংগঠনের স্থাপনা করেন। ১৯২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিদেশ থেকে অস্ত্র আমদানি করে দেশকে মুক্ত করার চেষ্টায় গ্রেপ্তার হয়ে দুই বছরের কারাদণ্ড হয় এবং তাঁকে বাঁকুড়া জেলে রাখা হয়।

১৯২৫ সালের ৯ আগস্ট উত্তর প্রদেশে ‘কাকোরি ট্রেন ডাকাতি’(রামপ্রসাদ বিসমিলের নেতৃত্বে ট্রেন থামিয়ে সরকারি মেলভ্যান লুঠ) হয়। এই ‘কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলা’-য় তাঁকে জড়িত করে লখনউ নিয়ে আসা হয় এবং ৬ এপ্রিল ১৯২৭ সালে পুনরায় যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরদণ্ডে দণ্ডিত করে আন্দামানে প্রেরিত করা হয়। ১৯৩৭ সালে মুক্তি পাওয়ার পর, জাপানের সাহায্যে ভারতকে মুক্ত করার ষড়যন্ত্রে তাঁকে পুনরায় ১৯৪১ সালে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জেলের মধ্যে যক্ষ্মারোগাক্রান্ত হলে সরকার তাঁকে মুক্তি দেয় এবং উত্তর প্রদেশের গোরখপুরে অন্তরীণ থাকাকালে ১৯৪৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

শচীন্দ্রনাথই একমাত্র বিপ্লবী যাঁকে দুবার যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর দণ্ড ভোগ করতে হয়েছে। অর্থাৎ তিনি জীবনের ২৭টা বছর জেলেই অতিবাহিত করেন। বেনারসে ‘অগ্রগামী’ নামক দৈনিক পত্রিকার সম্পাদনা করেন এবং জেলজীবনের চিন্তন এবং মননের ফলস্বরূপ কয়েকটি পুস্তকের রচনা ও প্রকাশনাও করেন। তাঁর রচিত ‘বন্দিজীবন’ গ্রন্থ এক সময় বিপ্লবীদের যথেষ্ট প্রেরণা দিয়েছে।

(ঋণ – দ্য লেজেন্ড অব অগ্নিযুগ / জয়ন্তকুমার ঘোষ)

Developed by DXDasia