গানের ভাষা যা-ই হোক না কেন, সৎ সঙ্গীতশিল্পী হয়ে উঠতে চান সাহানা
• এই সম্মান পেয়ে আপনার কেমন লাগছে?
এটা আমার কাছে খুবই আনন্দের। তবে আমি যে এমন কোনো পুরস্কার পাব, সে-সম্পর্কে কখনও ভাবিনি। তাই এই সম্মান আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি আমাকে অবাকও করেছে। আসলে আমার জীবনে পুরস্কার পাওয়াটা কোনদিনই বিশেষ গুরুত্ব পায়নি। কারণ আমি গান ভালোবাসি, তাই গাই। তার জন্য কোনোদিন প্রতিযোগিতায় নামিনি। এই বিষয়টা আমাকে ভাবায়নি কখনোই। শান্তিনিকেতনে যখন পড়াশোনা করছি, সে-সময় অবশ্য একবার ভালো রেজাল্ট ও গানের জন্য পুরস্কার পেয়েছিলাম।
যদিও এ-বছরই ব্ল্যাকবোর্ড’স উওমেন লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ডস ২০১৮ এবং লন্ডনের কিং কলেজের আর্ট এন্ড হিউম্যানিটি রির্সাচ কাউন্সিল থেকে এথনোমিউজিকোলজি-তে পিএচডি করার জন্য বিশেষ পুরস্কার পেয়েছি। তবু এর পাশাপাশি ইউকে হাউস অফ কমার্সের এই পুরস্কার সত্যিই আমাকে অবাক করেছে এবং সঙ্গীতের প্রতি দায়িত্বও বাড়িয়ে দিয়েছে প্রচুর।

• দুই বাংলার মানুষের কাছেই আপনি যথেষ্ট জনপ্রিয়। ভবিষ্যতে সারা বিশ্বে বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতিকে আরও বেশি করে ছড়িয়ে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা আছে আপনার?
আমার কাছে দুই বাংলার মধ্যে কোনো পার্থক্যই নেই। পশ্চিমবঙ্গই বলুন অথবা বাংলাদেশ—দুই-ই আমার মনের খুব কাছাকাছি। আমার দ্বিতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীতের অ্যালবাম ‘যা বলো তাই বলো’-র প্রথম সাতটি গানই ২০১৫ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু একটা দুঃখ মাঝে মাঝেই আমাকে তাড়িত করে। আজ দশ বছর ধরে বিদেশে থাকলেও আমি তো ভারতীয়। বাংলা গান গাই। কিন্তু প্রবাসী ভারতীয় হওয়ার জন্য হিন্দুস্থান ইনরেকর্ডস-এর তরফ থেকে আমাকে বিশিষ্ট সঙ্গীত সম্মানের তালিকা থেকেই বাদ দেওয়া হয়। এই ঘটনা আমাকে খুবই আঘাত দিয়েছে। কিন্তু এখন আমি যে দেশে থাকি, সেখানকার সঙ্গীতজ্ঞরা আমার কাজকে সম্মান দিচ্ছেন, প্রশংসা করছেন। এর জন্য আমি গর্বিত। কাজটাই আমার জীবনের প্রধান লক্ষ্য। তা ভারতেই হোক, বাংলাদেশে বা ইংল্যান্ডে। তাছাড়া আমি আমার জীবনে কোন কাজই পূর্বনির্ধারিত ভাবে করতে ভালোবাসি না। আমি মনে করি, সময়ই জীবনের গন্তব্য তৈরি করে দেয়। পরিকল্পনা করে কোনো লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলতে আমি পারি না। আমি কাজের মধ্যে দিয়ে জীবনকে উপভোগ করতে চাই। লক্ষ্যের পিছনে দৌড়াতে চাই না। তাই আপাতত কয়েকটি বিষয়ে মনোনিবেশ করেছি। যেমন লণ্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়ানোর কাজটি মন দিয়ে করতে চাই। পিএচডির সঙ্গে-সঙ্গে মন দিয়ে বাংলা গান গেয়ে যেতে চাই।
• আপনি গান নিয়ে বিশ্ব-ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন। এইবছর কোন কোন দেশে গান নিয়ে ভ্রমণ করলেন?
আসলে গান আমার ভালোবাসা, বেঁচে থাকার রসদ। আর বাংলা গান আমার ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যম। তাই গান নিয়ে বিশ্বভ্রমণ করতে খুবই ভালোলাগে। এ-বছর আমি আমেরিকা, নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি, পুড়ডু ইউনিভার্সিটি ইন ইন্ডিয়ানা, বোস্টন, জার্মানির মিউনিখ, জুরিখ, সুইজারল্যান্ড, কলকাতা, দিল্লি, লন্ডন ঘুরে এলাম। তাছাড়া, খুব সম্প্রতি ঢাকা গিয়েছিলাম। প্রায় দশ বছর পর ঢাকায় গিয়ে গান গাইলাম।
• আপনি দেশ-বিদেশে ভ্রমণের সময়, বিশ্বের দরবারে বাংলা ভাষা ও গান কীভাবে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন?
আগেই বলেছি, বাংলা ভাষা ও গানের সঙ্গে আমার নাড়ির টান। আমার আত্মা এই ভাষায় কথা বলে। যেখানেই যাই না কেন, এ আমার অন্তরে থাকে। আত্মাহীন দেহের যেমন কোনো অস্তিত্ব নেই, তেমনি বাংলা গানই আমার আত্মা।

• এই বছরে কোন দেশভ্রমণ আপনার জীবনে দাগ কেটে গেছে?
এবছর সবচেয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবে আমার ঢাকা যাত্রা। দশ বছর পরে ঢাকা গিয়েছিলাম। বাড়ি ফেরার আনন্দ বলে বোঝানো যায় না। উপচে পড়া মানুষের ভালোবাসায় আবেগে ভেসে গেছিলাম। গান করতে উঠে আমার চোখে জল চলে এসেছিল। এখনও মনে পড়লে ভালোলাগছে। আমার সঙ্গে শত শত মানুষ গান গাইছেন। উৎসাহিত করছেন। এমন ভালোবাসা কোনোদিন ভোলার না। এই অভিজ্ঞতা আমাকে ভবিষ্যতে আরও ভালো গান গাইতে উৎসাহ দেবে।
• কী ধরনের গান আপনি বাংলাদেশে গেয়েছিলেন?
আসলে আমি বাংলাদেশে গিয়েছিলাম বিশিষ্ট সুরকার কৌশিক হুসেন তাপস-এর পরিচালিত একটি গানের রেকর্ডিং করতে। তাপস বাংলাদেশের গান বাংলা টিভি-তে ‘ওয়াইড চেঞ্জ’ নামে একটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করে। এই অনুষ্ঠান কোক স্টুডিওর বাংলা ভার্সন। এখানে বিশ্বসেরা সকল যন্ত্রশিল্পীদের সঙ্গে গান রেকর্ডিং করেছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা অবিস্মরণীয়। রেকর্ডিং হয়েছিল রবীন্দ্রসংগীতের উপর। বলা যেতে পারে এটাই এবছরে আমার শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা।
আরও পড়ুন
এখনকার কিছু বিষয় নিয়ে আমি খুবই আহত’
• লোকসঙ্গীত নিয়ে দুই বাংলাই বিভিন্ন ভাবে কাজ করছে। আপনার কী মনে হয়, এই বিষয়ে কে এগিয়ে – বাংলাদেশ না পশ্চিমবঙ্গ?
আসলে দুই দেশই তাদের নিজের মতো করে লোকসঙ্গীত নিয়ে কাজ করছে। তবে একটা কথা সত্যি, এই বিষয়ে বাংলাদেশ বেশি এগিয়ে আছে বলে আমি মনে করি। কারণ, আমার মনে হয় পশ্চিমবঙ্গের বাংলা গান অনেক বেশি সিনেম্যাটিক ও বলিউড প্রভাবিত। তার থেকে বাংলাদেশের সুরকাররা বাংলা গান নিয়ে অনেক বেশি চর্চা করেন বলে আমার অন্তত মত। কিন্তু এটাও সত্যি, পশ্চিমবঙ্গের অনেক সুরকার বাংলা গান নিয়ে খুব ভালো কাজ করছেন।
• আপনি সম্প্রতি বেশ কয়েকজন বাঙালি সুরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁরা সকলেই আপনার কাজ সম্পর্কে খুবই প্রশংসা করেছেন। এই বিষয়ে আপনার কী মত?
বাংলাদেশের কৌশিক হুসেন তাপসের সঙ্গে কাজ করে খুব ভালো লেগেছে। তাপস নিজে খুবই ভালো সুরকার। তাঁর কাজ বাংলা গানকে বিশ্বের দরবারে এক অন্য মাত্রা দিচ্ছে ও দেবে বলে আমার বিশ্বাস। এছাড়া বাংলাদেশের অন্য কোনও সুরকারের সঙ্গে সম্প্রতি কাজ করিনি। তবে কিছু বছর আগে আমি আমার বন্ধু স্যমন্তক সিনহার সঙ্গে কাজ করেছিলাম। আসলে আমরা দুজনেই বিভিন্ন সময় নানা নতুন বিষয় নিয়ে কাজ করে এসেছি। স্যমন্তক ইংল্যান্ড থেকে মিউজিক নিয়ে পড়াশোনা করেছে। ফলে ওর কাজে অন্য একটা মাত্রা দেখতে পাই। ওর সঙ্গে কাজ করতে আমার খুবই ভালো লাগে। আশা করি ভবিষ্যতেও আমরা একসঙ্গে অনেক ভালো ভালো কাজ করব।

• টলিউডে গানের অভিজ্ঞতা কেমন?
এই বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা খুবই কম। আসলে আমি কখনই নিজেকে একজন স্টুডিও গায়ক হিসাবে ভাবতে চাইনি। আমি সঙ্গীতশিল্পী হিসাবে নিজেকে বিবেচনা করতে ভালোবাসি। এইজন্য কখনও কোনো ছবিতে আমি গান করিনি। কারণ এটা আমার স্বপ্ন নয়। আমি গান ভালোবাসি। আর সঙ্গীত শিল্পী হিসাবেই সারাজীবন গান গেয়ে যেতে চাই। তবে এবছর সৃজিত মুখার্জির একটি ছবিতে গান গেয়েছি। গানটি হল ‘এক যে ছিল রাজা’। শিবপ্রসাদ ও নন্দিতার পরিচালিত ছবি ‘কণ্ঠ’- এর জন্য একটি গান গেয়েছি। এই কাজগুলো করে আমি খুবই খুশি। এছাড়া স্যমন্তকের নির্দেশনায় একটি অ্যালবামের জন্য তিনটি গান গেয়েছি। একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত, একটি অতুলপ্রসাদের গান এবং একটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গান। আসলে আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হল ভালো গান গেয়ে যাওয়া। গানের ভাষা ও মাধ্যম কী হবে সে নিয়ে আমি কখনও চিন্তিত হইনি, বাকি জীবনেও হতে চাই না। গানই আমার প্রাণ ও ভালোবাসা। জীবন বললেও মন্দ হয় না।